কোমরের পটিতে হাত চেপে অনুভব করলাম লুগার ০.৪৫৭-এর ইস্পাত-আশ্বাস। কিন্তু ওই পাঁচফুটিয়া মালটাকে খতম করতে রিভলভারের গুলি খরচ হবে ভেবে মনটা কেমন যেন করে উঠল। অন্যমনস্কভাবেই পা বাড়ালাম করিডরের দিকে।
কয়েক পা এগোনোর পর, করিডরের ঠিক মুখটাতে, হঠাৎ কেন যে মুখ তুলে ওপরদিকে তাকিয়েছিলাম, বলতে পারব না। এবং সঙ্গে সঙ্গে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে পাঁচহাত লম্বা এক লাফ দিয়ে ছিটকে পড়েছি কতকগুলো প্যাকিংবাক্সের ওপরে।
ঠিক একইসঙ্গে ঘটে গেল দুটো ব্যাপার।
এক, আমার প্যাকিংবাক্সের ওপরে লাফিয়ে পড়া। দুই, লোহালক্কড়ে বোঝাই বালতিটার ডেকের ওপরে সশব্দে আছড়ে পড়া। একমুহূর্ত আগেই যে-জায়গায় আমি দাঁড়িয়েছিলাম, ঠিক সেই জায়গায় আছড়ে পড়ল বালতিটা। পুরোনো নাট, বেয়ারিং, বল্টু, রড ইত্যাদি জিনিসগুলো ডেকের ওপরে ছড়িয়ে পড়ল। বালতি পড়ার ওই প্রচণ্ড শব্দে কয়েকজন নাবিক ছুটে এল।
উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা ঝাড়তে-ঝাড়তে তাদের জানালাম, ব্যাপারটা নিছক দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। এবং এ ব্যাপারটা ক্যাপ্টেনকে না জানাতে বারবার করে অনুরোধ করলাম।
বেশ কিছুটা খোঁজাখুঁজির পর খুঁজে পেলাম আমার দু-দিনের আস্তানা ষোলো নম্বর কেবিন। ওই দুর্ঘটনার ব্যাপারটা আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। সত্যিই কি ওটা দুর্ঘটনা? নাকি ঠান্ডা রক্তে খুন করার এক অভিনব পরিকল্পনা? অনেক ভেবেচিন্তেও ব্যাপারটার কোনও সমাধানে আসতে পারলাম না। এখন ওই মূর্খ নাবিকগুলো যদি ক্যাপ্টেনকে ঘটনাটা রিপোর্ট করে, তা হলেই সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকবে না। খাল কেটে কুমির আনব। অর্থাৎ, জাহাজের সব ক’টা লোকের নজর আমার দিকে পড়বে। যেখানে আমি বিশেষ একটা গুরুত্বপূর্ণ গোপন দায়িত্ব নিয়ে এসেছি, সেখানে নিজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করানোটা ‘অ্যাসাসিন’-এর চিফ খুব একটা ভালো চোখে দেখবে না। যদিও জাহাজের প্যাসেঞ্জার লিস্টে আমার নাম সুধীর নায়েক নয়—নোটন আম্বাস্তা। তবু বলা যায় না কখন কী হয়!
কেবিনের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে সবিস্ময়ে লক্ষ করলাম, দরজায় কোনও ছিটকিনি বা শেকল নেই। অর্থাৎ, দরজা থাকা, না থাকা—সমান। বেডিং আর সুটকেসটা কেবিনের এক কোণে রাখা ছিল। এগিয়ে গিয়ে সুটকেসটা নিয়ে এলাম। সেটাকে বন্ধ দরজায় গায়ে ঠেস দিয়ে পকেট থেকে একটা অ্যাডেসিভ টেপের রিল বের করলাম। তারপর ওই অ্যাডেসিভ টেপ দিয়ে সুটকেসটা সেঁটে দিলাম দরজার গায়ে। এতে আর কিছু না হোক, দরজা খোলার সময় অন্তত খানিকটা শব্দ হবে।
এবার কোমরের হোলস্টার থেকে লুগারটা বের করে বেসিনের নীচে অ্যাডেসিভ টেপ দিয়ে আটকে দিলাম। এমনভাবে ওটা লুকিয়ে ফেললাম যে, কারও পক্ষে চট করে আবিষ্কার করা অসম্ভব।
রিভলভারটা সুটকেসে না রাখার একটা কারণ আছে। তা হল, সাধারণত জাহাজের স্টুয়ার্ডরা একটু বেশি কৌতূহলী হয়, এবং সুযোগ-সুবিধে মতো যাত্রীদের জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে। সেটা করতে গিয়ে আমার সুটকেস থেকে যদি রিভলভারটা বের করে ফ্যালে, তবে ক্যাপ্টেনের কাছে আমাকে হয়তো জবাবদিহি করতে হবে। আর রিভলভারের ব্যাপারটা একবার জানাজানি হলে জাহাজে থাকাই দায় হয়ে উঠবে।
সব গোছগাছ সেরে কেবিনের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম নিজেকে।
প্রায় ছ’ফুট লম্বা, পেশিবহুল চেহারা। সরু গোঁফ, পাতলা ঠোঁট। নাকটা একটু থ্যাবড়া। গাল বেয়ে লম্বা জুলপি। অনুসন্ধানী চঞ্চল দু-চোখ। সারা মুখে একটা কাঠিন্য।
আজ্ঞে হ্যাঁ। ওপরের বর্ণনাটা আমার প্রতিবিম্বিত চেহারার বর্ণনা, কিন্তু তার অন্তত পঞ্চাশ পার্সেন্ট ছদ্মবেশ! যেমন ওই গোঁফ, জুলপি, এলিভেটর স্যু, প্লাস্টিসিনের নাক—সবই ছদ্মবেশ। এত ধৈর্য, পরিশ্রমের কারণ একটাই—সতর্কতা।
হঠাৎই অন্যমনস্কভাবে বাঁ-হাত দিয়ে বাঁ-কানের লতিটা চুলকোতে লাগলাম। এবং সঙ্গে-সঙ্গেই তড়িৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম। আবার! কড়া বকুনি দিলাম নিজেকে। আবার সেই মুদ্রাদোষ! বৎস সুধীর নায়েক, এখন হইতেই সাবধান হও। তুমি তো জানো, তোমার ন্যায় এইরূপ কত হতভাগ্য এই সামান্য মুদ্রাদোষের নিমিত্ত শত্রুপক্ষের কবলিত হইয়াছে!
বাঁ-হাতকে বশে ফিরিয়ে আনলাম। মুদ্রাদোষে! হাসলাম, কিন্তু হাসলে কী হবে, এই মুদ্রাদোষের জন্যে আমাদের দলের তিনজন এক্সিকিউশনার এর আগে শত্রুপক্ষের হাতে মারা গেছে। কুণাল যোশী, সোহনলাল শুক্লা এবং সখারাম বক্সী।
কুণালের একটা বদখত মুদ্রাদোষ ছিল, সবসময় টাইয়ের নট ঠিক করে জামার কলারে হাত বোলানো। ব্যস! ওর সম্বন্ধে প্রতিটি গুপ্তদল যে-‘ডোসিয়ার’ রাখত, তাতে লেখা হয়ে গেল, কুণাল যোশী, বয়েস বত্রিশ বছর, চেহারা…এবং একেবারে শেষে—বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরোক্ত ব্যক্তির এক বিচিত্র মুদ্রাদোষ আছে। তা হল…।
এইভাবে নিজের মৃত্যু-পরোয়ানায় নিজে সই করেছিল কুণাল। এক সুপরিকল্পিত নিখুঁত দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে কুণাল স্বর্গের সিঁড়িতে পা রেখেছিল।
তারপর সোহনলাল শুক্লা। বেচারা সোহনলালের এক অদ্ভুত মুদ্রাদোষ ছিল। সবসমসয়ই দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরত। ও নিজেও সম্ভবত জানতে পারেনি, ওই কালান্তক মুদ্রাদোষের কথা। সুতরাং যেখানে যে ছদ্মবেশেই যাক না কেন, ওকে চিনে নিতে শত্রুপক্ষের কোনও অসুবিধেই হয়নি। তারপর যা ঘটে থাকে, তাই হয়েছে। এক অনির্বচনীয় বিস্ময়কর দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাল সোহনলাল।
