একটু থেমে চৌধুরী আবার বলতে শুরু করল, সে যাই হোক, যদি রুকির হাত থেকেই ওই লাল রংটা এসে থাকে তা হলে এটা বুঝতে হবে মিসেস মিত্র ওই ডামিটা রং করে তৈরি রেখেছেন আমাকে বোকা বানানোর জন্যে—অর্থাৎ, তিনি আমাদের কাছে মিথ্যে কথা বলেছেন। সঙ্গে-সঙ্গে আমি গাড়ি নিয়ে ছুটে গেলাম ওঁর বাড়িতে, কিন্তু দেখলাম, তিনি বাড়িতে নেই। তখন ভাবলাম, আপনার কাছেই আসি, একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে যাই ব্যাপারটা নিয়ে। এসে দেখি বাইরে মিসেস মিত্রের স্টেশন ওয়াগনটা দাঁড়িয়ে। বাকিটা তো আপনি জানেন।
একটা চেয়ারে এলিয়ে পড়ল চৌধুরী। যেন এই কথাগুলো বলে তার অবশিষ্ট শক্তিটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার আরও একটা প্রশ্ন রয়েছে।
সুতরাং জিগ্যেস করলাম, ওঁর স্বামীর বডি কোথায়? তিনি বলছিলেন, কোথায় একটা বড় বাড়ি তৈরি হবে, সেই জমিতে নাকি পোঁতা আছে?
চৌধুরীর দু-চোখের পাতা যেন দু-দুটো ভারী পাথর। নিছক ইচ্ছেশক্তিতেই সে যেন চোখ খুলে রয়েছে।
এখন শুধু একটা প্রশ্ন নয়, অনেক প্রশ্ন…।—বিড়বিড় করে বলল চৌধুরী, কে মিসেস মিত্রকে সাহায্য করেছে? কীভাবে ওঁর স্বামীকে খুন করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর কাল থেকে খুঁজতে শুরু করব।
কিন্তু ডেডবডিটা খুঁজে পাবেন কী করে?
কোথায়-কোথায় নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে সেটা আমাদের খোঁজ করতে হবে। আমরা মিউনিসিপ্যালিটিতে গিয়ে খোঁজ নেব…।
সত্যি, এটা আমার মাথায় আসেনি। চৌধুরীকে মনে-মনে সাবাস দিলাম।
মিউনিসিপ্যালিটিতে খোঁজখবর নেওয়ার পর খুঁজে পাওয়া যাবে সেই বিল্ডিং কন্ট্রাক্টরকে। তারপর জানতে পারব কে মিসেস মিত্রের বন্ধু যে ওঁর সব কথা চোখ বুজে শোনে এবং সেই কন্ট্রাক্টরের কংক্রিট মিক্সার চালাতে পারে। তারপর—।
চৌধুরীকে সে-কথা বলতে গিয়ে দেখি সে চেয়ারে বসে-বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
অতএব, মনে-মনে শুধু ভাবলাম, ভাগ্যিস ট্রেন স্ট্রাইক হয়েছিল!
মুদ্রাদোষ বড় দোষ
প্রথম দুর্ঘটনা
জাহাজে পা দিতেই কেমন একটা অস্বস্তি আমাকে আঁকড়ে ধরল। মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়ালাম। কুলিটা বেডিং আর সুটকেস তুলে নিয়ে চোখে প্রশ্ন তুলে আমার দিকে তাকাল। অর্থাৎ, কত নম্বর কামরা? পকেট থেকে টিকিটটা বের করে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। তারপর বললাম, ‘ষোলো নম্বর কেবিন।’
লোকটা যান্ত্রিকভাবে বেডিং আর সুটকেস নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ওকে অনুসরণ করলাম।
জাহাজের ওপরের ডেকে খোলা জায়গাটায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু মালপত্র পড়ে আছে। মাঝে-মাঝে লোকজন ব্যস্তভাবে যাতায়াত করছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ নোঙর তুলবে।
বিকেল পার হয়ে সন্ধে নেমেছে। আকাশের গোলাপি পটভূমিতে ছেঁড়া সাদা মেঘের টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে। সমুদ্রের জল হালকা ঢেউ তুলে জাহাজের গায়ে এসে আছড়ে পড়েছে।
ডেকের রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। আরও অনেক যাত্রীই সার বেঁধে রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে। কেউ-কেউ হাত নেড়ে প্রিয়জনদের বিদায় জানাচ্ছে। নীচের ডেকে মালপত্রের ফাঁকে-ফাঁকে শুয়ে কয়েকজন নাবিক বিশ্রাম নিচ্ছে। জাহাজের সব ক’টা নৌকোই ধীরে-ধীরে ফিরে আসছে।
একসময় টানা ভোঁ দিয়ে দুলে উঠল ‘জলপরী’ (জাহাজের নাম)। সমুদ্রের নোনা হাওয়ার অদ্ভুত গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারল। জাহাজের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ে চলল গোটাকয়েক মাছরাঙা।
হঠাৎ খেয়াল হল, কুলিটা অনেক আগেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। একটু ব্যস্ত হয়ে সাততাড়াতাড়ি এগোতে যাব, ধাক্কা লাগল এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। সাধারণভাবে ‘সরি’ বলে পাশ কাটাতে যাচ্ছি, কানে এল আগন্তুকের পরিষ্কার মিহি গলা, ‘দেশলাই আছে?’
পাশ কাটাতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। পকেট হাতড়ে বের করলাম সুদৃশ্য লাইটারটা। সহযাত্রীকে পড়ন্ত বেলায় একবার ভালো করে দেখলাম।
উচ্চতায় ফুট-পাঁচেক হবে কি না সন্দেহ। অত্যন্ত সাধারণ চেহারা। শরীরে মেদের বাড়াবাড়ি। মুখে কৌতুকের হাসি। ঠোঁটের ওপরে চৌকো টুথব্রাশ গোঁফ। দু-কান থেকে ঝাঁটার মতো লোম বেরিয়ে আছে। ছোট্ট ভুরুর নীচে তার চেয়েও ছোট চোখ।
ভদ্রলোকের অদ্ভুত চেহারা দেখে ভীষণ হাসি পেল। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে লাইটার জ্বালিয়ে ওঁর সিগারেটে আগুন ধরালাম। লাইটার পকেটে রাখতে গিয়েই পকেটে রাখা ফটোটায় আঙুল ঠেকল। ভীষণভাবে চমকে উঠলাম। শিউরে উঠে হাত বাইরে বের করে নিয়ে এলাম।
ভদ্রলোক মৃদু হেসে সিগারেট ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ জানালেন। তারপর হেলতে-দুলতে করিডরের দিকে পা বাড়ালেন।
মনে-মনে ভীষণ উত্তেজিত হলেও মুখে সে-ভাবটা এক মুহূর্তের জন্যেও প্রকাশ করিনি। কারণ, প্রফেশনাল কিলাররা মনের ভাব কখনও মুখে প্রকাশ করে না। আর বিশেষ করে সুধীর নায়েকের মতো (অর্থাৎ, এই অধম!) একজন এক্সপার্ট পোড়খাওয়া কিলার।
চারপাশে একবার তাকালাম। না, আমাকে কেউই লক্ষ করছে না। অতি সাবধানে পকেট থেকে সেই ফটোটা বের করলাম। ডেকের মৃদু আলোয় দেখতে অসুবিধে হলেও চিনতে অসুবিধে হল না। না, কোনও ভুলই আমার হয়নি। এই একটু আগেই যাকে সিগারেট ধরিয়ে দিলাম, তিনিই আমার রিভলভারের চাঁদমারি—রণেন বর্মা।
‘অ্যাসাসিন’ নামের এক গুপ্তদলের প্রফেশনাল কিলার অথবা জহ্লাদ হলাম আমি—অর্থাৎ, শ্রীসুধীর নায়েক। এবারের যাত্রায় দলের প্রয়োজনে এবং নির্দেশে আমাকে খুন করতে হবে এই রণেন বর্মাকে। কেন? কী কারণে? রণেন বর্মা কে?—এসব আমার জানার দরকার নেই। শুধু জানি, আদেশ এসেছে, কাজ হাসিল করতে হবে—ব্যস!
