এই হল রুকি, মিস্টার সান্যাল।—মিসেস মিত্র আমাকে বললেন, এখানে তৈরি প্রতিটি মডেলের একটা করে নাম আছে। তাতে কাজের সুবিধে হয়। আজ সকালে আমার গাড়িতে আপনি নির্ঘাত ওকেই দেখেছিলেন। জানেন তো, আমি আর আমার হাজব্যান্ড মিলে নানান দোকানের শো-কেস মডেল দিয়ে সাজাই। বিশেষ করে কাপড়ের দোকান। মডেলগুলো আমরা তৈরি করি। আর দোকান থেকে দেয় মডেলের সব ড্রেস। ব্যস। তারপর আমাদের কাজ হল পোশাক-টোশাক পরিয়ে সেগুলোকে শো-কেসে সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া। রুকি হল কলকাতার বিখ্যাত কাপড়ের দোকান যমুনালাল পান্নালাল-এর সম্পত্তি। মাত্র দু-দিন আগে ওকে নতুন করে আবার রং করেছি। আজ সকালে ওকে নিয়ে আমি যাচ্ছিলাম কলকাতায়।
একটু থেমে আবার বলে চললেন মিসেস মিত্র, ন্যুড অবস্থায় স্টেশান ওয়াগনে করে তো আর ডামিগুলোকে নিয়ে যাওয়া যায় না! তা হলে আপনার মতো আরও অনেকেই হয়তো ভুলভাল ভাববে। তাই প্লাস্টিকের কভার হাতের কাছে না পাওয়ায় একটা চাদর চাপা দিয়েই রুকিকে আমি নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু রাস্তায় অতবার থামতে আর চলতে গিয়ে চাদরটা সরে যায়। তখনই ওর একটা হাত বাইরে বেরিয়ে পড়ে।
মিসেস মিত্র থামতেই আমি বললাম, কিন্তু আপনি তো রুকিকে যমুনালাল পান্নালালে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তা হলে এখানে ওটা এল কী করে?
হাসলেন মিসেস মিত্র। বললেন, ও, এই কথা? আসলে কী হয়েছে জানেন, রং করার সময় ওর হাতে খানিকটা লাল রং চলকে পড়ে যায়। সে অবস্থায় ওকে তো আর শো-কেসে সাজানো যায় না। যমুনালালের দোকানে পৌঁছে যখন রুকিকে বের করতে যাই তখনই ব্যাপারটা আমার চোখে পড়ে। ওই দেখুন—।
আঙুল তুলে রুকির ডানহাত দেখালেন মিসেস মিত্র। সত্যিই তাই। কনুই থেকে শুরু হয়েছে লাল দাগটা, এবং থেমেছে এসে ডানহাতের মাঝের দু-আঙুলের প্রান্তে।
এই হল আপনার রক্ত, মিস্টার সান্যাল।—ব্যঙ্গভরে বলল চৌধুরী।
চৌধুরীর নজরে নজর মেলানোর চেয়ে হিমালয়ের চূড়া থেকে অতলান্ত সাগরে ঝাঁপ দিতেও আমি রাজি। চৌধুরীর গলা দিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত চাপা গর্জন বেরিয়ে এল। নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভয় পেলাম।
আপনার তদন্ত শেষ হয়েছে, মিস্টার ব্যোমকেশ বক্সী?—চৌধুরীর তিক্ত ব্যঙ্গ যেন কেটে বসল আমার শরীরে: এবারে আমরা যাব। তার আগে ওই কোণের একটা প্লাস্টারের মেয়েছেলের সঙ্গে আপনি একটু ফস্টিনস্টি করে নেবেন?
কিছুই বলার নেই আমার। একটা সামান্য ডামির জন্যে একজন ক্লান্ত ডিটেকটিভকে দিয়ে আমি কী অমানুষিক পরিশ্রম করিয়েছি! তা ছাড়া একজন নির্দোষ মহিলাকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করেছি। কেন যেন মনে হল, চৌধুরী আমাকে এত সহজে ছাড়বে না।
চৌধুরী আমার বাড়িতে ফিরে এল। আমাকে নামিয়ে দিয়ে ইঞ্জিন চালু রেখেই মুখ খুলল। মিসেস মিত্রের সামনে যেসব ভাষা চৌধুরী ব্যবহার করতে পারেনি তারই মহড়া দিল প্রায় দশমিনিট ধরে। আমি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব শুনলাম। ভাবলাম, আমাকে এসব বলে চৌধুরী অন্তত একটু হালকা হোক।
বাড়িতে ঢুকে কাজের লোককে বললাম কড়া করে এক কাপ কফি দিতে। তারপর শুয়ে পড়লাম বিছানায়। মনে-মনে নিজেকে হাজাররকম গালাগাল দিলাম। ভাগ্যিস রুমা বাড়িতে নেই। থাকলে ওর কাছে থেকেও একপ্রস্থ শুনতে হত।
সারাদিনের ক্লান্তির জন্যেই হোক, বা এতক্ষণের দুশ্চিন্তার জন্যেই হোক, মিনিটকয়েকের মধ্যেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার চোখ ও মন থেকে বাইরের পৃথিবী মুছে গেল।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি মনে নেই, তবে ঘুম ভেঙে দেখি বাইরে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। অনেকে যেমন ঘুম ভাঙতেই লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। আমি তেমনটা পারি না। ধীরে-ধীরে অচেতন জগৎ থেকে আমি উঠে আসি চেতনার জগতে।
চোখ খুলে প্রথম তাকিয়েছি ঘরের জানলার দিকে। তখনই বুঝেছি সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়েছে। তারপর মনে পড়ল অনুপম বক্সীর কথা, এবং পরক্ষণেই ভেসে উঠল টাক মাথা অফিসার চৌধুরীর রুক্ষ মুখটা।
সমস্ত ব্যাপারটা ভুলতে আবার চোখ বুজলাম। চোখ বুজতেই আমার মন ভেসে গেল সারি-সারি গাড়িতে টইটম্বুর সকালের রাস্তায়। আমি যেন আবার বসে আছি আমার গাড়িতে। সামনে সবুজ অ্যামবাসাডারটা। আর ডানদিকেই মিসেস মিত্রের মেরুন স্টেশান ওয়াগনটা। আমি তাকিয়ে আছি স্টেশান ওয়াগনের পেছনে রাখা চাদর-ঢাকা অবয়বটার দিকে। হঠাৎই চাদর সরে গিয়ে বেরিয়ে এল হাতটা। কিন্তু না, মানুষের হাত নয়। একটা প্লাস্টারের হাত। মিসেস মিত্রের স্টুডিওর সেই হতচ্ছাড়া ডামি, রুকির হাত। তবে—।
তখনই আমার তন্দ্রার ভাবটুকু নিমেষে মিলিয়ে গেল। স্পষ্ট বুঝলাম, চৌধুরী এবং আমি, দুজনেই বিরাট ভুল করেছি। মিসেস মিত্র চালাকিতে আমাদের টেক্কা দিয়েছেন। সকালের রাস্তার দৃশ্যটা স্পষ্ট আমার মনে ভাসছে। চাদরের নীচে কোনও মৃতদেহের বদলে আমি রুকিকে ভাবতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না। কারণ লাল রংটা ছিল রুকির ডানহাতে, আর যে-হাতটা আমি গাড়িতে দেখেছি, সেটা কোনও মানুষের বাঁ-হাতে!
বিছানায় বসে থরথর করে কাঁপতে লাগলাম। আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছি। চৌধুরীকে ফোন করে সব বলব? সে আমার কথা বিশ্বাস করবে তো? আর করলেও, এখন আমরা কী করব?
কী করব ভাবতে-ভাবতে আধঘণ্টা পার হয়ে গেল। এমন সময় হঠাৎই বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ কানে এল। অতিথি এসেছে আমার কাছে। যে-ই আসুক, সে নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ ধরে কড়া নাড়ছে। কারণ, কড়া নাড়ার খটখট শব্দটা যে আমার মাথার ভেতর থেকে আসছে না সেটা বুঝতে আমার বেশ সময় লেগেছে।
