রাগ করছেন কেন, চৌধুরীদা, শান্ত হোন। —বক্সী এগিয়ে এসে চৌধুরীর পিঠে হাত রাখল।
ওদের এ অবস্থায় রেখে আমি বেরিয়ে এলাম থানা থেকে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রওনা হলাম। এবং প্রথম সুযোগেই গাড়ি ঘুরিয়ে উলটোদিকে চলতে শুরু করলাম।
একসময় বাড়িতে এসে পৌঁছলাম।
প্রায় এগারোটা নাগাদ খেয়াল হল অফিসে ফোন করে বলা হয়নি যে, আজ কাজে যাব না। ফোন করলাম। বস মোটেই খুশি হল না। এরকমটাই হবে ভেবেছিলাম।
এরপর ঘণ্টাতিনেক বসে রইলাম টেলিফোনের কাছে। ভাবলাম, এই হয়তো চৌধুরীর ফোন আসবে। কিন্তু এল না।
প্রায় সওয়া দুটোর সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম।
দরজায় চৌধুরী দাঁড়িয়ে। কাঁধ অলসভাবে ঝুঁকে পড়েছে দু-পাশে, হাত মুঠো পাকানো।
মিস্টার সান্যাল, আপনাকে শুধু বলতে এলাম, ওই গাড়ির নাম্বারটা নিয়ে আমরা খোঁজখবর করেছি।—চৌধুরীর কণ্ঠস্বর মাখনের মতো নরম: ওয়াগনটাকে আমরা খুঁজেও পেয়েছি। ওটার রঙ মেরুন—আপনি যেমনটি বলেছেন। ওয়াগনের মালিক এক মহিলা—মিসেস কণা মিত্র। তার বাড়ি এখান থেকে মাত্র মাইলদুয়েক দূরে!
তাই নাকি? তা হলে তো একেবারে কাছে।—অবাক হয়ে বললাম।
এবং আপনার কথামতো সেই ডেডবডিটাও আমরা খুঁজে পেয়েছি, মিস্টার সান্যাল।
ভদ্রমহিলাকে আপনারা অ্যারেস্ট করেছেন…।—বলতে-বলতে মাঝপথে থেমে গেলাম। কারণ দেখলাম, চৌধুরী মাথা নাড়ছে।
না, গ্রেপ্তার করিনি। কারণ গ্রেপ্তার করার মতো কোনও অপরাধ তিনি করেননি। কিছুই করেননি। কিন্তু আপনাকে একবার আমার সঙ্গে আসতে হবে, মিস্টার সান্যাল—আমরা মিসেস মিত্রের বাড়িতে যাব।
কিন্তু আপনি যা বলছেন তাতে আমার আর গিয়ে লাভ কী—?
আপনাকে আসতেই হবে, মিস্টার সান্যাল, কারণ, না এলে আপনাকে আমি টানতে-টানতে নিয়ে যাব, ঢুকিয়ে দেব গাড়ির পেছনের ডিকিতে। গত পাঁচঘণ্টা ধরে আমি কীসের পেছনে ছুটে বেরিয়েছি সেটা আপনাকে দেখাতে চাই। তারপর, মিসেস মিত্রের কাছে আপনি ক্ষমা চাওয়ার পর, যদি কোনও কেসে আপনাকে ফাঁসাতে না পারি তা হলে বাধ্য হয়ে হয়তো আপনাকে ছেড়ে দেব।
চৌধুরীর সঙ্গে যাওয়ার পথে রাস্তার ধারের দোকানপাটের সাইনবোর্ডগুলো পড়তে থাকলাম। এ ছাড়া কিছু করারও ছিল না। চৌধুরী আমার দিকে একবার মুখ ফেরাল না পর্যন্ত। শুধু তাকিয়ে আছে উইন্ডশিল্ডের দিকে। চোখ তীক্ষ্ন হয়ে এসেছে। ঘন-ঘন নিশ্বাস পড়ছে।
মিসেস মিত্রের পাড়াটা ব্যবসায়ীদের পাড়া। সুতরাং জমজমাট।
একটা গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে থামল চৌধুরী। ইঞ্জিন বন্ধ করে একটা বাড়ি দেখিয়ে বলল, ওই যে, ওই বাড়িটায় আপনার খুনি থাকে।
বাড়ির দরজাটা আংশিক কাচের। এবং সেই ঘষা কাচের প্যানেলে লাল রং দিয়ে লেখা—মিত্র ডেকরেটার্স।
দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম আমরা। চৌধুরীই নক করল, আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই খুলে গেল দরজা।
গায়ে কাশ্মীরি শাল জড়িয়ে যে-মহিলা আমাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁকে চিনতে আমার কোনও ভুল হল না। ইনিই ছিলেন সেই মেরুন স্টেশান ওয়াগনে।
মহিলার চেহারা শক্তসমর্থ, লম্বায় প্রায় আমারই সমান। হঠাৎ দেখলে অ্যাথলিট বলে ভুল হতে পারে। চোখে এখন সানগ্লাস নেই। সুতরাং, তেজি ঘোড়ার মতো উদ্ধত ভাবটা অত্যন্ত স্পষ্ট।
মিসেস মিত্র, ইনিই মিস্টার সান্যাল।—চৌধুরী ওঁকে বলল।
ভদ্রমহিলার কাছ থেকে বরফ মাখানো এক সুদীর্ঘ দৃষ্টি উপহার পেলাম।
তারপর তিনি ঘুরলেন ইন্সপেক্টর চৌধুরীর দিকে। হাসলেন। প্রশ্ন করলেন, এঁর কথাই কি আপনি আমাকে বলছিলেন? যিনি আমার স্টেশান ওয়াগনটা রাস্তায় দেখেছেন?
হ্যাঁ, ইনিই।—চৌধুরীর স্বর আবেগহীন, শান্ত। সে আরও বলল, আমি ভাবছিলাম, আপনি যদি এঁকে…ইয়ে…ডেডবডিটা একটু দেখতে দেন—।
নিশ্চয়ই দেখাব। দেখলে হয়তো ওঁর দুশ্চিন্তা কমবে। আসুন, আমার সঙ্গে আসুন।
ঢুকেই ডানদিকে ভেলভেটের পরদা দেওয়া একটা ঘর। পরদা সরিয়ে সেই ঘরে আমাদের আহ্বান জানালেন মিসেস মিত্র।
ঘরটা বিশাল। দেখলে হঠাৎ করে কোনও কারখানা বলে ভুল হয়। অথবা মনে হতে পারে প্রাচীন কোনও টরচার-চেম্বার। কারণ, ঘরের এখানে সেখানে উলঙ্গ দেহ ও দেহের বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পড়ে আছে। তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ তফাত নেই। চোখে স্থির শূন্য দৃষ্টি। ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের বড় টেবিল। তার ওপর রং, তুলি, হাতুড়ি, পেরেক ইত্যাদি অগোছালোভাবে পড়ে আছে। এক কোণে চোখে পড়ে হাত-পায়ের স্তূপ। আর, একটা টেবিলে সাজানো সারি-সারি মাথা। তার কোনও-কোনওটায় চুল থাকলেও বেশিরভাগই টাকমাথা।
হাত বাড়িয়ে একটা মাথা ছুঁয়ে দেখলাম। রুক্ষ কঠিন। নিঃসন্দেহে প্লাস্টার অফ প্যারিস।
মিসেস মিত্র এগিয়ে গেলেন ঘরের একটা কোণের দিকে। চৌধুরী পকেট থেকে একটা দোমড়ানো সিগারেটের প্যাকেট বের করে তা থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ঠোঁটে রাখল। তারপর লাইটার জ্বেলে সেটা ধরাল। ভাবলাম ওর কাছ থেকে একটা সিগারেট চাইব, কিন্তু ও যে-চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, সে-নজর ইস্পাতের ঠান্ডা পাতে পড়লে সহজেই সেটা ফুটো হয়ে যেত।
সুতরাং মিসেস মিত্র ফিরে আসা পর্যন্ত মেঝের দিকেই চেয়ে রইলাম। মিসেস মিত্র খালি হাতে ফেরেননি। কোলে করে নিয়ে এসেছেন একটা প্লাস্টারের ম্যানিকিন। তার রং মাখা মুখে বোকা-বোকা হাসি।
