চৌধুরীকে ডাকব কি ডাকব না ভাবতে-ভাবতে দরজার কাছে গেলাম।
দরজা খুললাম।
দরজায় দাঁড়িয়ে মিসেস মিত্র। গায়ে বিকেলের সেই কাশ্মীরি শাল। এবং একটা উলের মাফলার—যেটা তখন দেখিনি। সব মিলিয়ে তাঁর এই সাজ হাস্যকর। তবে তাঁর হাতের মুঠোয় ধরা জিনিসটা মোটেও হাস্যকর নয়।
জিনিসটা একটা ০.৪৫ অটোমেটিক। তার নলের ফুটোটা সরাসরি আমার পেট লক্ষ্য করে তাকিয়ে আছে। এবং ফুটোর আকারট আমার কাছে জলের পাইপের মতো বিশাল ঠেকল।
আমার প্রথম কথাগুলো যেমন এলোমেলো তেমনই অর্থহীন, তবে আমার সারাদিনের অবস্থার কথা ভাবলে সে-দোষ ক্ষমা করা যায়।
হাতের হিসেবটা আপনার ভুল হয়ে গেছে, তাই না মিসেস মিত্র?
হ্যাঁ। তাই ভাবছিলাম, এটা খেয়াল হতে আপনার কতটা সময় লাগবে।—কথাটা বলেই বসবার ঘরে ঢুকে এলেন তিনি। দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি এঁটে দিলেন। তারপর বললেন, ইন্সপেক্টর চৌধুরী যখন দোকানে গিয়ে আমাকে আপনার কথা বললেন, তখন তাড়াহুড়ো করে ডামিটা আমাকে রেডি করতে হয়। আপনি কী দেখেছেন সেটা মিস্টার চৌধুরী আমাকে বলেছেন, কিন্তু কোন হাতটা যে চাদরের তলা দিয়ে বেরিয়ে ছিল তা বলেননি। সেটা আমারও ঠিক মনে পড়ল না। সুতরাং আন্দাজেই রুকির ডান হাতে রং লাগাতে হল। এবং আমার আন্দাজ ভুল হল। তবে মাত্র একঘণ্টা আগে সে-ভুলটা বুঝতে পারলাম। মনে পড়ল, চাদরের তলা থেকে যে-হাতটা বেরিয়ে ছিল সেটা বাঁ-হাত।
আর আপনি ভাবলেন, আমার হয়তো সেটা খেয়াল পড়বে…।
মিসেস মিত্র হাসলেন। বললেন, রাস্তায় গাড়ির ভিড়ে আপনি আমার এত কাছে ছিলেন যে, এখন হোক পরে হোক এ-ব্যাপারটা আপনার মনে পড়তই। সুতরাং টেলিফোন-বই দেখে আপনার ঠিকানাটা বের করে চলে এলাম।
তা, এখন কী হবে?
আমরা একটু বেরোব, মিস্টার সান্যাল। প্রথমে আমরা আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করব। সে একজন বিল্ডিং কন্ট্রাক্টরের হয়ে কংক্রিট মিক্সার চালায়। আমার কথা সে চোখ বুজে শোনে—অবশ্য ঠিকঠাক দাম দিলে তবেই। তারপর যেখানে যাবেন সেখানে গিয়ে নীতিনের সঙ্গে আপনার দেখা হবে।
নীতিন? আজ সকালে চাদরের নীচে বুঝি উনিই ছিলেন?
মিসেস মিত্র সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন।
হ্যাঁ। নীতিন—আমার হাজব্যান্ড। সে একটা বেহেড মাতাল, লম্পট, কাপুরুষ। —শয়তান-হাসি ফুটে উঠল ওঁর ঠোঁটে। তিনি মৃদু স্বরে বললেন, সে যাক, নীতিন তো আর নেই।
নেই? কোথায় গেছেন?
যেখানে গেলে আর ফেরা যায় না। মানে, নেক্সট ইয়ারে এই সময়ে ওর আত্মা ইহলোকের মায়া থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাবে, এবং একইসঙ্গে ওর কবরের ওপর গড়ে উঠবে আধুনিক এক লাক্সারি অ্যাপার্টমেট। সামনের সপ্তাহেই তার ফাউন্ডেশান স্টোন বসানো হবে।
টের পেলাম, আমার হাতের তালু দরদর করে ঘামছে। কিন্তু মরে গেলেও এই মহিলার কাছে আমি প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে অনুনয়-বিনয় করতে পারব না।
তা হলে আমি ও নীতিনবাবু একইসঙ্গে একই কবরে জায়গা পাচ্ছি?—প্রচণ্ড চেষ্টায় গলার স্বর সমান রাখলাম: কিন্তু হঠাৎ এরকমভাবে আমি উধাও হয়ে গেলে ইন্সপেক্টর চৌধুরী কি সন্দেহ করবেন না? বিশেষ করে আজকের ঘটনার পর?
যত প্রাণ চায় সন্দেহ করুক। চৌধুরী কিছুই প্রমাণ করতে পারবে না। তা হলে আমরা রওনা হই, মিস্টার সান্যাল?
রওনা হব কিনা ভাবছি, এমন সময় দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দ শোনা গেল। বাইরে যে-ই থাকুক না কেন, আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই তার ভীষণ জরুরি দরকার।
মিসেস মিত্র কোণঠাসা বেড়ালের মতো চকিতে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলেন। কিছুটা যেন অস্থিরও হয়ে উঠলেন। একবার ভাবলাম, ওঁর হাতের রিভলভারের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ি, কিন্তু আমাদের মধ্যে দূরত্ব অনেক। চঞ্চল চোখে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে তিনি রিভলভারটা লুকিয়ে ফেললেন শালের আড়ালে। কিন্তু তখনও ওটা তাক করে রইল আমার দিকে।
কিছুটা ভয়ের গলায় মিসেস মিত্র আমাকে বললেন, যে এসেছে তাকে তাড়াতাড়ি তাড়ান। আর চালাকি করে পালানোর চেষ্টা করবেন না। আমি আপনার ঠিক পেছনেই থাকব। দরকার হলে একগুলিতে দুজনের লাশ ফেলে দেব।
দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। গভীর শ্বাস নিয়ে দরজা খুলে পাল্লাটা সামান্য ফাঁক করলাম। বাইরে যে দাঁড়িয়েছিল সে-ই বাকি কাজটা শেষ করল। ছিটকে খুলে গেল দরজা, এবং রকেটের গতিতে ঘরে ঢুকল চৌধুরী। এক প্রচণ্ড ধাক্কা মারল আমাকে। আমি উড়ে গিয়ে পড়লাম ঘরের অন্য প্রান্তে। দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে। মিসেস মিত্র অবাক হয়ে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন, রিভলভারটা তখনও শালের আড়ালে লুকোনো।
শালা, শুয়োরের বাচ্চা!—আমার মুখের কাছে এসে খেঁকিয়ে উঠল চৌধুরী, তোমাকে আজ তুলে নিয়ে গিয়ে যক্ষ্মা-ধোলাই দেব। আজ যখন বড়সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেছি তখন কী হয়েছে জানো? অপদার্থের মতো কাজ করেছি বলে তিনি আমাকে কথা দিয়ে এক থাপ্পড় মেরেছেন। এখন আমার সব প্রমোশন সিল হয়ে যাবে, সান্যাল। শুধু তোমার জন্যে।
কথা শেষ হতেই সে আমার একটা হাত চেপে ধরল। এক হ্যাঁচকায় আমাকে তুলে নিয়ে প্রায় ছুড়ে দিল অন্য একটা দেওয়ালে। হাত-পা মুড়ে ছিটকে পড়লাম শোওয়ার ঘরের দরজার কাছে। যন্ত্রণা যত না টের পাচ্ছিলাম তার চেয়ে অবাক হচ্ছিলাম বেশি।
