ঠিক আছে। এবার বলুন। কেউ কি উন্ডেড হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে?
না, তা নয়। মানে, ওই হাতটা হঠাৎ বেরিয়ে—।
ও, বুঝেছি। তা হলে এক কাজ করা যাক। আপনার নাম দিয়েই শুরু করি। কী নাম আপনার?
অফিসার বাধা দেওয়ায় ধৈর্যচ্যুতি হলেও শান্ত কণ্ঠে নিজের নাম বললাম, সান্যাল—রুদ্রেন্দু সান্যাল।
ঠিকানা?
তাও বললাম।
তখন অফিসারটি লেখার কাজ সেরে মুখ তুলল।
ঠিক আছে, মিস্টার সান্যাল। এবার বলুন কী ব্যাপার। একেবারে প্রথম থেকে ধীরে-ধীরে সব গুছিয়ে বলুন।
অতএব প্রথম থেকে সব গুছিয়ে বললাম।
আমার কথা শেষ হলে সার্জেন্ট থুতনিতে হাত ঘষল। বলল, হুম। আমাদের দেওয়ার মতো সেরকম কোনও তথ্য আপনার হাতে নেই, মিস্টার সান্যাল। ঠিক বলছেন, আপনি একটা হাত দেখেছেন? আপনার ভুল হয়নি তো? মানে, আমি বলছি, ওয়াগানটার পেছনের জানলার কাচটা হয়তো ময়লা ছিল—।
ময়লা থাক আর না-ই থাক, ওটা একটা হাতই ছিল। আমার ভুল হয়নি। আর, হাতটায় রক্তের দাগ আমার স্পষ্ট নজরে পড়েছে।
আমি বোধহয় একটু চেঁচিয়েই উত্তর দিয়ে ফেলেছিলাম। কারণ, সার্জেন্ট বলল, আস্তে, উত্তেজিত হবেন না।
সার্জেন্টের নাম অনুপম বক্সী। তার বুকে লাগানো প্লাস্টিকের চাকতি থেকেই নামটা জানতে পেরেছি। এখন ভাবতে গিয়ে দেখছি, সে তার নিজের কাজ ঠিকমতোই করেছে। তখন মনে হয়েছিল আমার সঙ্গে সময় নষ্ট না করে স্টেশান ওয়াগনের পেছনে তার দৌড়ানো উচিত ছিল। এবং সে-কথা তাকে বলেওছিলাম।
একবার বাইরে তাকিয়ে দেখুন, মিস্টার সান্যাল।—রাস্তার গাড়ির ভিড়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে বলল, ধরে নিলাম আপনার ওই মেরুন স্টেশান ওয়াগনটা এই ভিড়ের মধ্যেই কোথাও আটকে আছে! কিন্তু হলে কী হবে? আমাদের গাড়ি তো আর উড়তে পারে না।
তা হলে যে করে হোক রাস্তাঘাট আটকানোর ব্যবস্থা করুন।
অসম্ভব। এখন রাস্তাঘাট আটকালে সারা শহর গাড়িতে ছেয়ে যাব। দাঁড়ান, একমিনিট দাঁড়ান…।
এই বলে অনুপম বক্সী টেবিলে রাখা ফোনের রিসিভার তুলে নিয়ে একটা নম্বর ডায়াল করল। তারপর নীচু গলায় কার সঙ্গে যেন কথা বলতে লাগল।
না, চেক পোস্টে বরং খবর পাঠিয়ে দাও—।
শুধু এই টুকরো খবরটুকুই আমার কানে এল।
মিনিটকুড়ি পরে সুইংডোর ঠেলে ঘরে ঢুকল টাক মাথা এক ভদ্রলোক। শক্তসমর্থ চেহারা, গালে দিনকয়েকের খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। পরনে সাধারণ চেক শার্ট, কোট ও টেরিলিনের প্যান্ট।
অনুপম বক্সী নীচু স্বরে আমাকে বলল, ডিটেকটিভ অফিসার চৌধুরী। একটা ডাকাতির কেসে হেড কোয়ার্টার থেকে এখানে এসেছেন। কিছুদিন থাকবেন। ওঁকে সব খুলে বলুন। যা জিগ্যেস করেন জবাব দিন।
চৌধুরী ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। আমার দিকে ভুরু উঁচিয়ে বলল, আপনিই বুঝি মিস্টার সান্যাল? বলার হয়তো দরকার নেই তবু বলে রাখছি: আপনি যা বলতে এসেছেন তা সত্যিকারের জরুরি হলেই আপনার পক্ষে মঙ্গল। ডিউটির জন্যে টানা চোদ্দো ঘণ্টা আমি না ঘুমিয়ে আছি। এখন বাড়ি যেতে পারলে বাঁচি।
কোনওরকমে বলতে শুরু করলাম, আমি একটা হাতের কথা বলতে এসেছি। আমার পাশের একটা স্টেশান ওয়াগনে হাতটা আমি দেখেছি।
হাত?—চৌধুরী অবাক হয়ে কাঁধ ঝাঁকল। তাকাল বক্সীর দিকে। বলল, সবরকমের মালই এখানে জোটে, তাই না বক্সী? ঠিক আছে, মিস্টার সান্যাল, বলুন—শুনি আপনার ওই হতচ্ছাড়া হাতের কথা।
সুতরাং আমার কাহিনির পুনরাবৃত্তি করলাম।
গল্পটা বলার সময় ভেবেছিলাম চৌধুরী হয়তো সামান্য হলেও অবাক হবে, উত্তেজিত হবে। কিন্তু সে একঘেয়ে বিরক্তির ভাব নিয়ে চুপচাপ বসে রইল। যখন তাকে আমার বাঁ হাতে লেখা স্টেশান ওয়াগনের নম্বরটা দেখালাম, সে হাই তুলে একটা নোটবই বের করে নির্বিকারভাবে নম্বরটা টুকে নিল।
আমার কথা শেষ হলে সে বলল, মিস্টার সান্যাল, জনগণের সেবা করাটাই আমাদের কর্তব্য। সবার প্রতি সমান মনোযোগ ও সম্মান দেখানোটাই আমাদের নীতি। কিন্তু সত্যি কি আপনি বিশ্বাস করেন যে, আপনার এই গাঁজাখুরি গপ্পোটা আমি বিশ্বাস করব? হতে পারে আপনি হয়তো আসলে জানলার কাচে কোনও ছায়া দেখেছেন। হয়তো চাদরের তলা থেকে এমন কিছু বেরিয়ে এসেছে যেটা দেখতে অনেকটা হাতের মতো। কিন্তু এটা তো মানবেন, রাস্তার ভিড়ে গাড়ির পেছনে চাদরে মোড়া ডেডবডি নিয়ে কেউ চলাফেরা করে না। ব্যাপারটা ভালো করে বুঝে দেখুন, মিস্টার সান্যাল। এবার চলুন, আমিও বাড়ি যাই, আর আপনিও বাড়ি ফিরে যান। এসব কথা ভুলে যান।
হয়তো তার কথায় রাজি হতাম। কিন্তু অবাক হলাম চৌধুরীর মুখের ভাব দেখে। তার মুখের অভিব্যক্তি চিৎকার করে যত না পারা যায় তার চেয়েও বেশি জোরে আমাকে পাগল কিংবা মিথ্যেবাদী বলছে। সুতরাং রাগে চেঁচিয়ে উঠলাম, না। বাড়ি যাব না।
এ-রাগের কিছুটা চৌধুরীর ওপর: আমাকে বিশ্বাস করছে না বলে। আর বাকিটা নিজের ওপর: এ ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি বলে।
একটা হাত আমি দেখেছি। মরা মানুষের হাত। আপনারা পুলিশের লোক। আপনাদের বললাম। এবার যা হোক কিছু একটা করুন।
চৌধুরী গভীর শ্বাস নিয়ে ধীরে-ধীরে নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর খেঁকিয়ে উঠল, ঠিক আছে, আমি এখুনি লোক লাগাচ্ছি। আপনি বাড়ি যান। যদি কিছু খুঁজে পাই আপনাকে জানাব। কিন্তু যদি স্টেশান ওয়াগনটা খুঁজে পাই এবং দেখি আপনার কথামতো কোনও ডেডবডি ওতে নেই, তা হলে মিস্টার সান্যাল, থিংস উইল বি ভেরি গ্রেভ ফর ইউ…।
