‘প্রথম-প্রথম আমি এ-শহর থেকে ও-শহর পালিয়ে বেড়াতাম। দু-মাস পর ক্লান্ত হয়ে আবার কলকাতায় ফিরে এসেছি। আর কোথাও আমি পালাতে চাই না। টু হেল উইথ দৌজ সুপারি কিলার্স। আই ওয়ান্ট টু ডাই ইন মাই ওন সিটি। যা হবে দেখা যাবে।’ বিরক্তি আর ঘেন্না নিয়ে কথা শেষ করল তিতলি।
‘তোমার কোনও বন্ধু নেই।’
‘এখন?’
ওর প্রশ্নে বিশ্বনাথ অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘না, আগে হোক, এখন হোক…।’
‘তিনজন কপালে জুটেছিল। কিলারদের কথা শোনামাত্রই দুজন সটকে পড়েছে। আর-একজন তো একটা এনকাউন্টারের মাঝে পড়ে গিয়ে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।’
‘এনকাউন্টার?’
‘হ্যাঁ। সেদিন রাতে জওহরলাল নেহরু রোডে যেমন হয়েছিল। দুটো লোক একটা গাড়ি নিয়ে আমাকে চেজ করেছিল। আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম, শুভ্র আমার পাশে বসে ছিল। হেকটিক কার চেজের পর কোনওরকমে ওদের কাটিয়ে দেখি শুভ্র ফেইন্ট হয়ে গেছে।’
হাসল তিতলি। বলল, ‘আর কিছু জানতে চান?’
বিশ্বনাথ মাথা নাড়লেন: ‘না!’
‘একমাত্র আপনাকেই দেখলাম, অকারণে ছুটে এসে বোকার মতো ডেঞ্জারাস সিচুয়েশানে নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন…।’
‘হয়তো আমি বোকা, ডেঞ্জারাস, তাই।’
‘আপনি কনভার্টেড ভ্যাম্পায়ার। সেজন্যেও হতে পারে।’
‘কে জানে! হতেও পারে—।’
‘কী অদ্ভুত ব্যাপার! আমার কথায় বারবার সায় দিচ্ছেন কেন?’
‘সায় দিতে ভালো লাগছে।’
অবাক হয়ে বিশ্বনাথের দিকে তাকাল তিতলি। তারপর উঠে দাঁড়াল: ‘চলুন, এবার শুরু করুন…।’
‘কী?’
‘আহা! ন্যাকা! বাইট।’
হতাশভাবে মাথা নাড়লেন বিশ্বনাথ। সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন। বললেন, ‘তোমার সঙ্গে পেরে ওঠা মুশকিল। চলো, বেডরুমে চলো…।’
বিশ্বনাথ যেরকম সহজভাবে ‘বেডরুম’ কথাটা বললেন, তিতলি তার চেয়েও সহজভাবে বলল, ‘এই ফ্ল্যাটের রুমগুলোর মধ্যে বেডরুমটা আমার সবচেয়ে ফেবারিট।’
ওরা শোওয়ার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
অন্ধকার ঘরে ঢুকেই তিতলি সুইচ টিপল। ঘরের সিলিং-এ ছড়িয়ে পড়ল নীল আলোর আভা। কিন্তু ল্যাম্পটা বিশ্বনাথের চোখে পড়ল না। শুধু দেখলেন, অদ্ভুত এক নীল মায়া ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে।
আর-একটা সুইচ টিপল তিতলি।
খুব নীচু লয়ে কোমল সুর জেগে উঠল কোথা থেকে। ঠিক যেন মায়ের আদর মাখা ঘুমপাড়ানি গান।
বিশ্বনাথ তিতলিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন। গাঢ় নীল অন্ধকার দিয়ে সেজে উঠেছে মেয়েটা।
ও হাতছানি দিয়ে ডাকল বিশ্বনাথকে।
বিশ্বনাথ পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেলেন ওর কাছে। কাঁধ আর গলার খাঁজে ঝুঁকে পড়লেন। পারফিউমের চড়া গন্ধ নাকে এল।
এক অদ্ভুত বিষণ্ণ আনন্দ বিশ্বনাথের মনে ঢেউ তুলছিল। আঙুলের ডগা দিয়ে কাঁধের কাছ থেকে ওর পোশাকটা একটু সরিয়ে দিলেন। তারপর আরও ঝুঁকে ঠোঁট রাখলেন ওর কোমল ত্বকে।
তিতলি হঠাৎই বিশ্বনাথকে জাপটে ধরল। চাপা গলায় বলল, ‘ওঃ, সিক্সটি টু!’
বিশ্বনাথ নাভিমূল থেকে কেঁপে গেলেন। পলকে যেন ছাব্বিশ হয়ে গেলেন। ওর উষ্ণ ঘনিষ্ঠতা বিশ্বনাথকে উষ্ণ করে তুলল। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল, সব কেমন গুলিয়ে গেল।
ভ্যাম্পায়ারদেরও তা হলে নেশা হয়!
ঠোঁট ফাঁক করে কামড় বসালেন বিশ্বনাথ। এক অলৌকিক চরম তৃপ্তি ওঁর ভেতরে কাজ করে চলল। তিতলির রক্তের স্বাদ জিভে টের পাচ্ছিলেন। একইসঙ্গে সিরাম গ্ল্যান্ডে চাপ পড়ছিল। নেশা চুঁইয়ে-চুঁইয়ে ঢুকছিল তিতলির শরীরে।
আগে খেয়াল করেননি, বিশ্বনাথ কখন যেন আঁকড়ে ধরেছেন মেয়েটাকে। দুজনের বুক প্রবল চাপে মিশে যাচ্ছিল। তার পরেও মেয়েটা বিশ্বনাথকে কাছে টানতে চাইছিল, পাগলের মতো করছিল।
সেই সময় বিশ্বনাথের ধারালো দাঁতের চাপে একটা রক্তের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। ওঁর মনে হল, এইরকম একটা আশ্লেষের আকাঙ্ক্ষায় লক্ষ বছর বেঁচে থাকা যায়। ওঁর জীবনে পশ্চিমদিকটা আচমকা পুবদিক হয়ে গেল যেন। যে-সূর্যটা অস্ত যাচ্ছিল, সেটা যেন কোন এক ম্যাজিকে ভোরের সূর্য হয়ে গেল।
তিতলির ঠোঁট চিরে একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে আসছিল। ঘুমিয়ে পড়ার ঘোরে বাচ্চারা যেমন আলতো ‘উঁ-উঁ’ শব্দ করে সেইরকম।
শব্দের তেজ ক্রমশ কমতে-কমতে শেষে একেবারে মিলিয়ে গেল। তিতলি শরীরের ভার ছেড়ে দিল বিশ্বনাথের হাতে।
বিশ্বনাথ ওকে যত্ন করে ধরে শুইয়ে দিলেন বিছানায়। পকেট থেকে স্টিকিং প্লাস্টার বের করে লাগিয়ে দিলেন ক্ষতের ওপরে। তারপর অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইলেন ওর ঘুম-ঘুম মুখের দিকে।
বিশ্বনাথ বিছানায় বসে পড়লেন। তিতলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মুখের ভেতরের নোনা আঁশটে স্বাদটা বারবার জিভ বুলিয়ে থুতু গিলে কমাতে চাইলেন।
বিশ্বনাথ নিজের নতুন জীবনের কথা ভাবছিলেন। কোথায় ছিলেন, আর কোথায় এসে পড়লেন। যে-জীবনটাকে প্রতিদিন ঘেন্নায় দূরে ঠেলতে চাইতেন, সেটাকে এখন তীব্র আকাঙ্ক্ষায় আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করছে।
এমন সময় দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল।
ঘোর ভেঙে গিয়ে চমকে উঠলেন বিশ্বনাথ। কে এল এ সময়? তিতলি তো বলেছিল, ওর সেরকম কোনও আত্মীয় কিংবা বন্ধু নেই!
ঝরনার শব্দ তুলে বেল বাজাল আবার।
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। তাড়াতাড়ি পা চালালেন ফ্ল্যাটের দরজার দিকে।
ডাইনিং রুমে কোনও আলো জ্বলছিল না। তবে ড্রইংরুমে জ্বলছিল। বিশ্বনাথ দরজার ম্যাজিক আই-তে চোখ রাখলেন।
