সুচরিতার মুখ দেখে বোঝা গেল, এই সাপের ভয় দেখানোর ব্যাপারটা ওর আগে থেকে জানা ছিল না। ও কিছুক্ষণ চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।
বিনু তখনও হাসছে। কোনওরকমে হাসি থামিয়ে ও বলল, ঝাসির রানি, এবার কাষ্ঠদণ্ডটিকে যথাস্থানে রেখে দাও।
সুচরিতা কেমন বোকার মতো দাঁড়িয়েছিল। বিনুর কথায় ও যেন সংবিৎ ফিরে পেল। খিলটা রেখে দিয়ে এল দরজার পাশে।
আমার বেশ রাগ হচ্ছিল বিনুর ওপর। ওর নতুন বিয়ে করা বউয়ের সামনে এ-ধরনের বদ-রসিকতা না করলেই কি চলছিল না!
বিনু সুচরিতাকে উদ্দেশ করে বলল, ডার্লিং, এইবার তো মানবে যে, আমার বন্ধুটি সাপের ভয়ে কাবু হয়েছে। তুমিও কিন্তু বেশ ভয় পেয়েছিলে। যদি তুমি আগে থেকে দড়ি আর সুতোর ব্যাপারটা জানতে তা হলে মোটেই ভয় পেতে না। এটাই হচ্ছে ভয় পাওয়ার মজা। একই ঘটনায় কেউ ভয় পায়, আবার কেউ পায় না। তা ছাড়া ভয় পাওয়ার মধ্যে কেমন বেশ একটা থ্রিল আছে। এই যেমন ধরো, বড় নাগরদোলা, কিংবা নিক্কো পার্কের ওয়াটার শুট বা রোলার কোস্টার। এসব খেলাতে ভয় করলেও আমরা চড়ে মজা পাই। কেন জানো? কারণ, আগে থেকেই আমাদের জানা আছে, ভয়টা মিথ্যে সত্যিকারের কোনও বিপদ আমাদের হবে না। এটাই হচ্ছে ভয় পাওয়ার মজা…।
কেয়া আমার হাতে ছোট্ট করে চিমটি কাটছিল? অর্থাৎ, এবার মানে-মানে বাড়ি চলো। আমারও কেমন অস্বস্তি লাগছিল। সুতরাং বিনুকে বলে উঠতে যাব, তখনই সুচরিতা পাথরের মতো গলায় বলে উঠল, আমি কিন্তু ভয় পাইনি।
বিনু হাসল আবার। বলল, তোমারও মনে ভয় আছে, সুচরিতা–সে তুমি স্বীকার করো আর না-ই করো। যেমন ধরো, ওই আলমারির লকারটা–ওটার কথা তোমাকে একটু বলি…।
ওঃ, বিনুর রসিকতা কি আর শেষ হবে না! ও তখন আঙুল তুলে দেখিয়েছে ঘরের এক কোণে দাঁড় করানো একটা সাড়ে ছফুট স্টিলের আলমারির দিকে। আলমারিটা একটু পুরোনো, রং ময়লা হয়ে গেছে। এ ছাড়া ওটার আর কোনও বিশেষত্ব নেই।
বিনু আমাদের মুখের ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে নেশা ধরানো গলায় নাটকীয়ভাবে বলে চলল, ঘটাং করে শব্দ করে স্টিলের আলমারির দরজা খুলি আমরা, তারপর ছোট মাপের একটা চাবি দিয়ে লকার খুলি। সাধারণত আমাদের যা হাইট তাতে লকারের ভিতর পর্যন্ত সরাসরি নজর যায় না–পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে দেখতে হয়। কী সুচরিতা, এরকম করেই তো লকার ব্যবহার করো তুমি?
সুচরিতা কোনও জবাব দিল না। কিন্তু ওর চোখের নজর আর চোয়ালের রেখায় জেদের ছোঁয়া টের পেতে কষ্ট হল না আমার। এ ছাড়া একটা অদ্ভুত সতর্ক ভাবও লক্ষ করলাম। যেন বুঝতে চাইছে, বিনু ঠিক কোন পথ ধরে কোন লক্ষ্যে পৌঁছোতে চাইছে।
পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে মাথা উঁচিয়ে যখন আমরা লকারের ভিতরে নজর চালাই তখনও। ভিতর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাই না। কারণ, ঘরের আলোটা সবসময় তেরছাভাবে এসে পড়ে, আর লকারটাও সুড়ঙ্গের মতো গভীর। সুতরাং, কোনও জিনিস–মানে, গয়নাগাটি বা অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে আমরা হাত ঢুকিয়ে দিই ওই সুড়ঙ্গের অন্ধকার গহ্বরে। তারপর অন্ধকারেই হাতড়াতে থাকি।
একটু থেমে বিনু মাথার চুলে হাত বোলাল। সুচরিতাকে লক্ষ করে হেসে বলল, ডার্লিং, এইবার আসল মজা। ধরো তুমি প্রায় কাঁধ পর্যন্ত হাত ঢুকিয়ে দিয়ে অন্ধকারে লকারের ভিতরটা হাতড়াচ্ছ, এমন সময় একটা হাত খপ করে তোমার হাতটা চেপে ধরল। তুমি প্রথমেই একটা মানসিক ধাক্কা খাবে, তার পর ভয়ে চিৎকার করে উঠে তোমার হাতটা টেনে বের করে নিতে চেষ্টা করবে। তুমি বেশ টের পাচ্ছ, হাতটা ঠান্ডা, পিছল, আর তার শক্তিও অনেক। সুতরাং তোমাদের টানাটানি চলছে। তুমি হয়তো বেশ খানিকটা টেনে নিতে পারলে তোমার হাত। তারপর আতঙ্কে উঁকি মারলে লকারের ভিতরে। তখন তোমার হাত লকারের অন্ধকার জায়গা থেকে খানিকটা আলোর দিকে চলে এসেছে। ফলে লকারের ভিতরের হাতটাকে তুমি দেখতে পেলে। তোমার ফরসা হাত আঁকড়ে ধরে আছে আলকাতরার মতো কালো চকচকে একটা হাত। তার ওপরে ছাতা ধরার দাগ। তুমি একটা পুরোনো ভ্যাপসা গন্ধও পেলে নাকে। আর অবাক হয়ে দেখলে, সাপের মতো সাতটা আঙুল প্রাণপণে তোমার ফরসা হাতটা আঁকড়ে ধরেছে। আঙুলগুলো অল্প-অল্প নড়ছে। হাতের বাকি অংশটা মিলিয়ে গেছে অন্ধকারে…। থামল বিনু। মুখে অদ্ভুত একটা শব্দ করে সুচরিতাকে বলল, এইরকম যদি হয়, তা হলে আমার ধারণা, তখন তুমি ভয়ে দিশেহারা হয়ে পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকবে। আর তার ওপর ঠিক তক্ষুনি যদি লোডশেডিং হয়ে যায়, তা হলে তো আর–।
বিনু, আজ আমরা উঠি। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঢের রসিকতা সহ্য করা গেছে।
দেখাদেখি কেয়াও উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুচি ঠিকঠাক করতে লাগল। ও বিনুর দিকে তাকিয়ে কষ্ট করে হেসে বলল, চলি, বিনুদা। সুচরিতাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে একদিন আসবেন কিন্তু।
বিনু কেমন বিচিত্র দৃষ্টিতে তাকাল আমাদের দিকে, বলল, তোমরা কি ভয় পেয়ে চলে যাচ্ছ নাকি? সবে তো নটা বাজে।
সুচরিতা হঠাৎ কেমন শক্ত গলায় বলে উঠল, আপনারা যাবেন না, বসুন। আমি এখনই ওই আলমারিটা খুলে ওর লকারের ভিতরে হাত ঢোকাব। দেখি, আমি ভয় পাই কি না।
আমি আর কেয়া অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না।
