বিনু সুচরিতাকে বলল, কী পাগলামো করছ, সুচরিতা! ওই লকারে তোমার হাত ঢোকানোর দরকার নেই। আলমারিটা পনেরো বছর ধরে বন্ধ আছে, বন্ধই থাক। পনেরো বছর ধরে আমরা কেউ ওটা খুলিনি। এখন ডিসটার্ব করার কী দরকার?
আমি অবাক হলাম। পনেরো বছর ধরে আলমারিটা খোলা হয়নি কেন? আর কাকেই বা ডিসটার্ব করার কথা বলছে বিনু?
সুচরিতা খিলখিল করে হাসল, বলল, পনেরো বছর ধরে আলমারিটা কেউ খোলেনি, আজ আমি খুলব বলে। তারপর চোয়াল শক্ত করে হনহন করে এগিয়ে গেল আলমারিটার কাছে। তার পাশেই দাঁড় করানো একটা টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা চাবি বের করে নিয়ে ঘটাং শব্দ করে খুলে ফেলল স্টিলের আলমারির দরজা।
আলমারির ভিতর থেকে ধুলো উড়ল কি না বোঝা গেল না, তবে একটা বিশ্রী পুরোনো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে।
বিনু একটু জোরেই বলে উঠল, সুচরিতা, লকার খুলো না বলছি! প্লিজ, আমার কথাটা শোনো, সুচরিতা, প্লিজ…লকার খুলো না!
কিন্তু সুচরিতা কোনও কথাই শুনল না।
আলমারির একটা পাল্লা ওকে অনেকটা আড়াল করে দিয়েছে। টিউব লাইটের আলোও আড়াল হয়ে গেছে সেইসঙ্গে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সুচরিতার নড়াচড়া দেখে আমরা বেশ আঁচ করতে পারছিলাম ও কী করছে।
আলমারির লকার খুলে তার ভিতরে প্রায় কাঁধ পর্যন্ত হাত ঢুকিয়ে পাল্লার পাশ থেকে আমাদের দিকে তাকাল সুচরিতা। হেসে বলল, এর ভিতরে কোনও কালো হাত নেই।
আমি আর কেয়া ঠিক বুঝতে পারছিলাম না এটা নতুন কোনও খেলা কি না। বিনু কি আগে থেকেই বউয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করে রেখে আমাকে আর কেয়াকে ভয় দেখাতে চাইছে?
কিন্তু আর কিছু ভেবে ওঠার আগেই সুচরিতা এক ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল। সে-চিৎকারে বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। এক ঝটকায় কেউ ওকে টেনে ধরল লকারের দিকে, কারণ ওর মুখটা বিশ্রী শব্দে আলমারির দরজার পাল্লায় বাড়ি খেয়ে চলে গেল আড়ালে। তারপর শুরু হল প্রাণান্তকর টানা-হ্যাঁচড়ার লড়াই।
বিনু তখনও নির্বিকারভাবে বসে আপনমনে বলে চলেছে, এত করে বারণ করলাম, তবুও তুমি শুনলে না। এত জেদ তোমার! সাহসের এত অহঙ্কার! তোমাকে বারবার করে বললাম, প্রত্যেক মানুষের মনেই ভয় আছে, কিন্তু তুমি আমার কথায় আমল দিলে না। এখন তো আর কিছু করার নেই….।
আমি আর কেয়া পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছি। সারা শরীর ভয়ে কাঠ, নড়বার এতটুকু ক্ষমতা নেই। আর আলমারির কাছ থেকে সুচরিতা পাগলের মতো চিৎকার করে চলেছে। ওর মুখ বিকৃত, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে, গাল কেটে রক্ত পড়ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে লোডশেডিং হয়ে ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।
কিন্তু তখনও সুচরিতার কানফাটানো আর্ত চিৎকার থামেনি।
