একটা টিউব লাইটের আলোয় ঘরটা তেমন স্পষ্ট ফুটে ওঠেনি। বিনু আর কেয়া বসেছিল বিছানার ওপরে। আমি টিভির সামনে একটা চেয়ারে, আর সুচরিতা অন্দরে যাওয়ার দরজার সামনে একটা মোড়ায় বসে।
বিনু বলল, এই বাড়িটা প্রায় সত্তর বছরের পুরোনো। ওই দরজাটার ওপাশে কী আছে। আমি জানি না। এখন মনে করো, রাতের অন্ধকারে ওই দরজায় যদি কেউ নক করে তখন আমার অবস্থাটা কী হবে! আমি ভয় পাব। অথচ আমাদের সদর দরজায় কেউ নক করলে আমরা দিব্যি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিই–মোটেই ভয় পাই না। তো বহুদিন ধরে বন্ধ ওই দরজাটার যদি রাতের অন্ধকারে ঠকঠক করে কেউ শব্দ করে তখন আমরা ভয় পাই কেন?
সুচরিতা বোগাস! বলে খালি কাপ-প্লেটগুলো গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল অন্দরের দিকে।
আমি কেয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, বুঝলে, এই হল বিনু।
আর কথাটা শেষ হতে না হতেই ওই বন্ধ দরজার ওপিঠে কেউ বেশ জোরে নক করল।
কেয়ার ঠোঁট চিরে অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এল। ওর চোখ বড় হল। একবার আমার দিকে, একবার বিনুর দিকে, আর একবার দরজাটার দিকে দেখতে লাগল ও। বিনুও দেখলাম অবাক হয়ে বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি থেমে-থেমে বললাম, কী রে, কী ব্যাপার?
বিনু কিছু বলে ওঠার আগেই আবার ঠকঠক শব্দ। তারপর আরও জোরে আবার। বারবার। যেন কেউ পাগল হয়ে নক করে চলেছে দরজার ওপাশে।
বিনু বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বিড়বিড় করে বলল, দাঁড়া, দরজাটা খুলে দেখি–। তার পর এগোল সেই রহস্যময় দরজার দিকে।
কেয়া এবার তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল–ভয় পাওয়া চিৎকার।
আমি উঠে একলাফে চলে গেলাম কেয়ার পাশে। ওকে জড়িয়ে ধরলাম। বিনু ফিরে তাকাল আমাদের দিকে। নক করার শব্দ তখন থেমে গেছে।
আর ঠিক তখনই সুচরিতা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে ঢুকল। অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, কী হয়েছে।
কেয়া হাঁপাতে হাঁপাতে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বিনু ওকে লক্ষ্য করে হেসে বলল, সুচরিতা, তুমি ওদের দরজার সিক্রেটটা বলে দাও।
সুচরিতা কেয়ার কাছে এসে ওর দুধে হাত রেখে বলল, মিছিমিছি ভয় পেয়েছ, ভাই। ও-দরজাটার ওপাশে আমাদের বাথরুম। আমিই গিয়ে ওখানে নক করছিলাম–তোমাদের সঙ্গে মজা করার জন্যে। ও আমাকে আগে থাকতেই শিখিয়ে রেখেছিল।
আমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেছি। কেয়ার চিৎকারে দোতলা তিনতলা থেকে কেউ যে নেমে আসেনি এই রক্ষে। তবে মনে পড়ল, বাড়িতে ঢোকার সময়ে দোতলা বা তিনতলার জানলায় আলো জ্বলতে দেখিনি।
কেয়া রুমালে চোখ মুছছিল, মুখ মুছছিল। বিনুর এই রসিকতা আমার মোটেই ভালো লাগেনি। সুচরিতা হাসি-ঠাট্টা করে ব্যাপারটা হালকা করতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা পুরোপুরি সহজ হতে পারছিলাম না। কোথায় যেন তাল কেটে গেল।
বিনু বিছানায় গিয়ে বসল আবার। বেডকভারে কয়েকবার আঁচড় কেটে বলল, এইজন্যেই আমি বলেছিলাম, আমাদের সবার মনেই ভয় আছে। সেটা যে সবসময় ঠিক মৃত্যুভয় তা নয়– তবে ভয়।
সুচরিতা শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলল, না মশাই, সবাই এত সহজে ভয় পায় না। দরজার আওয়াজ করাতে কেয়া হয়তো ভয় পেয়েছে, কিন্তু তোমার বন্ধু অত কাবু হয়নি। আর আমার কথা তো বাদই দাও। আমার বাবা জঙ্গলে, পাহাড়ে, মরুভূমিতে সার্ভের কাজ করতেন। আমি ছোটবেলা থেকেই বেপরোয়া নানা খানাখন্দে, পোড়ো জায়গায় রাতবিরেতে ঘুরে বেড়িয়েছি। ভূত-টুতে কোনও আস্থা নেই আমার।
বিনু সুচরিতাকে দেখল একবার। তারপর আমাকে লক্ষ করে বলল, সুচরিতাকে এই সহজ ব্যাপারটা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না যে, ভূত নেই, কিন্তু ভয় আছে। সুস্থ মানুষ তো বটেই–এমনকী পাগল পর্যন্ত ভয় পায়। আচ্ছা বলো তো, বিছানার ওপাশটায় ওটা কী?
আমি বিছানার খুব কাছেই দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু বিনু বলার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যাপারটা খেয়াল করিনি।
বিছানার কালো আর গোলাপি ফুলকাটা একটা চাদর ঢাকা ছিল। লক্ষ করলাম, বালিশের কাছটায় চাদরের নীচে লম্বা দড়ির মতো কী একটা এঁকেবেঁকে পড়ে আছে। তার ওপরে চাদর থাকা সত্ত্বেও জিনিসটা সড়সড় করে অল্প-অল্প এগোচ্ছে।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার মুখ দিয়ে আতঙ্কের চিৎকার বেরিয়ে এল, সাপ সাপ!
ততক্ষণে সুচরিতা আর কেয়াও বস্তুটি দেখতে পেয়েছে। কেয়া হোঁচট খাওয়া এক আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু সুচরিতা শক্ত ধাতের মেয়ে। ও দরজার পাশে দাঁড় করানো কাঠের খিলটা তুলে নিয়ে সপাটে বসিয়ে দিল চলমান সরীসৃপটির ওপরে। ওই সঙ্কটের মধ্যেও লক্ষ করলাম, সুচরিতার চোখেমুখে আতঙ্কের ছায়া।
কিন্তু সরীসৃপটি তখনও দিব্যি নড়ছে চাদরের তলায়। সুচরিতার প্রথম আঘাত তাকে বিন্দুমাত্রও কাবু করতে পারেনি। সুচরিতা উত্তেজিত হয়ে দ্বিতীয়বার আঘাত করল। কিন্তু তাতেও লাভ হল ন।
এইরকম একটা বিপন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি যখন কিছু একটা করার কথা ভাবছিা, ঠিক তখনই বিনু হো-হো করে হেসে উঠল। তারপর একটানে বেডকভারটা সরিয়ে দিল একপাশে।
সবুজ রঙের একটা মোটা নাইলনের দড়ি এঁকেবেঁকে পড়ে আছে বিছানায়। তার একপ্রান্ত থেকে একটা সরু সুতো চলে গেছে বিনুর কাছে। ওটায় টান মেরেই বিনু রজ্জুতে সর্পভ্রমের ব্যবস্থা করেছিল। সবটাই বিনুর চালাকি আর হাতের কাজ।
