আচ্ছা, একটা লাস্ট রিকোয়েস্ট করব আপনাকে? একটা কথা রাখবেন আমার? আমাকে ফাঁসি দেবেন? কিংবা যাবজ্জীবন? প্লিজ, আপনার পায়ে ধরছি, ইন্সপেক্টর। হ্যাঁ, আমিই খুন করেছি কাকাকে। আমিই খুন করেছি। আমি-আমি আমি! এবার অন্তত আমাকে আপনি অ্যারেস্ট করুন। প্লিজ, অ্যারেস্ট করুন আমাকে…।
আসুন, রাকেশের ওই দুরন্ত ভালোবাসার কাছে অন্তত একটিবারের জন্যে আমরা হেরে যাই…।
মনে ভয় আছে
কফির কাপে প্রথম চুমুকটা দিয়ে বিনু বলে উঠল, তোদের আজ একটা অদ্ভুত গল্প শোনাব।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেয়ার দিকে তাকিয়ে মুখের একটা ভঙ্গি করলাম–যার অর্থ হল, তোমাকে বলেছিলাম না! এবার শোনো বিনুর গল্প!
বিনু আমার অনেকদিনের বন্ধু। কিন্তু ওর সঙ্গে দেখা হয় এলোমেলোভাবে, কয়েক বছর পরপর। ও ফোন করে, নয়তো চিঠি দেয়, কিন্তু সবই একতরফা। কারণ ওর ঠিকানার কোনও ঠিক নেই। সুতরাং ইচ্ছে হলেও ওকে ফোন করার বা চিঠি দেওয়ার কোনও উপায় নেই।
এবারও হঠাৎই ওর চিঠি পেয়েছিলাম। খুব ছোট্ট চিঠিঃ
বিয়ে করেছি। বউ নিয়ে সাতদিনের জন্যে কলকাতা যাচ্ছি। ২৭ তারিখ কলকাতা ছাড়ব। ২৬ তারিখ, শনিবার, কেয়াকে নিয়ে চলে আয়। চায়ের নেমন্তন্ন রইল। আর খুব মজার গল্প শোনাব।
চিঠির শেষে ওর কলকাতার আস্তানার ঠিকানা এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছোতে হবে তার নির্দেশ।
বিনুর ব্যাপারটাই এইরকম। ছন্নছাড়া, খামখেয়ালি। আর যত উদ্ভট বিষয় নিয়ে চর্চা। ওর সবকিছুই রহস্যময়।
বিনুর বউয়ের নাম সুচরিতা। রাজস্থানের কোথায় গিয়ে যেন আলাপ, তারপর দিল্লিতে বিয়ে। বিনুর ব্যাপারে যদি এরপর কাশ্মীরে গিয়ে বউভাত হয়ে থাকে, তা হলেও আমি অবাক হব না।
কেয়াকে বিনুর অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপারের কথা বলেছিলাম। বিনুকে ও আগে দেখেনি। আমার কাছে ওর কথা শুনেছে, আর দু-একবার ফোনে কথা বলেছে।
ওর নতুন বউয়ের জন্যে একটা শাড়ি কিনে অনেক অলিগলি পেরিয়ে অবশেষে বিনুর আস্তানার পৌঁছোলাম। জরাজীর্ণ তিনতলা বাড়ির ফ্ল্যাট। যদিও ফ্ল্যাট শব্দটা এই বাড়ির সঙ্গে মোটেই খাপ খায় না। এ-বাড়ির কথা ও আগে কখনও আমাকে বলেনি।
আমাকে দেখতে পেয়েই বিনু একেবারে জড়িয়ে ধরল। বউদের আলাপ করিয়ে দিল। বেশ খানিকক্ষণ ধরে হইহই করল সবাইকে নিয়ে। স্কুলজীবনের কয়েকটা সত্যি-মিথ্যে ঘটনা বলে সুচরিতা আর কেয়ার সামনে আমাকে সে হেনস্থা করল। তারপর চায়ের নেমন্তন্ন উপলক্ষ্যে সুচরিতা কফি, সিঙাড়া, কাজুবাদাম আর পাঁপড়ভাজা নিয়ে এসে সাজিয়ে দিল সামনে।
কফির কাপে প্রথম চুমুক দিয়ে বিনু যে কথাটা বলল তারই জের টেনে মন্তব্য করল, আমাদের প্রত্যেকের মনেই ভয় আছে।
সুচরিতা বেশ কথাটথা বলতে পারে। ওর মিষ্টি মুখের মধ্যে কোথায় যেন একটা সপ্রতিভ জেদি ভাব রয়েছে! ও সঙ্গে-সঙ্গে পালটা প্রশ্ন করল বিনুকে, কীসের ভয়?
বিনু নির্বিকারভাবে সিঙাড়ায় একটা কামড় দিয়ে বলল, মৃত্যুভয়। তারপর কফির কাপে শব্দ করে পরপর দুটো চুমুক দিয়ে আরও বলল, অনেক সময়, ধরো, আমরা জানি যে, আমাদের কোনও ক্ষতি হবে না, তা সত্ত্বেও আমরা ভয় পাই। মানুষের মনের এ এক অদ্ভুত ব্যাপার।
আমি দিব্যি তৃপ্তি করে কাজুবাদাম খাচ্ছিলাম, বিনুর কথায় থেমে গেলাম। ও কী বলতে চাইছে? এ যেন অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতো শোনাচ্ছে! তো হেসে সেই কথাটাই বললাম ওকে।
ও একটা হাত নাড়ল শূন্যে। বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, দাঁড়া, একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। ছোটবেলায় আমরা একটা খেলা খেলতাম মনে আছে, প্রশ্ন-উত্তরের খেলা? একজন বন্ধু আর-একজনকে জিগ্যেস করত, আমার সঙ্গে জঙ্গলে যাবি? তখন দ্বিতীয়জন জানতে চাইত, কী করতে? উত্তরে প্রথমজন বলত, বাঘ মারতে। দ্বিতীয় বন্ধু তো রাজি, হ্যাঁ যাব। সেটা শুনে প্রথমজন সতর্ক করে দেওয়ার ভঙ্গিতে জিগ্যেস করত, ভয় পাবি না তো? দ্বিতীয়জন বুক ফুলিয়ে বলত, না। আর তক্ষুনি প্রথমজন দ্বিতীয়জনের চোখের সামনে আচমকা হাত নেড়ে ভয় দেখাত, এবং নির্ভীক সাহসী বন্ধুটির চোখের পাতা পড়ে যেত। তুই তো জানিস, ব্যাপারটা স্রেফ রিফ্লেক্স মানে, প্রতিবর্তী ক্রিয়া। সাহসী বন্ধুটি বেশ ভালো করেই জানে যে, বন্ধু কিছুতেই তার চোখে মারবে না কিন্তু সব জেনেশুনেও তার চোখের পাতা পড়ে যায় আত্মরক্ষার তাগিদে। এ ব্যাপারটাকে তুই কী বলবি?
প্রশ্নটা বিনু আমাকে লক্ষ্য করে করলেও উত্তর দিল কেয়া। বলল, বিনুদা, আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে একেবারে অকারণে কি কেউ ভয় পায়?
বিনু পাঁপড়ভাজা আর কফি আরাম করে শেষ করল, তারপর বলল, আচ্ছা, ওই দরজাটার কথাই ধরা যাক।
আঙুল তুলে ঘরের পশ্চিমের দেওয়ালের ঠিক মাঝখানে লাগানো একটা বন্ধ দরজার দিকে দেখিয়েছে বিনু। দেখেই বোঝা যায়, দরজাটা বহু বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। যে-ই ওটা বন্ধ করে থাকুন না কেন, সে ওটা বরাবরের মতো বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছে। খিল-ছিটকিনি ছাড়াও আড়াআড়ি দুটো কাঠ পেরেক ঠুকে আটকে দেওয়া রয়েছে বন্ধ পাল্লার ওপরে। আর তার সামনে দুটো ট্রাঙ্ক আর সুটকেস ওপর-ওপর সাজানো।
বিনুর ঘরটা মাপে বেশ বড় এবং বেশ পুরোনো। দেওয়ালের হালকা নীল রঙের ওপরে ড্যাম্প আর সময়ের ছাপ পড়েছে। সিলিং-এ কাঠের কড়ি। সেখান থেকে ঝুলছে মান্ধাতার আমলের ডি. সি. পাখা। তা থেকে কিচকিচ আওয়াজ বেরোচ্ছে। ঘরের উত্তরের দেওয়ালে একটাই জানলা। সেটা দিয়ে প্রথম শীতের মোলায়েম ঠান্ডা বাতাস ঢুকে পড়ছে ঘরে।
