কথা কাটাকাটি করতে-করতেই ওরা ‘রিল্যাক্স’-এর বাইরে বেরিয়ে এল।
শেষ পর্যন্ত তিতলি এমন কথাও বলে বসল, ‘আপনি এত আপত্তি করছেন কেন বুঝতে পারছি না। যা চার্জ লাগে আমি দেব…।’
বিশ্বনাথ যে বেশ আহত হলেন সেটা ওঁর মুখ-চোখ দেখেই বোঝা গেল। আর কোনও তর্কাতর্কির মধ্যে গেলেন না। তিতলির সঙ্গে সোজা গাড়িতে গিয়ে উঠলেন।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই বিশ্বনাথ জিগ্যেস করলেন, ‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?’
‘আমার ফ্ল্যাটে—এখন বাইরে ডিনার করতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। তার চেয়ে ফ্রিজের লেফট ওভার গরম করে দুজনে খেয়ে নেব, কেমন।’ গাড়ি চালাতে-চালাতে বলল তিতলি। চোখ সামনের রাস্তার দিকে। আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। কখন যেন ধরিয়েছে।
বিশ্বনাথ কয়েক পলকে ওকে দেখলেন। তারপর বললেন, ‘আমি নেমে যাব। বাইট কোথায় পাওয়া যায় সে-কনট্যাক্ট নম্বর তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি। আমাকে নামিয়ে দাও…।’
তিতলি তাকাল। হাসল। বলল, ‘রাগ হয়েছে? অন্য কারও কাছে বাইট নেব না—আপনার কাছেই নেব।’
‘কেন?’
‘আপনি স্পেশাল, তাই—।’
‘কেন, স্পেশাল হতে যাব কেন?’
খিলখিল করে হাসল তিতলি। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘রিল্যাক্স-এ তো প্রচুর লোক নেশা করছিল—আপনি শুধু আমাকে বারণ করলেন কেন?’
বিশ্বনাথের মুখে রক্তের ঝলক ছুটে এল। লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেলেন।
তিতলি থুতনি উঁচু করে বলল, ‘আপনাকে আমি গাড়ি থেকে নামতে দেব না। দেখি আপনি কী করেন।’
বিশ্বনাথ একটা বড় শ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমি কিছুই করব না। হেরে ভূত হয়ে গেছি।’
‘দ্যাটস লাইক আ গুড বয়। আমি চাই আমাকে আজ রাতে ভূতে ধরুক।’
বিশ্বনাথ চমকে উঠে তিতলির দিকে তাকালেন। ও তখন একমনে সিগারেটের টান দিয়ে চলেছে।
ফ্ল্যাটে এসে ওদের আর-একদফা তর্কাতর্কি শুরু হল। চলল জেদ আর বায়নার দড়ি টানাটানি।
শেষে তিতলি চোখ কুঁচকে, ঠোঁট উলটে, একটা আঙুল দেখিয়ে আন্তরিকভাবে বলল, ‘বাষট্টি, প্লিজ…একবার। জাস্ট একবার…।’
বিশ্বনাথ তা সত্ত্বেও গাঁইগুঁই করছিলেন।
তখন তিতলি ব্যথা পাওয়া গলায় বলল, ‘আপনাকে তো আগেই বলেছি, আমার হাতে বেশি সময় নেই। হয়তো বাইট কেমন সেটা আর জানাই হবে না কখনও…। একটা দুঃখ থেকে যাবে, বাষট্টি।’
‘কেন, সময় নেই কেন?’ বিশ্বনাথের জেদ নমনীয় হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল, এর আগেও একদিন তিতলি এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে গিয়েও দেয়নি।
সোফাতে হেলান দিয়ে হাতদুটো ওপরে তুলে সোফার পিছনে ঝুলিয়ে দিতে চাইল মেয়েটা। তারপর ঘষা কাচের মতো চোখ মেলে তাকিয়ে রইল বিশ্বনাথের দিকে।
কিছুক্ষণ সময় নিয়ে যেন অনেক কষ্টে বিশ্বনাথকে ফোকাস করল। তারপর ক্লান্ত গলায় বলল, ‘আজ আপনাকে বলব…সব বলব।’
বিশ্বনাথ চুপ করে রইলেন। অপলকে বাইশকে দেখতে লাগলেন। ওঁর বুকের ভেতরটা কেমন করতে লাগল।
বাইশ বলতে শুরু করল।
‘আপনাকে কখনও বলা হয়নি। আমরা…আমরা জঘন্য বড়লোক। আমাদের দুটো কয়লা খনি, আর একটা অভ্র খনি আছে। এ ছাড়া আর যা-যা থাকে…বড়লোকের। মানে, কলকাতায় তিনটে বাড়ি, রাজারহাটে একটা বাগানবাড়ি। আর তিনটে গাড়ি…আমারটা নিয়ে।
‘যদিও ”আমাদের”, ”আমাদের” বলছি…আসলে এসবের মালিক এখন আমি একা। সব আমার। কারণ, দু-বছর আগে আমার মা-আর বাবা হাইওয়েতে…এনএইচ-থার্টিফোর-এ…একটা হরিবল অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। স্পট ডেড।
‘আগে মনে-মনে একা ছিলাম, অ্যাক্সিডেন্টটার পর সত্যি-সত্যি একা হয়ে গেলাম। এক কাকা ছাড়া আর কেউ রইল না। আর সেই কাকা…কাকা আমাকে পাগলের মতো তাড়া করে বেড়াতে লাগল।’
তিতলি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ডানহাত নামিয়ে চোখ ঢাকল।
বিশ্বনাথ বিড়বিড় করে বললেন, ‘…তাড়া করে বেড়াতে লাগল কেন?’
চোখ ঢেকে বড়-বড় শ্বাস নিচ্ছিল তিতলি। ওর বুকের ওঠা-নামা দেখে সেটা বুঝতে পারছিলেন বিশ্বনাথ।
একটু পরেই ও চোখ থেকে হাত সরাল। তারপর বারদুয়েক নাক টেনে বলল, ‘কাকা আসানসোলে থাকতেন। মাইনগুলো দেখাশোনা করতেন। তার জন্যে বাবা টাকা দিত মাসে-মাসে। কিন্তু ওই রোড অ্যাক্সিডেন্টটার পর কাকা একেবারে খেপে গেলেন। একে ওই কোটি-কোটি টাকার প্রপার্টি…আর তার সঙ্গে লোভ। বছরদেড়েকের মধ্যেই আমার কাছে তিনি ধরা পড়ে গেলেন। আমাকে বোকা বানিয়ে তিনি সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার তাল করতে লাগলেন। আমি বুঝতে পেরে বাধা দিলাম। লোকজানাজানি হয়ে গেল। আর তখনই বাধল ঝামেলা।
‘আমাকে কিডন্যাপ করে কাকার একটা লুকোনো আস্তানায় তোলার জন্যে কাকা সুপারি দিয়ে প্রফেশন্যাল হুডলামদের লাগিয়ে দিলেন। কারণ, কাকা সম্পত্তি আইনমাফিক কবজা করতে গেলে কয়েকটা ডকুমেন্টে আমার সাইন দরকার। তো সেই লোকগুলো আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, সুযোগ খুঁজছে। ওরা কখনও আমাকে ফোন করে ভয় দেখায়। কখনও ফলো করে। কখনও-বা ফ্ল্যাটের দরজায় এসে সময়ে-অসময়ে কলিংবেল বাজায়।
‘প্রথম-প্রথম আমি ভীষণ ভয় পেতাম। তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। বুঝলাম, ফালতু ভয় পেয়ে আর লাভ নেই—মরতে হবেই। কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না। তা ছাড়া একে-একা কারই-বা সেরকম বাঁচতে ইচ্ছে করে!’
তিতলি একটু থামতেই বিশ্বনাথ জিগ্যেস করলেন, ‘কেন? তুমি তো পুলিশে খবর দিতে পারো…।’
‘দিয়েছিলাম’। তেতো হাসল: ‘কোনও লাভ হয়নি। ওরা কাউকে ট্রেস করতে পারেনি। খুন-টুন হলে তারপর ক্লু পাওয়া যায়। খুনের আগে থেকেই এগুলো এক্সপেক্ট করাটা বড্ড বাড়াবাড়ি। এ-কথা একজন পুলিশ অফিসার আমাকে বলেছেন।’
