নেহা আপনমনে বিড়বিড় করে বলে চলল, আমাদের বাড়িতে যেসব মেহমান আসে তাদের আমরা সঙ্গে নিয়ে যাই। আমরা…ওখানে গেলে আপনি ফোটো খিচতে পারবেন। শেষ কথাটা নেহা বেশ উৎফুল্ল ঢঙে বলল। উৎসাহ নিয়ে তাকাল ভূতনাথের দিকে।
প্রিয়নাথের মধ্যে কেমন একটা মরিয়া ভাব জেগে উঠেছিল। তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন,
সুনীতবাবু তোমাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন…ছবি তুলতে…।
হ্যাঁ, গিয়েছিলেন। ঘাড় নেড়ে বলল নেহা। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল, ওই বাবুর নাম তো জানি না।
আমি আজ তোমাদের সঙ্গে যাব।
চাটাই ছেড়ে উঠে পড়ল নেহা। খুশির গলায় বলল, যাই, মা আর পিতাজিকে বলে আসি। রাতে আপনার খাওয়া হলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।
খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে গাঢ় আঁধার ও শীতের মধ্যে প্রিয়নাথ যখন ওদের সঙ্গে বেরোলেন তখন রাত সাড়ে নটা।
শীতের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে প্রিয়নাথের চেহারা মাপে প্রায় সুমো যোদ্ধাদের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছে। সঙ্গের ঝোলা ব্যাগে ক্যামেরা ছাড়াও নিয়েছেন, টর্চ, টর্চের ব্যাটারি, কম্পাস, থার্মোমিটার আর পেন্ডুলাম।
অন্ধকারে কুয়াশা ভেদ করে আরও অন্ধকার পাঁচটা ছায়া এগোচ্ছিল। সকলের আগে প্রিয়নাথ আর নেহা। পিছনে বাকি তিনজন। কারও মুখে কোনও কথা নেই। যেন শবানুগমনে চলেছে সবাই।
প্রিয়নাথ হঠাৎই হোঁচট খেলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে টর্চ জ্বাললেন। নেহা সঙ্গে-সঙ্গে বলল, আলো নিভিয়ে দিন, বাবুজি। আমি আপনার হাত ধরছি।
অন্ধকারে প্রিয়নাথের হাত ধরল নেহা।
স্পর্শে সম্মোহন করা যায় কি না প্রিয়নাথ জানেন না। আর প্রিয়নাথের যেরকম মন এবং বয়েস তাতে কিশোরী নেহাকে নিয়ে কোনওরকম অন্যায় কল্পনা তাঁর কাছে নেহাতই হাস্যকর। কিন্তু তবুও কোনও এক রহস্যময় কারণে নেহার হাত ছুঁতেই প্রিয়নাথ কেমন এক অলৌকিক ভরসা পেলেন।
আকাশ মেঘলা, চঁদ দেখা যাচ্ছে না। প্রিয়নাথদের ঘিরে রেখেছে গাঢ় কুয়াশার স্তর। বেশি দূর নজর চলে না। ঠান্ডা বাতাস যেন বাতাস নয় বরফ। প্রিয়নাথ জ্যাকেটের ওপরে শাল জড়িয়েছেন। সেটাকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছেন শরীরে। আড়ষ্টভাবে সাবধানে পা ফেলছেন। অথচ নেহার চলা কত সহজ-স্বাভাবিক! এ-পথ নিশ্চয়ই ওর অনেক চেনা।
বেশ কিছুক্ষণ পথ হাঁটার পর প্রিয়নাথের সময়, দিক, সবই গুলিয়ে গেল। অকারণেই একটা ভয় তার মনের ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইল। তিনি লড়াই করে সেটাকে চৌকাঠের বাইরে আটকে রাখলেন।
সেইরকম একটা মনের অবস্থাতেই তিনি চাপা গলায় নেহাকে জিগ্যেস করলেন, নেহা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
একটু পরেই দেখতে পাবেন নেহা এত অস্পষ্ট গলায় কথাটা বলল যে, বেশ চেষ্টা করে ওর কথা শুনতে পেলেন প্রিয়নাথ।
মিনিটখানেক চুপ করে থাকার পর নেহা আবার কথা বলল।
যেখান দিয়ে আমরা হেঁটে যাচ্ছি, বহত দিন পহেলে এখানে একটা গ্রাম ছিল। সে-গাঁয়ের নাম ছিল তিনকাহানি। তিনকাহানির শেষে ছিল বড় বড় মাঠ, খেত। তারপরে সদরিয়া। তিনকাহানি আর সদরিয়ার বর্ডারে আমরা থাকতাম…।
থাকতাম! তার মানে!
নেহা! প্রিয়নাথ ডেকে উঠলেন। নেহার হাতটা হঠাৎই শীতের চেয়েও ঠান্ডা মনে হল।
ভয় পাবেন না, বাবুজি। বলেই নেহা প্রিয়নাথের হাতটা ছেড়ে দিল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই ওর ছায়া-শরীরটা কুয়াশায় মিলিয়ে গেল।
নেহা! প্রিয়নাথ ডেকে উঠলেন আবার। পিছন ফিরে তাকালেন।
যে-তিনজন এতক্ষণ ধরে নিঃশব্দে ওঁদের অনুসরণ করছিল তারা কেউ নেই। সেখানে শুধুই কুয়াশা।
প্রিয়নাথ টর্চ জ্বাললেন। সেই আলোয় কম্পাসটা বের করে দেখলেন। উত্তরমুখী কাটা দক্ষিণদিকে মুখ করে স্থির হয়ে আছে!
আলোটা নিভিয়ে দিন, বাবুজি।
নেহার গলা!
হতবুদ্ধি প্রিয়নাথ টর্চ নিভিয়ে দিলেন। কিন্তু চারপাশে কাউকে দেখতে পেলেন না।
টর্চ আর কম্পাস ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতেই নেহা আবার কথা বলল।
দাঁড়াবেন না, বাবুজি, চলুন–আমি আপনার পাশে-পাশেই আছি।
তোমার পিতাজি-মাজি ওঁরা কোথায় গেলেন?
অন্ধকার ভেদ করে নেহার গলা ভেসে এলঃ ওঁরা এগিয়ে গেলেন। একটু পরে আমরাও সেখানে পৌঁছে যাব।
আন্দাজে ভর করে পা ফেলতে লাগলেন প্রিয়নাথ। তিনি পোড়খাওয়া মানুষ। তা সত্ত্বেও বেশ নাড়া খেয়ে গেছেন। সুনীতনারায়ণের বয়েস অনেক কম। ওর অবস্থাটা কী হয়েছিল তিনি সেটা মনে-মনে আঁচ করার চেষ্টা করলেন।
হঠাৎই শীতটা যেন বেড়ে গেল। সামনেই দেখা গেল একটা বিশাল পুকুর। এই গাঢ় আঁধারেও জলের কোথাও কোথাও প্রতিফলন চোখে পড়ছে। বাকি অংশটা এক অদ্ভুত কুয়াশার ঢাকা।
পুকুরটা পেরোতেই কুয়াশা যেন ফিকে হয়ে এল। কয়েকটা ছোট-বড় গাছ চোখে পড়ল প্রিয়নাথের। গাছগুলো এপাশ-ওপাশ দুলছে। অথচ বাতাস তেমন জোরে বইছে না। আর তখনই গাছের ওপরে গাঢ় আকাশে একটা নীল আভা দেখতে পেলেন প্রিয়নাথ। অনেকটা মা কালীর গায়ের গাঢ় নীল রঙের মতো।
নেহা! ডেকে উঠলেন প্রিয়নাথ।
আমি আপনার পাশে আছি, বাবুজি। কেমন যেন ব্যথা পাওয়া গলায় নেহা বলল। মনে হল, ওর ভেতরে একটা কষ্ট হচ্ছে।
এমন সময় একটা গুনগুন শব্দ শোনা গেল। যেন অনেকে মিলে চাপা গলায় সুর করে গান গাইছে।
খুব নীচু পরদায় শুরু হয়ে সেই সমবেত গান উঁচু পরদায় উঠতে শুরু করল। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও প্রিয়নাথ সেই অদ্ভুত ভাষার অর্থ বুঝতে পারলেন না। তবে সেই কোরাস ক্রমশ আকাশ বাতাস ছেয়ে ফেলছিল।
