হঠাৎই সামনে তাকিয়ে হকচকিয়ে গেলেন প্রিয়নাথ।
দূরের মাঝারি গাছের মাঝে কোথা থেকে এসে যেন হাজির হয়েছে প্রকাণ্ড এক মহীরুহ। তার ঝাকড়া মাথা থেকে অসংখ্য ঝুরি নেমে এসেছে মাটিতে। কেমন অদ্ভুতভাবে হেলে গাছটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর গাছের অন্ধকার শরীরে জোনাকির মতো জ্বলছে অসংখ্য লাল আলো বিন্দু।
ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করলেন প্রিয়নাথ। অদ্ভুত গাছটা তাক করে শাটার টিপলেন। আর তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল সুনীতের তোলা ফটোগ্রাফটার কথা। এই সেই ফটোর রহস্য! কিন্তু এই গাছ দেখে ভয় পাওয়ার কী আছে!
ক্যামেরা ব্যাগে রাখতেই অদৃশ্য নেহার গলা শোনা গেল : ছবি দেখে সবকুছ মালুম হবে না, বাবুজি। আরও নজদিক চলুন।
সম্মোহিতের মতো এগোতে লাগলেন প্রিয়নাথ। হঠাৎই একটা বাতাসের ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে গেলেন যেন। বরফের মতো বাতাস তাকে ঘিরে মাথা খুঁড়ে মরতে লাগল। প্রিয়নাথের হাত-পা ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। অতীন্দ্রিয় ক্ষমতায় যেন বুঝতে পারলেন, এখানে কম্পাস বা পেন্ডুলাম বের করে কোনও লাভ নেই। তিনি এক অন্য ঠিকানায় পা রেখেছেন।
কোরাস গান এখনও বেশ জোরালো ঢঙে শোনা যাচ্ছিল। উঠছে, নামছে। যেন কয়েকশো মানুষ প্রাণপণে গলা মিলিয়ে সুর ধরেছে। সঙ্গে কোনও যন্ত্র-অনুষঙ্গ নেই।
হঠাৎই আকাশের নীল আভাটা নেমে এল সেই অলৌকিক গাছের গায়ে। আর তখনই প্রিয়নাথ–এতক্ষণ যা দেখতে পাননি তাই দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়নাথের হাত-পা অবশ হয়ে এল। ভয়ংকর শীতেও কুলকুল করে ঘেমে গেলেন। ভয়ে চিৎকার করার জন্য হাঁ করলেন, কিন্তু কোনও শব্দ বেরোল না।
অসংখ্য মানুষ জড়াজড়ি করে গাছটা তৈরি করেছে। গাছের ডালপালা নিছকই ওদের হাত পা। নেমে আসা ঝুরি ওদের হাত, হাতের বাঁকানো আঙুল, মহিলাদের লম্বা ঝুলে পড়া চুল। উল দিয়ে বোনা সেয়েটারের মতো ওরা নিজেদের শরীর দিয়ে বুনে ফেলেছে এই প্রকাণ্ড গাছ। ওদের সমবেত শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে-সঙ্গে গাছটা ফুলে উঠছে, চুপসে যাচ্ছে। আর হাপরের মতো ফোঁস ফোঁস শব্দে নিঃশ্বাসের ঝড় উঠছে। সেই ঝড়ে প্রিয়নাথের চাদর উড়ছে, চুল উড়ছে।
মানুষগুলোর চোখের কোটরে ভয়ংকর তীব্র এক লাল আলো জ্বলছে–যেন জ্বলন্ত কয়লার টুকরো। এই চোখগুলোকেই দূর থেকে লাল আলোর বিন্দু বলে মনে হচ্ছিল। সুনীতের তোলা ফটোয় যেমন উঠেছে।
প্রিয়নাথ কখনও ভয়ের এত কাছাকাছি আসেননি। তার শরীরের ভেতরটা কেমন করছিল। মাথা টলে যেতে চাইছিল বারবার।
কোরাস আর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ কেমন যেন নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল। সেই সঙ্গে গাঢ় নীল আলোর আভা, আর তার মাঝে উজ্জ্বল লাল বিন্দুর ঝাঁক যেন অলৌকিক এক সম্মোহন।
বহুদূর থেকে ভেসে এল নেহার গলা : গাঁয়ে মড়ক লেগেছিল, বাবুজি। তাতে তিনকাহানির সবাই খতম হয়ে গেল। সব কাহানি খতম হয়ে গেল। সে বহত সাল পহেলে কি বাত। তারপর থেকে আমরা…ওই গাছেই একজোট হয়ে থাকি। রোজ রাতে এসে এই গাছটা আমরা তৈরি করি। দিনের বেলা আমাদের কেউ দেখতে পায় না। আর, রাতে আমরা ইচ্ছেমতন কাউকে দেখা দিই, কাউকে দিই না। মেহমানদের সেবা করতে আমরা ভালোবাসি। তাই পরদেশিবাবুদের মদদ করি, দেখা দিই। আমরা যে রাতে এখানে এসে এমন করে থাকি সেকথা কাউকে বোলো না, বাবুজি। কিসিকো নহি বাতানা…।
সমবেত কণ্ঠস্বর নেহার কথার সুর মিলিয়ে ফিশফিশে গলায় বলে উঠল, কিসিকো নহি বাতানা…কিসিকো নহি বাতানা…।
সে কথায় অলৌকিক শব্দের ঝড় বয়ে গেল যেন।
আমি এবার ওখানে যাই, বাবুজি? আমার মাজি, পিতাজি, বড়ে ভাইয়া, সবাই ওখানে ডালপালা হয়ে আছে। আমি যাই? ফির কভি মিলেঙ্গে…ফির কভি মিলেঙ্গে…।
ফিশফিশে কোরাস আকাশ-বাতাস মাতিয়ে বলে উঠল, ফির কভি মিলেঙ্গে..ফির কভি মিলেঙ্গে…।
প্রিয়নাথ আতঙ্কের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর দমবন্ধ হয়ে যেতে চাইছিল, কোনও ইন্দ্রিয়ই যেন আর কাজ করছিল না। সেই অবস্থায় তিনি যে কেমন করে ছুটতে শুরু করলেন কে জানে!
দিগভ্রান্ত অবস্থায় পাগলের মতো ছুটছিলেন। কখনও হোঁচট খেয়ে পড়ছিলেন। কখনও ধাক্কা খাচ্ছিলেন গাছের গুঁড়িতে। চশমা ছিটকে পড়ল কোথায়। হাতঘড়িটাও বোধহয় ভেঙে গেল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণ নিয়ে ফিরতে পেরেছিলেন সদরিয়ায়।
সমস্তিপুর থেকে ট্রেনে কলকাতায় ফেরার সময় প্রিয়নাথ ভাবছিলেন, এবার সুনীতনারায়ণকে সারিয়ে তোলার কাজ অনেক সহজ হবে।
ভূতের গন্ধ
প্রথমেই বলে রাখি, আমি কুকুর। আমার জীবন হল ঘেউঘেউ জীবন। মানে যতই কথা বলি না কেন সবই আমার মালিকের কাছে ঘেউঘেউ। কিছুতেই আমার কথা লোকটা বুঝতে চায়, শুনতেও চায় না। অথচ আমি মালিকের সব কথা শুনি বসতে বললে বসি, হাঁটতে বললে হাঁটি, লাফাতে বললে লাফাই। এমনকী ভোরবেলা মালিকের দোতলার বারান্দায় যখন ধপ করে খবরের কাগজ এসে পড়ে, তখন ছুট্টে গিয়ে সেটা মুখে করে নিয়ে এসে মালিককে দিই।
মালিক আমাকে আদর করে, যত্ন করে, রোজ ভালো-ভালো খেতেও দেয়। এসব না করে উপায় কী! মালিকের যে আর কেউ নেই! শুনেছি মালকিন একজন ছিল। সে কী একটা অসুখে বছর পাছ-ছয় আগে মারা গেছে। তখনও আমি এ-বাড়িতে আসিনি।
আমার মালিক একটু মেয়ে-ঘেঁষা। সাধু বাংলায় বলতে গেলে নারীজাতিকে শ্রদ্ধা করে। তবে শ্রদ্ধার পরিমাণটা বড্ড বেশি। ওর সঙ্গে রাস্তায় বেরোলেই এই শ্রদ্ধার প্রবলেমটা আমাকে ফেস করতে হয়।
