প্রিয়নাথ আন্দাজে ভর করে এগোলেন। খানিক দূর গেলে হয়তো কাল রাতের ঘর-বাড়ি দোকানপাট চোখে পড়তে পারে।
পথে বেশ কয়েকটা ছবি তুললেন। পকেট থেকে কম্পাস বের করে মাঝে-মাঝেই উত্তরদিকটা দেখে নিচ্ছিলেন। হঠাৎই দেখলেন, বেশ দূরে মেঠো পথ ধরে তিনজন মানুষ হেঁটে যাচ্ছে।
প্রিয়নাথ তাড়াতাড়ি পা চালাতে শুরু করলেন। একটু পরেই ওদের ধরে ফেললেন। একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। তার মধ্যে একজনের বয়েস এত কম যে, অনায়াসে মেয়ে বলা যায়। আর পুরুষটির হাতে একটা সুটকেস।
প্রিয়নাথ হাঁফাতে-হাঁফাতে পুরুষটিকে জিগ্যেস করলেন, কোনদিকে গেলে খাবার-দাবারের দোকানপাট পাওয়া যাবে বলতে পারেন?
লোকটি প্রিয়নাথের পোশাক-আশাক চেহারা খুঁটিয়ে মেপে নিল। তারপর বলল, চলুন, দেখিয়ে দিচ্ছি। আমরা টাঙ্গা-স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছি–পথে দোকানপাট পড়বে!
মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে লোকটির সঙ্গে আলাপ করলেন প্রিয়নাথ।
ওর নাম মহাবীর সাউ। সঙ্গে ওর বউ অলাদেবী, আর ছোট মেয়ে হীরাকুমারী। ও দ্বারভাঙ্গার সিধৌলি গাঁয়ে থাকে। সদরিয়ায় এসেছিল বউয়ের জড়িবুটি চিকিৎসার জন্য। এদিকে একজন ধন্বন্তরি সাধুবাবা বসেন, তার কাছে। ফেরার পথে লরিয়াসরাই-এ একটু কাজ সেরে ফিরবে–তাই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়েছে।
মহাবীরের কাছ থেকে এদিকটার খুব একটা বিশদ খবর পাওয়া গেল না। তবে ও প্রিয়নাথকে একটা চায়ের দোকানে পৌঁছে দিল। প্রিয়নাথ ওদের তিনজনের ফটো তুললেন। ওরা হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে চলে গেল।
প্রিয়নাথ চায়ের দোকানে ঢুকে এক গ্লাস চা নিয়ে বসলেন। ঠিক করলেন, আজ সারাটা দিন নেহাদের সম্পর্কে, সুনীতের ব্যাপারে খোঁজ নেবেন। এখানকার মানুষজন কথাবার্তায় এত সহজ সরল, অথচ অচেনা মুসাফিরকে কিছুতেই আশ্রয় দেয় না। কেন? সে কি ভয়ে? তা হলে সবাই যে-ভয় পায় নেহারা সেই ভয় পায় না কেন! বরং নেহার কথা অনুযায়ী আমরা কোনও মেহমানকে। কখনও ফেরাই না। মাঝে-মাঝেই আমাদের বাড়িতে…।
সারাটা বেলা নানা জায়গায় ঘুরে-ঘুরে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছবি তুলে কাটালেন প্রিয়নাথ। কিন্তু তার অনুসন্ধান এতটুকুও এগোল না। নেহাদের কেউ চিনতেই পারল না। ওদের বাড়িটা কোন দিকে সেটা আন্দাজ করে বলা সত্ত্বেও কোনও লাভ হল না। সবাই ঠোঁট উলটে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল, আর প্রিয়নাথকে অবাক হয়ে দেখতে লাগল।
সুতরাং, একরকম ব্যর্থ হয়েই, বেলা দেড়টা নাগাদ নেহাদের বাড়িতে ফিরলেন প্রিয়নাথ। তবে ফেরার কাজটা মোটেও সহজ হয়নি। বহু লোককে জিগ্যেস করে নানান গাছ আর বাড়ির নিশানা দেখে অবশেষে ফিরতে পেরেছেন।
কিন্তু আশ্চর্য! নেহাদের বাড়িটা সেই সকালের মতোই একা-একা দাঁড়িয়ে আছে। ওরা এখনও বাড়ি ফেরেনি।
খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা প্রিয়নাথ পথেই সেরে এসেছিলেন। এখন কোনওমতে স্নান সেরে নিয়ে নিজের ঘরে আস্তানা গাড়লেন। নোটবই বের করে তাতে আধঘণ্টা ধরে নানারকম মন্তব্য লিখলেন।
প্রিয়নাথ যখনই কোনও অভিযানে বেরোন তখনই সঙ্গে নেন তার বিশেষ সরঞ্জামের থলে। এবারও সেটা সঙ্গে এনেছেন। তাতে আছে ক্যামেরা, টর্চ, প্রচুর ব্যাটারি, মোমবাতি, মার্কার, থার্মোমিটার, কম্পাস আর পেন্ডুলাম।
হঠাৎ কী মনে হওয়াতে সুটকেস খুলে থলে থেকে পেন্ডুলামটা বের করে নিলেন। সুতো ধরে ঝুলিয়ে ওটাকে দোলাতে লাগলেন। দুলুনিটা সামান্য এলোমেলো হচ্ছে বলে প্রিয়নাথের মনে হল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। ঠান্ডা বাতাসে গায়ে কাঁটা দিল।
প্রিয়নাথ পেন্ডুলামটা রেখে দিলেন। দরজা বন্ধ করে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়লেন খাঁটিয়ায়। মনে-মনে ঠিক করলেন, এখানে দু-একদিনের বেশি আর থাকবেন না। সুনীতের ভয় পাওয়ার রহস্যের কাছে হয়তো শেষ পর্যন্ত তাঁকে হার মানতে হবে।
.
সন্ধের আঁধার নেমে আসতেই প্রিয়নাথ হ্যারিকেন জ্বেলে নিয়েছেন। মনে-মনে ভেবেছেন, নেহারা যদি নিতান্তই আর না ফেরে তা হলে ওদের রান্নার জায়গা হাতড়ে যা পাবেন তাই দুটো মুখে গুঁজে দিয়ে কোনওরকমে রাতটা কাটিয়ে দেবেন। তারপর ভোর হলেই মহাবীরের চিনিয়ে দেওয়া পথ ধরে সোজা চম্পট।
কিন্তু তার আর দরকার হল না।
সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ নেহাদের কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেলেন প্রিয়নাথ।
বেশ অবাক হয়ে ঘর থেকে বেরোতে যাবেন, তার আগেই চঞ্চল পায়ে নেহা ঘরে এসে ঢুকল।
বাবুজি, ভালো আছেন। ওর মুখে সেই একই নিষ্পাপ হাসি।
তোমরা হুট করে কোথায় চলে গিয়েছিলে!
মাথা নীচু করল নেহা। তারপর অপরাধীর চোখে প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে বলল, বাবুজি, রাগ করবেন না। রোজ আমাদের ওরকম চলে যেতে হয়। রাত পেরোনোর আগেই আমরা চলে যাই…আবার অন্ধেরা নেমে এলে ফিরে আসি।
কোথায় যাও? কী দরকার সেখানে, যে রোজ যেতে হয়! প্রিয়নাথ একটু যেন বিরক্তই হলেন।
আপনার জন্যে চা নিয়ে আসি। এসে সব বলছি–। বেণী দুলিয়ে নেহা চলে গেল।
মিনিট পাঁচেক পরেই নেহা ফিরে এল। হাতে গরম চায়ের গ্লাস।
প্রিয়নাথের হাতে গ্লাসটা দিয়ে কাল রাতের মতোই মেঝেতে বসে পড়ল। তারপর খানিকটা যেন বিষণ্ণ গলায় বলল, রোজ আমাদের যেতে হয়, বাবুজি। কেন যেতে হয় সেটা..আপনি আজ আমাদের সঙ্গে যাবেন?
নেহার প্রস্তাবটা এত আচমকা এল যে, প্রিয়নাথ সঙ্গে-সঙ্গে কোনও জবাব দিতে পারলেন না।
