নেহা পরিচয় করিয়ে দিল, বলল, ওর বাপুজি। তারপর দেহাতি ভাষায় ওর বাবাকে কী যেন বলল। উত্তরে বৃদ্ধ মানুষটি আলতো করে বারকয়েক ঘাড় নাড়লেন।
নেহা প্রিয়নাথকে বসিয়ে ছুটে ভেতরের ঘরে ঢুকে গেল। একটু পরেই একজন বৃদ্ধা ও একজন তরুণকে একরকম হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল। নেহার মা ও দাদা।
বৃদ্ধার মুখের চামড়ায় অকালে বড় বেশি ভাজ পড়েছে। তবে চোখ দুটোয় মায়ের মমতা মাখানো। নাকে রুপোর নোলক, কানে দুল। মাথার চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে।
নেহার দাদার রোগা কালো চেহারা। চোখ দুটো কেমন যেন শূন্য, দৃষ্টিহীন। কপালে লম্বা একটা কাটা দাগ। মাঝে-মাঝেই কেশে উঠছে–বোধহয় ঠান্ডা লেগেছে।
একটা অদ্ভুত গন্ধ প্রিয়নাথের নাকে আসছিল। অনেকটা বুনো ফুলের গন্ধের মতো।
আলাপের পালা শেষ হলে নেহা প্রিয়নাথকে ভেতরদিকের একটা ছোট ঘরে নিয়ে গেল। বলল, এ-ঘরেই আপনি থাকবেন। আপনি হাত-মুখ ধুয়ে নিন, আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।
নেহা হাত-পা নেড়ে কথা বলছিল। ওর ভাষা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও ওর অঙ্গভঙ্গি ভূতনাথকে বুঝতে সাহায্য করছিল। নেহার সঙ্গে আলাদা কথা বলার জন্য ভূতনাথের আর তর সইছিল না।
সুটকেস খুলে দরকারি জিনিসপত্র বের করে খাঁটিয়ার ওপরে চাদর মুড়ি দিয়ে বসলেন ভূতনাথ। নেহার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
একটু পরেই নেহা চা নিয়ে এল। প্রিয়নাথের হাতে চায়ের গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে মেঝেতে চাটাই পেতে বসে পড়ল। বুনো ফুলের গন্ধটা আবার প্রিয়নাথের নাকে এল।
বাবুজি এখানে কী কাজে এসেছেন?
এই একটু-আধটু ঘুরে বেড়াতে…ফটো তুলতে। একটু থেমে আচমকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন প্রিয়নাথ, আচ্ছা, মাস দেড়-দুই আগে কোনও ছোকরা বাবু তোমাদের বাড়িতে এসেছিল? বাবুর খুব ফটো তোলার শখ ছিল…।
নেহা সরলভাবে জবাব দিল, হা, এসেছিল। বড় রাস্তায় এদিক-ওদিক ঘুরছিল, আমিই ডেকে নিয়ে এসেছি। আমাদের বাড়িতে দু-চারদিন ছিল। এখানে আনজান আদমিকে কেউ বাড়িতে থাকতে দেয় না। কিন্তু আমরা কোনও মেহমানকে কখনও ফেরাই না। মাঝে-মাঝেই আমাদের বাড়িতে মেহমান আসে। আমি ডেকে নিয়ে আসি।
সেই ছেলেটির নাম কী ছিল? সুনীত? প্রিয়নাথ বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন। একটা সিগারেট ধরিয়ে গাঢ় টান দিলেন।
নাম তো জানি না, বাবুজি। নেহা হাসল ফিক করে, বলল আপনার নামও কি জানি?
প্রিয়নাথ নিজের নাম বললেন। বললেন ফটো তোলার শখের কথা। তারপর শহরের টুকটাক গল্প শোনাতে লাগলেন। চা-সিগারেট শেষ হয়ে গেল।
হঠাৎই গল্পের মাঝে লাফিয়ে উঠে পড়ল নেহা। বলল এখন যাই, বাবুজি। দেরি হয়ে গেছে।
ফুটফুটে প্রাণবন্ত কিশোরীটির মুখের দিকে তাকালেন প্রিয়নাথ। কীসের দেরি হয়ে গেছে। প্রিয়নাথের কপালে ভাঁজ পড়ল।
নেহা প্রায় ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
একটু পরে থালা আর বাটিতে নিয়ে এল রুটি ও সজি। প্রিয়নাথের ডিনার।
মেঝেতে থালা-বাটি সাজিয়ে কসার গ্লাসে জল দিয়ে গেল নেহা। সঙ্গে একটা বাড়তি হ্যারিকেন। কিন্তু সেই আলোয় মলিন ঘরটা যেন আরও মলিন হয়ে উঠল। প্রিয়নাথের অন্তত তাই মনে হল।
নেহা যাওয়ার আগে বলে গেল, খাওয়া হয়ে গেলে বাসনগুলো দরজার বাইরে রেখে দিতে। আর বাবুজি যেন বাইরের উঠোনে গিয়ে হাত ধুয়ে নেন।
নেহা খুব ব্যস্তভাবে চলে গেল। বলল, এখন খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ুন–আবার কাল দেখা হবে।
ঘড়িতে এখনও আটটা বাজেনি, অথচ শীত, অন্ধকার, আর নির্জনতা ঘড়ির কাঁটা যেন তিন-চার ঘণ্টা এগিয়ে দিয়েছে।
খাওয়াদাওয়া সেরে হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় এসে জুত করে বসলেন প্রিয়নাথ। একটা সিগারেট ধরালেন। হ্যারিকেন দুটো নিভু নিভু করে দিয়েছেন। ফলে সিগারেটের আগুনটাই বেশ জোরালো মনে হচ্ছে।
আষ্টেপৃষ্টে কম্বল মুড়ি দিয়ে নানান কথা ভাবছিলেন। দু-মাস আগে এখানে এসে সুনীত ঠিক কী কী করেছিল? প্রিয়নাথ কি এখন সেই ভূমিকায় হুবহু অভিনয় করে যাচ্ছেন? টিভিতে দেখা অ্যাকশন রিপ্লের মতো?
নেহাদের চাপা কথাবার্তা কানে আসছিল। ওরা কি এখনও শোয়নি? নেহা তা হলে অমন ব্যস্তভাবে চলে গেল কেন?
একটু পরে সিগারেট শেষ করে শুয়ে পড়লেন প্রিয়নাথ। ওঁর ক্লান্ত শরীর খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।
.
ভোরবেলা বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙল প্রিয়নাথের।
আড়মোড়া ভেঙে দিন শুরু করতে গিয়েই বেশ অবাক হয়ে গেলেন। নেহারা কেউ বাড়ি নেই।
ওরা চারজন এই সক্কালবেলায় গেল কোথায়!
গোটা বাড়িটাই চক্কর মেরে দেখলেন প্রিয়নাথ। কেউ কোথাও নেই! সব কটা দরজাই হাট করে খোলা। অথচ আসবাবপত্র, রান্নার জায়গা ইত্যাদি দেখলে মনে হয় ওরা আবার যে-কোনও মুহূর্তে ফিরে আসবে।
এককাপ চায়ের জন্য মনটা আনচান করছিল। তাই মোটামুটি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। প্রিয়নাথ। সঙ্গে নিলেন ক্যামেরা আর কম্পাস।
কুয়াশা কম থাকায় সূর্যের দাপট নেহাত মন্দ নয়। সামান্য ঘোলাটে দিনের আলোয় এলাকাটা আরও ভালো করে দেখলেন।
নেহাদের বাড়িটা বলতে গেলে একেবারে কঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে। চাষজমি আর পুকুর পেরিয়ে আরও যে-দু-চারটে বাড়ি চোখ পড়ে সেগুলোতে কেউ বাস করে বলে মনে হল না। আর দুরে তাকালে শুধু ধু-ধু মাঠ আর বড়-বড় গাছপালার দল। মনে হয় যেন নেহাদের বাড়িটাই লোকবসতির শেষ সীমানা।
