কে বারণ করেছে?
ভূতে পাওয়া মানুষের মতো কেঁপে উঠল সুনীত। প্রায় আঁতকে উঠে বলল, ওরা…ওরা বারণ করেছে। নেহা…নেহা…।
নেহা মানে কী? সুনীতের হাত চেপে ধরে ওর মুখের ওপরে একরকম ঝুঁকে পড়লেন প্রিয়নাথ, কে নেহা? কী নেহা?
সুনীত মাথা নীচু করল। ভয়ে কাঁদতে শুরু করল। গোঙানির স্বরে বলল, জানি না। আর কিছু জানি না। আমাকে ছেড়ে দিন…প্লিজ…প্লিজ…।
প্রিয়নাথ ওর অনুনয় আর কান্নাকে পাত্তা দেননি। নাছোড়বান্দার মতো বলেছেন, তুমি কাকে ভয় পাচ্ছ? এখন তো দিনের অলো…এখন কীসের ভয়!
সুনীত কান্না থামিয়ে ভূতনাথের দিকে সরাসরি তাকিয়েছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তারপর বলেছে, না, এখন ভয় নেই। কিন্তু দিনের পর তো রাত আসবেই…তখন? তখন ওরাই সব…ওদের গোপন কথা আমি ফাস করতে পারব না। কেউ যদি নিজে থেকে জানতে পারে তা হলে ঠিক আছে। আমি কিছু বলতে পারব না।
এরপর সুনীত মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছে।
এখন এই কুপির আলোয় বসে থাকা শীতে ঘেরা মানুষগুলোও যেন সুনীতের মতো মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। অপেক্ষা করছে।
ধোঁয়া ওঠা চায়ের গ্লাস প্রিয়নাথের হাতে এগিয়ে দিল দোকানদার সঙ্গে দুটো বিস্কুট। চায়ে চুমুক দিতে দিতে দোকানদারের সঙ্গে একরকম জোর করেই আলাপ জুড়ে দিলেন প্রিয়নাথ। এই শীতের রাতে একটা আশ্রয় না পেলে তিনি থাকবেন কোথায়!
বহু চেষ্টা করে যেটুকু জানা গেল তা হল ও রাতে থাকার জায়গা পাওয়া মুশকিল। অচেনা মানুষকে কেউ এখানে আশ্রয় দেয় না। সেইজন্যই সন্ধের সময় বাঙালিবাবুকে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেছে। তবে এখনও সময় আছে। টাঙ্গা নিয়ে বাস-রাস্তায় গেলে সাতটার লাস্ট বাসটা ধরা যাবে। সেটাই বাবুজির ভালো হবে।
একটা সিগারেট ধরিয়ে পথে নামলেন প্রিয়নাথ। সুনীত কি এখানে সত্যিই এসেছিল? রাতে কোথায় আশ্রয় নিয়েছিল ও? যদি রাতে কোথাও থাকার জায়গা না পাওয়া যায়…।
এইসব কথা ভাবতে-ভাবতে প্রিয়নাথ কাঁচা সড়ক ধরে টাঙ্গা-স্ট্যান্ডের দিকে এগোচ্ছিলেন, হঠাৎই কানে এল মলের ছমছম শব্দ।
ঘুরে তাকালেন প্রিয়নাথ।
বছর তেরো-চোদ্দর একটি ফুটফুটে কিশোরী। পরনে ঘাগরা, চোলি, চাদর, ওড়না। পোশাক মলিন। তবে রূপ আছে। রাস্তার আলো কম কিন্তু তা সত্ত্বেও মেয়েটির রূপ আড়াল করা যায়নি।
প্রিয়নাথ নানা জটিল ভাবনায় ব্যস্ত ছিলেন। মেয়েটি ওঁর চোখে তাকিয়ে এমন সরল সুন্দরভাবে হাসল যে, সব দুশ্চিন্তা কোথায় মিলিয়ে গেল।
মেয়েটির বাঁ হাতে ঝুলছে অ্যালুমিনিয়ামের একটা বেড়ানো ক্যান। আর ডান হাতের মুঠোয় বোধহয় পয়সা।
ওর হাসিতে কেমন একটা ভরসা ছিল, প্রচ্ছন্ন আবাহনও ছিল যেন। হয়তো সেই কারণেই প্রিয়নাথ ওকে জিগ্যেস করে বসলেন এখানে রাতে থাকার কোনও জায়গা পাওয়া যাবে কি না।
প্রিয়নাথের জোড়াতালি দেওয়া ভাষা মেয়েটি দিব্যি বুঝতে পারল। মিষ্টি হেসে জবাব দিল, কিউ নহী! জরুর মিলবে। হামার ঘর হ্যায় উধর– আঙুল তুলে পশ্চিমদিকের অন্ধকার দেখাল মেয়েটি।
দুশ্চিন্তা নিমেষে মুছে গেল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই প্রিয়নাথ ভীষণ ক্লান্ত বোধ করলেন। ভ্রমণের ধকল তাঁকে মুহূর্তে যেন কাবু করে দিল।
মেয়েটি তাঁকে ডাকতেই প্রিয়নাথ ওর পিছু নিলেন।
মলিন আলোয় এবড়োখেবড়ো পথ ধরে শীত আর কুয়াশা ভেদ করে দুটি প্রাণী এগিয়ে চলল।
একটু এগোতেই রাস্তার আলো আর চোখে পড়ল না। ভাঙা চাঁদের ঘোলাটে আলোই একমাত্র ভরসা।
গোলকধাঁধার মত পথ ঘুরে-ঘুরে অবশেষে একটা বাড়ির কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। আবছা আলো-আঁধারিতে বাড়িটাকে ভূতুড়ে অবয়ব বলে মনে হচ্ছিল।
যতটুকু বোঝা যায়, টিনের চাল দেওয়া মাটির বাড়ি। বাড়ি ঘিরে উঠোন। উঠোনে বেশ কয়েকটা কলা গাছ, পেঁপে গাছ আর সুপুরি গাছ। উঠোনের একপাশে ধুনির আগুন ধিকধিক জ্বলছে। কুয়াশার স্তর ভেদ করে আগুনটাকে ঝাপসা দেখাচ্ছে।
সামান্য বাতাস বইছিল। বাতাসে গাছের পাতা নড়ে সরসর শব্দ হচ্ছিল।
প্রিয়নাথের মনে হল, ঘুমিয়ে নিথর একটা গাঁয়ের শেষ প্রান্তের শেষ বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। বাড়িটার চারপাশে অনেকটা করে কঁকা জমি। আর আলো বলতে মাথার ওপরে চাঁদ, আর বাড়ির একটা জানলা দিয়ে ভেসে আসা লণ্ঠনের আলো।
প্রিয়নাথের শীত করছিল। মাফলারটা আরও ভালো করে গলায় জড়িয়ে নিলেন।
এই আমাদের ঘর, বাবুজি। মেয়েটি আলতো গলায় বলল।
প্রিয়নাথের হঠাৎই মনে হল, ওদের বাড়িতে আশ্রয় নেবেন অথচ এখনও ঠিকমতো আলাপ করা হয়নি। মানে, মেয়েটির নামও জিগ্যেস করা হয়নি।
তোমার নাম কী? প্রিয়নাথ জানতে চাইলেন।
তার দিকে ঘাড় তুলে তাকিয়ে মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল, নেহা–নেহাকুমারী।
প্রিয়নাথ ওই শীতার্ত আঁধারে দাঁড়িয়ে সুনীতনারায়ণের ভয়ংকর চিৎকার শুনতে পেলেন। তার পা ফেলার ছন্দে গরমিল হয়ে গেল। সুটকেসটাও হাত থেকে পড়ে যেতে চাইছিল। সময়মতো সতর্ক না হলে সেটাকে সামাল দেওয়া যেত না।
কাঁচা উঠোন পেরিয়ে সামনের ঘরটায় ঢুকতেই উষ্ণতার ওম পেলেন প্রিয়নাথ। ঘরের হ্যারিকেনের আলোয় নেহাকে ভালো করে দেখলেন। এই মিষ্টি মেয়েটা কি সুনীতের ভয়ের কোনও হদিস দিতে পারবে।
ঘরে একটা ভাঙা চেয়ারে একজন বৃদ্ধ বসেছিলেন। চাদর মুড়ি দেওয়া শরীরে শুধু মাথার সাদা চুল, সাদা গোঁফ, আর ছানি-পড়া ঘোলাটে চোখ নজর টানে।
