বাইরের সন্ধের সঙ্গে মেয়েটা বেশ মানিয়ে গেছে। ওকে ঘিরে একটা সুগন্ধী বাতাস খেলে বেড়াচ্ছিল।
তিতলি আর দেরি করল না—বিশ্বনাথকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ও যে গাড়ি চালানোয় বেশ পটু তা আগের দিনই টের পেয়েছিলেন বিশ্বনাথ। আজও ওকে লক্ষ করছিলেন। কী সহজ অনায়াস ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং, ব্রেক, ক্লাচ, অ্যাকসিলারেটর নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে!
বিশ্বনাথকে প্রথমে একটা গেমস পারলারে নিয়ে গেল তিতলি।
বিশাল মাপের তিনতলা পারলার। তাতে নানান ধরনের চোখধাঁধানো খেলা চারপাশে রঙিন আলো। লোকজনের ভিড়। চারটে ট্রান্সপারেন্ট এলিভেটর ব্যস্তভাবে ওঠা-নামা করছে। মাঝে-মাঝে মেগাফোনে নানারকম অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে। সারি-সারি ক্যাশ-কাউন্টার থেকে ইলেকট্রনিক স্মার্ট কার্ড কুপন বিক্রি হচ্ছে। কোনও নির্দিষ্ট গেমের স্লটে কার্ডটা টানলেই গেমের চার্জ বিয়োগ হয়ে যাবে।
এলিভেটরে দোতলায় উঠে ‘নাইন স্টিকস’ নামে একটা খেলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো ওরা। ন’টা রং-বেরঙের লাঠি পাশাপাশি দাঁড় করানো আছে। প্রায় ছ’-সাত মিটার দূর থেকে একটা বড় মাপের বল গড়িয়ে দিতে হবে লাঠিগুলোর দিকে। লাঠিগুলোর মধ্যে একটা কাঠের, আর বাকিগুলো হলোগ্রাম ইমেজ। কিন্তু দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। পাঁচবার বলটা গড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে খেলোয়াড়। তার আসল কাজ হল, কাঠের লাঠিটায় বল লাগানো। সেটায় ধাক্কা লাগলেই ‘ঠক’ করে শব্দ হবে। প্রথম তিনটে থ্রো-র মধ্যে আসল লাঠিটা হিট করতে পারলে পাওয়া যাবে পুরস্কার।
হইহই করে খেলায় নেমে পড়ল তিতলি। বিশ্বনাথকেও নামিয়ে দিল। একবার এই খেলা, আর একবার সেই খেলায় নাম দিয়ে বিশ্বনাথকে পাগল করে দিল। ওর সঙ্গে দৌড়-ঝাঁপ করতে-করতে বিশ্বনাথও যেন বাইশ হয়ে গেলেন।
ঘণ্টাখানেক পর গেমস পারলার থেকে ওরা বেরিয়ে এল রাস্তায়। বেশ কিছু টাকা প্রাইজমানি হিসেবে পেয়েছে তিতলি। ও খুশিতে বিশ্বনাথকে একটা আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘বাষট্টি, আপনি ভীষণ পয়া। দেখলেন, কত টাকা প্রাইজ পেলাম!’
বিশ্বনাথ হাসলেন।
আবার গাড়িতে চড়ে ওরা ছুট লাগাল।
এবারে তিতলি গিয়ে থামল ‘রিল্যাক্স’ নামের একটা অ্যাডিকশান জয়েন্টে। এখানে নেশার সবরকম খোরাক পাওয়া যায়।
তিতলি বলল, ‘এখানে আমি প্রায়ই আসি—।’
‘রিল্যাক্স’-এর বাইরে লাল-নীল নিওন সাইন দিয়ে বিরাট হরফে লেখা রয়েছে: ‘ইউ মাস্ট বিএইটিন টু এনটার’ তার মধ্যে ‘এইটিন’ কথাটা লাল রঙে সংখ্যায় লেখা।
ভেতরে ঢুকে বেশ অবাক হলেন বিশ্বনাথ। যদিও জানতেন চারপাশে এসব চলছে, তবুও নিজে কখনও এরকম আস্তানায় আগে আসেননি।
চতুর্দিকে আলোর মেলা। তারই মধ্যে আলো দিয়ে ছবি আঁকা সব বিজ্ঞাপন। বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনই নানান লিকার কোম্পানির। তা ছাড়া আছে নেশা করার কিছু ড্রাগের বিজ্ঞাপন। আর লুকোনো স্পিকার থেকে ভেসে আসছে রক মিউজিক।
সত্যি, নেশা-প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে গেছে!
একটা রঙিন ফুলের ছবি চোখে পড়ল। সেটা রোজ দু-মিনিট করে শুঁকলেই অদ্ভুত নেশা হবে। আর মাসে একবার ফুলটাকে রিচার্জ করে নিতে হবে। সেইরকম দাবি করেছে একটি কোম্পানি।
বিশ্বনাথ অবাক শিশুর চোখে জগৎটাকে দেখছিলেন।
বিশাল হলঘরের নানা জায়গায় দাঁড় করানো আছে মদের স্লট মেশিন। তাতে বোতাম টিপে স্মার্ট কার্ড টানলেই গ্লাসে পরিমাণ মতো তরল পাওয়া যাবে। একটা কোণে ওয়াইড স্ক্রিন প্লেট টিভি-তে সিনেমা চলছে। ডানপাশের একটা লম্বা কাউন্টারে ড্রাগের সুদৃশ্য পলিপ্যাক বিক্রি হচ্ছে। কাউন্টারের মাথায় নিওন সাইনে লেখা ‘স্ম্যাক জ্যাক’। আর কাউন্টারের সামনে উঁচু টুলে বসে আছে ঝিম মেরে যাওয়া খদ্দেররা।
হলে সাজানো চেয়ার-টেবিলের মেলা ছাড়িয়ে দূরের একটা অঞ্চলে লাল নিওন সাইনে লেখা ‘হট স্পট’। সেখানে সিলিং থেকে লাল-নীল-হলদে-সবুজ আলো ঠিকরে পড়েছে। সেই আলের নীচে চলেছে মাতালদের ছন্দহীন উদ্দাম নাচ।
বিচিত্র সব নেশার গন্ধে বিশ্বনাথ পাগল হয়ে গেলেন। তেজি ঘ্রাণশক্তি ওঁকে আরও বিব্রত করে দিচ্ছিল। ভাবছেন বেরিয়ে যাবেন কি না, ঠিক তখনই ওঁর হাত ধরে টান মারল তিতলি।
‘চলুন, ওইখানে গিয়ে বসি—।’ একটা খালি টেবিলের দিকে আঙুল তুলে দেখাল মেয়েটা।
‘বসব? কেন’ বিশ্বনাথের গলায় আপত্তির ছোঁয়া।
‘ভী-ষণ তেষ্টা পাচ্ছে।’ অনুনয় করে বলল। একটা কাউন্টারে সাজানো রঙিন বোতলের সারির দিকে দেখাল।
‘না!’
‘না কেন? আমার যে অভ্যেস…। তা ছাড়া এখানে বসে খাওয়ার মজাই আলাদা…।’
একটু চুপ করে রইলেন বিশ্বনাথ। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে। তুমি তা হলে বোসো—আমি যাই!’
তিতলি এবার বিশ্বনাথের হাত ধরে ফেলল: ‘সেটা কখনও হয় নাকি! আপনি আমার গেস্ট…।’
‘তা হলে চলো…চলে যাই। এখানে আমার ভালো লাগছে না!’
ছোট বাচ্চার বায়না করার ভঙ্গিতে তিতলি বলল, ‘একবার—জাস্ট একবার!’
বিশ্বনাথ এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন।
তিতলি কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবল। তারপর বিশ্বনাথের চোখে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার কথা শুনব, যদি আপনি আমার কথা শোনেন—।’
‘কী কথা?’
‘আমি আপনার কাছে বাইট নেব—আজ রাতে।’
বিশ্বনাথ একটা জোরালো ধাক্কা খেলেন। বাইশ বলে কী!
কিন্তু বাইশ জেদ ধরে বসে রইল। বিশ্বনাথের কোনও জ্ঞানের কথা সে শুনতে রাজি নয়।
