ড্রইংরুম, ডাইনিং স্পেস, বেডরুম, গেস্টরুম—সবই ঝকঝকে, সর্বত্র বিলাসের আদর মাখানো।
বিশ্বনাথ তিতলির বিছানা দেখলেন, আধুনিক খাট দেখলেন, জামাকাপড় রাখার শৌখিন আলনা দেখলেন, এয়ারকুলার দেখলেন, দেখলেন পড়াশোনার টেবিল-চেয়ার। কিন্তু টেবিলে বইপত্রের বদলে পড়ে আছে সিগারেটেরপ্যাকেট, মদের বোতল, স্ম্যাকের পুরিয়া।
বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল বিশ্বনাথের। ওর দিকে তাকিয়ে অকারণেই জিগ্যেস করলেন, ‘এসব নেশার জিনিস কার?’
‘কার আবার? ইউ গেস।’ থুতনি উঁচিয়ে বিদ্রোহী সুরে বলল তিতলি।
বিশ্বনাথ চুপ করে গেলেন। সামনের খোলা জানলার দিকে তাকালেন। সামনের বাড়ির দেওয়ালে রোদ পড়েছে, কার্নিশে দুটো চড়ুই।
ওরা আবার ড্রইংরুমে এসে পড়ল। সোফায় অলসভাবে বসে নানান গল্প শুরু করল।
সন্ধের মুখে তিতলির ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে তিতলি ‘আবার আসবেন কিন্তু’ বলছিল। হঠাৎই ও ‘একমিনিট—’ বলে ছিটকে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে গেল।
একটু পরেই একটা গোলাপ নিয়ে ফিরে এল। বলল, ‘আপনার দেওয়া বাইশটা থেকে একটা নিয়ে এলাম—আমার জীবনদাতার জন্য। এটা রাখুন—।’
বিশ্বনাথ হেসে বলনে, ‘কোনও মানে হয়!’
অথচ বিশ্বনাথ কল্পনায় একটা সাদা কার্ড দেখতে পাচ্ছিলেন—ফুলটার বোঁটার সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। আর কার্ডে গোটা-গোটা হরফে লেখা: ‘বাষট্টিকে বাইশ।’
ফুলটা পকেটে নিয়ে এক অনুপম ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফিরে এলেন।
দিনগুলো কীভাবে কাটছিল বিশ্বনাথের ঠিক ঠাহর হচ্ছিল না।
ক্লায়েন্টদের ভি-স্টিং দেওয়ার কাজ যেমন চলতে লাগল তারই সঙ্গে চলল তিতলিকে নিয়ে ব্যস্ততা।
প্রথম দিন ওর ফ্ল্যাট থেকে ফিরে প্রায় সারা রাত গোলাপটাকে নিয়ে কত কী না ভেবেছেন বিশ্বনাথ! রেণুকণার সঙ্গেও অনেক কথা বলেছেন।
রেণুকণা বলেছেন, ‘দ্যাখো, ভালো-মন্দ পাপ-পুণ্যের ব্যাপার নয়—তোমাকে খুশি দেখলেই আমি খুশি। এর বেশি আমি কিছু চাই না…।’
পরদিন রাস্তায় বেরিয়ে ফোনবুথ থেকে তিতলিকে ফোন করেছিলেন বিশ্বনাথ।
আজ সকালে বাইরে বেরিয়েও বিশ্বনাথের মনে হল, বাইশকে ফোন করলে কেমন হয়।
সঙ্গে-সঙ্গে ফোন বুথ। নম্বর ডায়াল। ক্রি-রি-রিং। এবং ‘হ্যালো’।
‘বাইশ, কেমন আছ?’
‘ভালো। সবে ঘুম থেকে উঠছি।’
‘এখন দশটা বাজে—।’
‘অনেক রাতে শুয়েছি যে।’
‘আমিও। তুমি এত রাত পর্যন্ত কী করছিলে?’
‘ভাবছিলাম। আর নেশা করে বুঁদ হয়ে ছিলাম। এখনও হ্যাং-ওভার কাটেনি…।’
‘নেশা করা খারাপ।’
‘আবার গোরু রচনা! আমার সবচেয়ে খারাপ নেশাটা করতে ইচ্ছে করছে—দারুণ জমবে।’
‘সেটা কী?’
‘আহা! জানেন না যেন!’ একটু হাসল। তারপর: ‘ভি-স্টিং…বাইট। এখনও পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে মারাত্মক নেশা। টিভিতে বলছিল…।’
‘নেশা করা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।’
‘ওঃ! মাই গুডনেস!’
‘যাকগে—আজ কী আমাদের দেখা হচ্ছে?’
‘অফ কোর্স…সন্ধেবেলা চলে আসুন…।’
বিশ্বনাথ একলহমা চিন্তা করে নিলেন। ঠিক করলেন, বিকেলে কমিউনিটি পার্কে বেড়ানো আর আড্ডা দেওয়ার পর অনায়াসে তিতলির ফ্ল্যাটে যাওয়া যেতে পারে।
‘যাব। সাতটা নাগাদ। অসুবিধে হবে?’
খিলখিল হাসি। তারপর: ‘ভদ্রতা লিমিট ছাড়িয়ে গেলে তাকে ন্যাকামি বলে। অফ কোর্স সাতটায় আসবেন…।’
‘ছাড়ছি তা হলে…।’
‘না, না—একটা জরুরি কথা আছে।’ সাততাড়াতাড়ি বলে উঠল।
‘কী?’
‘কাল রাতে একটা লোক ফোন করেছিল। ফোনে থ্রেট করছিল…।’
‘চেনা?’
‘না—।’
‘তো আগে জানালেই পারতে…।’
‘কী করে জানাব?’
বিশ্বনাথ যেন হঠাৎই বুঝতে পারলেন, ওঁর কোনও ফোন নেই।
তিতলি তক্ষুনি ওঁর মনের কথাটা উচ্চারণ করল, ‘আপনি একটা মোবাইল ফোন কিনে নিন—আজকেই।’
‘ঠিক বলেছ।’
‘সেদিন রাতে আপনাকে সামনে পেয়ে আজেবাজে সব ভাট বকে গেছি। হেভি বোর করেছি। কিছু মাইন্ড করবেন না।’
‘সে তো আমিও বেশ লম্বা অটোবায়োগ্রাফি রিডিং পড়ে শুনিয়েছি।’ একটু থামলেন। তারপরে: ‘এবার আজকের কথা বলো…।’
‘সাতটায় মনে করে আসবেন। আমরা আজ গাড়ি নিয়ে যেদিকে দু-চোখ-যায় ঘুরতে বেরোব। রাস্তায় কোথাও ডিনার করে নেব।’
‘তাই হবে। কিন্তু ওই ফোনটার কথা শুনে ভয় করছে…।’
হাসল তিতলি। বলল, ‘ভয় পাওয়া আমি ছেড়ে দিয়েছি।…মনে থাকে যেন। সাতটায়।’
তিতলি ‘বাই’ বলে লাইন কেটে দিল।
বিশ্বনাথ চিন্তা করে দেখলেন, ওঁর এখন যা আর্থিক অবস্থা তাতে অনায়াসেই একটা মোবাইল ফোন কেনা যায়।
সন্ধেবেলা তিতলির ফ্ল্যাটে রওনা হওয়ার আগে সত্যি-সত্যিই একটা মোবাইল ফোন কিনলেন। বাড়তি টাকা দিয়ে নম্বরটা এমন বাছলেন যেন বাইশ আর বাষট্টি সংখ্যা দুটো নম্বরে পাশাপাশি থাকে। দোকানদারের কাছ থেকেই মোবাইলের প্রাথমিক কলাকৌশল শিখে নিলেন।
বাস স্টপেজ থেকে এসি চেয়ার কারে ওঠার আগে দুটো গোলাপ কিনলেন বিশ্বনাথ। দুটোই তিতলিকে দেবেন—তারপর একটা ফিরিয়ে নেবেন নিজের জন্য।
তিতলির ফ্ল্যাটে পৌঁছে মোবাইল ফোন আর গোলাপ দেখিয়ে ওকে চমকে দিলেন বিশ্বনাথ। গোলাপ দুটো ওর হাতে দিয়ে বললেন, ‘এর মধ্যে একটা আমি যাওয়ার সময় নিয়ে যাব…আমার জন্যে…।’
বিশ্বনাথকে ভেতরে ডেকে নিল তিতলি। মোবাইল ফোনের নম্বর নিয়ে ওঁকে ঠাট্টা করল।
ওকে নয়ন মেলে দেখতে লাগলেন বিশ্বনাথ।
কালো আর ছাই রঙের ছক কাটা ছোট হাতার একটা টপ পরেছে। তার বুকের কাছটায় লাল হরফে লেখা: ‘আই অ্যাম মি।’ পায়ে হলদে প্যান্ট, তাতে কালি ছেটানোর মতো কালো-কালো স্পট। গলায় অন্যরকম একটা চেন, কানের লতিতে ঝুরির মতো দুল, হাতে ব্রেসলেট।
