মিতি পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছিল। হঠাৎই ও শক খাওয়া মানুষের মতো ছিটকে পড়ল মেঝেতে। টেলিফোনের ঘন্টি তখনও কিন্তু থামেনি।
প্রিয়নাথ চেঁচিয়ে বললেন, শৌনক, লাইট জ্বেলে দাও। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে ছুটে গেলেন মোমবাতির কাছে। ওটা তুলে নিয়ে ঐন্দ্রিলার কাছে গেলেন।
ঘরের মধ্যে ঠিক কী যে হচ্ছিল মনে করে বলতে পারব না। শুধু মনে আছে এলোমেলো ভয়ের চিৎকার, কথাবার্তা, আর টেলিফোনের পাগলা-ঘণ্টি।
শৌনক ঘরের আলো জ্বেলে দিয়ে চিৎকার করে বলল, এক মিনিট। সবাই শোনো। এসবে ভয়ের কিছু নেই। এই ব্যাপারটা পুরোটাই সাজানো নাটক।
মুহূর্তে সব চিৎকার-চেঁচামেচি থেমে গেল। শৌনক ফোন ধরার জন্যে এগোতেই ফোনের ঘন্টিও আচমকা চুপ করে গেল।
আমরা সবাই তখন মিতিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছি। ও চোখ বুজে মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছে।
কিন্তু এ কী অদ্ভুত চেহারা হয়েছে মিতির!
ওর সারা মুখে সাদা রং। ঠোঁটজোড়া টুকটুকে লাল। ঠোঁটের বাঁ-দিকে একটা কালো জজুল আঁকা রয়েছে।
প্রিয়নাথ মিতির ওপরে ঝুঁকে পড়ে ওকে নানাভাবে পরীক্ষা করছিলেন। শৌনক ওঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ঠাট্টার হাসি হেসে বলল, আপনি উঠে পড়ুন। মিতির কিস্যু হয়নি। বাপ্পাকে একটু সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যে আমি আর মিতি নকল ভূত নামানোর প্ল্যান করেছিলাম। ওর হাতব্যাগে মেকাপের জিনিস ছিল। অন্ধকারে লুকিয়ে মুখে মেখে নিয়েছে। আর জুমেলিয়ার এফেক্ট আনার জন্যে ভুরু আঁকার পেনসিল দিয়ে জডুলটা এঁকে নিয়েছে। কথা শেষ করেই শৌনক হো হো করে হেসে উঠল : তবে সবাই যে এরকম ব্যাপক ভয় পেয়ে যাবে ভাবিনি।
রমেশ তিওয়ারি হতভম্ভ মুখে দাঁড়িয়েছিল। জোনাকিগুলোর দিকে দেখিয়ে আমতা-আমতা করে শৌনককে জিগ্যেস করল, তা হলে এই ভাগজোনিগুলো কোথা থেকে এল?
জোনাকিগুলো তখনও ঘরের ভেতরে উড়ছিল। তবে ঘরের আলোর ওদের অনেক নিষ্প্রভ লাগছিল।
শৌনক থতমত খেয়ে বলল, জানি না
প্রিয়নাথ কপালে হাত চেপে মিতির পাশে উবু হয়ে বসেছিলেন। শৌনকের দিকে ঘুরে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, টেলিফোনটা অমন পাগলের মতো বাজছিল কেন? প্লেনের গর্জনটাই অমন মাঝপথে অমন থেমে গেল কেন? আর ঐন্দ্রিলা যেভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছিল মানুষ কি অমনভাবে মাথা আঁকাতে পারে?
শৌনক কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। বিব্রত অপরাধী মুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কাকিমা মিতির ওপরে ঝুঁকে পড়তে যাচ্ছিলেন, প্রিয়নাথ চিৎকার করে ওঁকে বাধা দিলেন : খবরদার, এখন ওর কাছে এগোবেন না!
আমি যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, শৌনক আর ঐন্দ্রিলা মিলে এসব কারসাজি করেছে? তা হলে টেম্পারেচার এরকম কমে গেল কেমন করে! বেশ শীত করছে…তা ছাড়া কম্পাসের নিড়টাই বা অমন বনবন করে ঘুরছিল কেন?
শৌনক বলল, টেবিলের শব্দগুলো আমি করেছিলাম। আর কথা ছিল, মিতি বাপ্পার নাম ধরে কয়েকবার ডাকবে। ও আর কিছু করেছে কি না আমি জানি না। ওকে ডাকুন–ও বলতে পারবে।
ঐন্দ্রিলার ওপরে ঝুঁকে পড়ে শৌনক ডেকে উঠল, মিতি! মিতি! ওঠ, সবাই খুব ভয় পেয়ে গেছে।
চিত হয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে শুয়ে থাকা ঐন্দ্রিলা কোনও সাড়া দিল না।
প্রিয়নাথ ওর কবজি ধরে বসেছিলেন। আমাদের ভয় পাওয়া মুখগুলোর দিকে একপলক নজর বুলিয়ে তিনি ভারী গলায় বললেন, ও আর উঠবে না। শি ইজ ডেড। আমি এতক্ষণ ধরে ওর পা খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। যদি পারো তো কেউ একজন ডাক্তার ডেকে আনেনা।
প্রিয়নাথের কথায় আকুল ঝড় বয়ে গেল ঘরে।
শৌনক মিতির নাম ধরে পাগলের মতো ডেকে উঠে ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল। কাকিমার বুকফাটা কান্না শুরু হয়ে গেল একইসঙ্গে। কিন্তু আবেগের ঝড় বেড়ে ওঠার আগেই বাজ পড়ার মতো একটা শব্দ হল, টেলিফোনটাও আগের অদ্ভুত ঢঙে হঠাৎই বাজতে শুরু করল। মোমবাতির আলোটা একবার কেঁপে উঠেই নিভে গেল। কিন্তু বাবের আলোয় আমাদের দেখতে কোনও অসুবিধে হল না।
মিতির মৃতদেহের মুখটা ধীরে ধীরে হাঁ হয়ে যেতে লাগল। দেখতে-দেখতে ওর টুকটুকে লাল ঠোঁটজোড়া ফাঁক হয়ে গোল গর্তের চেহারা নিল। একটা অপার্থিব হাসি শোনা গেল ওর মৃতদেহের ভেতর থেকে। আর তারপরই একটা সবুজ রঙের মুখ দেখা গেল ওর মুখের গহ্বরে। ওর ঠোঁট চিরে মুখের গর্ত দিয়ে প্রাণপণ চাপে ঠেলে বেরিয়ে এল মাথাটা। গোটা মাথায় কেমন এক চকচকে লালা জড়ানো।
মাথাটা মাপে ছোট ফুটবলের মতো। চোখ দুটো টানা-টানা ঢুলুঢুলু। সারা মুখে অসংখ্য ভাঁজ। আর ঠোঁটের বাঁদিকে একটা কালো জডুল।
মাথাটা নেশাগ্রস্থ চোখে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে আমাদের একবার দেখল। তারপর ফিশফিশে হিমেল স্বরে বলল, বাপ্পা, এবার যাই।
প্রিয়নাথ একলাফে ছিটকে চলে গেলেন ওঁর ব্রিফকেসের কাছে। কিন্তু তার বেশি কিছু করে ওঠার আগেই ঐন্দ্রিলার মৃতদেহ আচমকা চোখ খুলে তাকাল। এবং একটা ফট শব্দ করে ঘরের বাটা কেটে গেল।
ঘরের মধ্যে ভয়ার্ত চিৎকারের ঝড় উঠল আবার। আরও দুটো জানলা দড়াম করে খুলে গেল। জানলার পাল্লাগুলো দেওয়ালে এলোপাতাড়ি বাড়ি খেতে লাগল। আর অসংখ্য জোনাকির স্রোত ঘরে হাউবাজির মতো পাক খেয়ে মাথা খুঁড়ে মরতে লাগল।
আমাদের ভীষণ শীত করছিল। ভয় আর ঠান্ডায় আমরা সকলে ঠকঠক করে কঁপছিলাম। অন্ধকারে নজর চলছিল না। কিন্তু তারই মধ্যে দেখলাম, একরাশ কালো ধোঁয়া ঘরের আঁধার থেকে ভেসে উঠে জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর জোনাকিগুলো যেন এক পৈশাচিক উল্লাসে ঘরের বাতাসে মাতালের মতো নাচছে…নাচছে…নাচছে।
