তারই মধ্যে কাকিমার সর্বহারা মর্মান্তিক কান্না আমার কানে আসছিল।
আমরা সবাই অসহায়ের মতো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারই মধ্যে কাকিমার সর্বহারা মর্মান্তিক কান্না আমার কানে আসছিল।
আমরা সবাই অসহায়ের মতো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলাম।
যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনওদিন দেখিনি..
এ-গল্প আমি শুনেছি রিমকির কাছে। ডাক নাম রিমকি, আর পোশাকী নাম রূপশ্রী। আমার বড়দার মেয়ে সোনালির সঙ্গে রিমিক কলেজে পড়ত। এরকম সবুজ মেয়ে আমি খুব কম দেখেছি– সবসময় টগবগ করে ফুটছে। যদি কখনও জিগ্যেস করতাম, এত এনার্জি তুই পাস কোথা থেকে? তাতে হেসে গড়িয়ে পড়ত মেয়েটা। বলত, মহাকাশ থেকে, কাকু, মহাকাশ থেকে!
সূর্যের ভেতরে যেমনটা হয়, ওর ভেতরেও বোধহয় ক্রমাগত নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়া হয়ে টন-টন হাইড্রোজেন বদলে যাচ্ছে হিলিয়ামে, আর তৈরি হচ্ছে অফুরন্ত প্রাণশক্তি।
একটা সময়ে আমি বড়দার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতাম। তখন রিমকি প্রায়ই আসত সোনালির কাছে। আর আমার ভূতচর্চার কথা শুনে এক-একদিন এসে ভূতের গল্প শোনার আবদার ধরত।
ভূত-প্রেতের গল্প ও শুনতে চাইত কেন সেটা আমি প্রথম দিন থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। গল্প শেষ হলেই ও বলে উঠত, কী দারুণ বোগাস টু-স্টোরি! কাকু, সত্যি করে বলুন না, মিথ্যেকে সত্যিতে কনভার্ট করার চেষ্টা করে আপনার কী লাভ? এবং তারপরই খিলখিল করে হাসি।
এইসব হাসি আর গল্পের মাঝেই চলত সরষের তেল দিয়ে মুড়ি-বাদাম-পেঁয়াজ-কাঁচালঙ্কা মেখে খাওয়া, আর বউদির তৈরি করে দেওয়া চা।
রিমকির সেই বয়েসের মুখটা বেশ মনে পড়ে। ফরসা লম্বাটে মুখ। টানা-টানা চোখ। বাঁ কানের নীচে একটা বড় তিল। কপালে কালো টিপ। পরনে উজ্জ্বল রঙের ঝলমলে চুড়িদার।
আমার বয়েসটা যদি বছর পনেরো-ষোলো কম হত তা হলে অবশ্যই আমি রিমকির প্রেমিক হতে চাইতাম। ও পাত্তা না দিলেও ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, সত্যিই এরকমটা ভাবতাম। বেশ বুঝতাম, রিমকির মধ্যে এমন একটা টান আছে যে, যে-কোনও পুরুষই ওকে ভালোবাসতে চাইবে।
ভূত যে নেই, একথা প্রমাণ করতে রিমকি প্রায়ই মহাতর্ক জুড়ে দিত আমার সঙ্গে। অনেক সময় বউদি আর সোনালিও ওর দলে যোগ দিত।
আমি ওকে শুধু বলতাম, রূপশ্রী, যেদিন তোমার হাড়ে হাড়ে অভিজ্ঞতা হবে, সেদিন বুঝবে আমার গল্পগুলো বোগাস-টু-স্টোরি, না শুধু টু-স্টোরি।
সত্যি, বয়েসের সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের কত ধ্যানধারণা বদলে যায়। যাকে চিরকাল, নেই বলে ভেবে এসেছি তাকে আছে বলে মেনে নিই। যেসব ঘটনা একসময় হয় না, হতে পারে না বলে বিশ্বাস করতাম, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে সে-বিশ্বাস কেমন বদলে যায়–তখন মনে হয়, হয়, হতেও পারে।
কিন্তু আমি কখনওই চাইনি, মর্মান্তিক কোনও অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে রিমকির বিশ্বাস বদলে যাক।
অথচ তাই হয়েছিল।
প্রায় বারো বছর পর একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে হঠাৎ করে দেখা হয়ে যেতেই বদলে যাওয়া রিমকিকে আমি চিনতে পারলাম। ওর টগবগে সবুজের ওপরে যেন সন্ধ্যার শান্ত ছায়া নেমে এসেছে।
একপাশে সরে গিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলার পর একটু সহজ হয়েছিল রিমকি। নরম গলায় বলেছিল, কাকু, শেষ পর্যন্ত আপনিই জিতলেন।
তারপর ওর গল্পটা আমাকে বলেছিল রিমকি–পুরোনো রিমকির ভাষায় বোগাস টু-স্টোরি। আর নতুন রিমকির ভাষায়? কী জানি!
শুরুর কবিতার লাইন দুটোও ওরই মুখে শোনা–গল্প বলার সময় গুনগুন করে আবৃত্তি করেছিল ও। শুনে আমার মনে হয়েছিল, গল্পের সব কথা যেন ওই মারাত্মক দুটো লাইনের মধ্যেই বলা হয়ে গেছে।
রিমকি আমাকে বলেছিল…।
.
আমি বাড়িতে পা দেওয়ামাত্রই একেবারে হইহই শুরু হয়ে গেল।
সুকান্তি একেবারে চেঁচিয়েই উঠল, মা, মা, মঙ্গলগ্রহ থেকে রূপশ্রী এসেছে! শিগগির নেমে এসো!
দোতলা থেকে নামতে নামতে পিসিমা বলে উঠলেন, রূপশ্রী আবার কে!
রূপশ্রী মানে রিমকি। ভুলেও তো আমাদের বাড়িতে আসে না, তাই বললাম মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছে। ও এখন কথায় কথায় হিল্লি-দিল্লি করে বেড়াচ্ছে বিগ বস। আমাদের আর পাত্তা দেবে কেন! দেখলে না, অত করে আসতে বললে, ছোড়দির বিয়েতেও এল না!
আমি সুকান্তিকে ধমকে উঠলাম, তুই থামবি! নাকে অক্সিজেনের নল গুঁজে নেনইলে বকবক করে হাঁফিয়ে পড়বি।
পিসিমা ততক্ষণে নীচে নেমে এসেছেন।
পরনে সাদা থান, গলায় সরু চেন, হাতে দু-গাছা চুড়ি, চোখে চশমা। মাথার চুলে বেশ পাক ধরেছে। বয়েস কত হবে এখন? মনে-মনে হিসেব করলাম। ষাট পেরিয়ে গেছেন নিশ্চয়ই। অথচ টকটকে ফরসা রং এতটুকু মলিন হয়নি। এখনও দারুণ সুন্দরী। ঠিক যেন দেবীপ্রতিমা। শুনেছি, পিসেমশাই পিসিমার রূপ দেখেই পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। সে কথা বুড়ো বয়েসেও বারবার বলতেন। আরও বলতেন, পিসিমা আগে চলে গেলে সেকষ্ট তিনি সইতে পারবেন না। ভগবান বোধহয় পিসেমশায়ের মনের কথা শুনতে পেয়েছিলেন। তাই সময় হওয়ার অনেক আগেই ওঁকে ডেকে নিয়েছেন।
রিমকিকে রূপশ্রী বললে কখনও চিনতে পারি! পিসিমা হেসে বললেন। তারপর আমাকে জিগ্যেস করলেন, কী রে, ইতির বিয়েতে এলি না কেন?
আমি কাঁধের ব্যাগটা বাঁ-হাতে সামলে ঝুঁকে পড়ে ঢিপ করে পিসিমাকে একটা প্রণাম করলাম।
পিসিমা আমার চিবুক ছুঁয়ে ঠোঁটে সে-আঙুল ছোঁয়ালেন : ইতি বারবার তোর কথা বলছিল…।
© 2023 BnBoi - All Right Reserved
© 2023 BnBoi - All Right Reserved