আমরা চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম। শুধু আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যেতে লাগল। আর মাঝে-মাঝে এরোপ্লেনের শব্দ। তবে বুকের ভেতর একটা ঢিপঢিপ শব্দও যেন টের পাচ্ছিলাম।
হঠাৎই জোরে শ্বাস ফেলার মতো ফোঁস করে একটা শব্দ হল। আর তারপরই আমাদের টেবিলটা সামান্য নড়ে উঠল।
প্রিয়নাথ সঙ্গে সঙ্গে পেনসিল-টর্চ জ্বেলে কম্পাস ও থার্মোমিটার দেখলেন। আমিও সেদিকে চোখ রাখলাম। কম্পাসের কাটা উত্তর দিকে মুখ করে স্থির হয়ে আছে, আর থার্মোমিটারে উষ্ণতা ১৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস-প্রেতচক্রে বসার আগে যা ছিল প্রায় তাই।
প্রিয়নাথ জোয়ারদার বলেছিলেন, কোনও প্রেতাত্মার উপস্থিতিতে কম্পাসের কাটা যে-কোনও দিকে মুখ করে অস্থিরভাবে ছটফট করতে থাকে। অনেক সময় বনবন করে পাক খায়। আর উষ্ণতা নামতে থাকে নীচের দিকে।
ফলে আমি একটু স্বস্তি পেলাম।
প্রিয়নাথ চাপা অথচ স্পষ্ট গলায় প্রশ্ন করলেন, কেউ কি এসেছেন?
কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। তবে মনে হল যেন, আচমকা শ্বাস টানার একটা শব্দ পেলাম। তারপর সব চুপচাপ।
বাপ্পা বোধহয় টেনশান আর সইতে পারছিল না। প্রিয়নাথের নিষেধ না মেনে ও ফিসফিস স্বরে প্রশ্ন করল, কে, জুমি?
আমাদের পাথর করে দিয়ে ফিশফিশ করে কেউ জবাব দিল, হ্যাঁ।
শব্দটা একটানা সুরে দীর্ঘশ্বাসের মতো বেরিয়ে এল। যেন বিশাল কোনও বেলুন থেকে ধীরে-ধীরে বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে।
প্রিয়নাথ উত্তেজিতভাবে ধমক দিয়ে বললেন, বাপ্পা, কী হচ্ছে। তারপর অন্ধকার লক্ষ করে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, কেউ কি এসেছেন?
কোনও উত্তর পাওয়া গেল না।
কিন্তু পরক্ষণেই যা দেখলাম তাতে আমার চেতনায় কেউ যেন ভারী একটা হাতুড়ি দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করল।
মিতি কখন যেন ওর চেয়ার ছেড়ে উঠে এসেছে। মোমবাতির আলোর সামান্য আভায় ওকে আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এ কোন মিতি!
ও কালচে রঙের একটা চুড়িদার পরেছিল–সেটা এখন ভৌতিক আলখাল্লার মতো লাগছে। ওর মুখে মূকাভিনেতাদের মতো সাদা রং মাখা। কেউ কি রং মাখিয়েছে, নাকি ভয়ে ফ্যকাসে হয়ে ওর মুখের এই চেহারা দাঁড়িয়েছে। ওর মুখের সাদা রঙের জন্যেই ওর ঠোঁটের বাঁ দিকে একটা কালো জজুল নজরে পড়ল–ঠিক জুমেলিয়ার মতো। কিন্তু মিতির মুখে তো কোনও জডুল নেই! হঠাৎ করে এ-জডুল এল কোথা থেকে!
হাত দুটো বিচিত্র ভঙ্গিতে মাথার ওপরে তুলে মিতি এপাশ-ওপাশ দুলছিল। বড়-বড় শ্বাস ফেলতে-ফেলতে ও বাপ্পাদিত্যর নাম ধরে ফিশফিশ করে দুবার ডেকে উঠল।
প্রিয়নাথ চাপা গলায় আদেশের সুরে বললেন, বাপ্পা, পেনসিল নিয়ে রেডি হও।
বাপ্পার হাত যে কাঁপছিল সেটা আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম। ও আমার হাত ছেড়ে পেনসিল নিয়ে তৈরি হল। আমি অন্ধকারেই আন্দাজ করে ওর কাঁধ ছুঁয়ে বসে রইলাম।
প্রিয়নাথ পেনসিল-টর্চ জ্বেলে কম্পাস আর থার্মোমিটার দেখলেন। সেখানে কোনও পরিবর্তন নজরে পড়ল না। তিনি উৎকণ্ঠিত গলায় প্রশ্ন করলেন, কেউ কি এসেছেন?
উত্তরে ঐন্দ্রিলা খলখল করে হেসে উঠল।
কাকিমা একটা ভয়ের চিৎকার দিয়ে উঠলেন। টেবিলে খটখট করে কয়েকবার শব্দ হল। আমার বুকের ভেতরে একটা পাগল তখন দুরমুশ পিটছিল।
এমন সময় একটা এরোপ্লেনের শব্দ শোনা গেল।
শৌনকদের বাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া প্রতিটি প্লেনের শব্দ ঠিক একইভাবে ক্ষীণ থেকে শুরু হয়ে জোরালো হয়, তারপর গোঁ-গোঁ শব্দটা কমজোরি হয়ে ক্রমে দূরে মিলিয়ে যায়।
কিন্তু এইবারের শব্দটা মাঝপথে থেমে গেল। কেউ যেন গলা টিপে একটা কথা-বলা পুতুলকে থামিয়ে দিল।
ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম। প্লেনটা আকাশ থেকে গেল কোথায়! কিন্তু ভাবার আর সময় পেলাম না। কারণ, ঠিক তক্ষুনি ঐন্দ্রিলা পাগলের মতো দিগবিদিক-জ্ঞানশূন্য হয়ে মাথা ঝাঁকাতে লাগল।
সে কী মাথা ঝাঁকানি! যেন একটা মাথা-নাড়া বুড়ো পুতুলের পা ধরে কেউ পাগলের মতো আঁকাচ্ছে।
ওই অবস্থাইে মিতি বাপ্পার নামটা ফিশফিশ করে বলছিল।
বাপ্পা ডুকরে কেঁদে উঠল। কাগজের ওপরে ওর পেনসিল ধরা হাত খসখস শব্দে চলতে লাগল।
আর স্পষ্ট টের পেলাম ঘরের উষ্ণতা কমছে। ভীষণ শীত করছে আমাদের।
প্রিয়নাথ পেনসিল-টর্চ জ্বেলে থার্মোমিটার আর কম্পাস দেখলেন। ঘরের উষ্ণতা প্রায় ১০ ডিগ্রি, আর কম্পাসের কাটাটা বনবন করে ঘুরছে।
প্রিয়নাথ একরকম চিৎকার করেই জিগ্যেস করলেন, কেউ কি এসেছেন?
উত্তরে মিতি আবার খলখল করে হেসে উঠে অদ্ভুত চেরা গলায় বলল, এখনও তুই বুঝিসনি?
পাশের ঘরের টেলিফোনটা হঠাৎই পাগলা-ঘণ্টির মতো বাজতে শুরু করল। এরকম দ্রুত কখনও আমি টেলিফোন বাজতে শুনিনি।
একটা জানলা দড়াম করে খুলে গেল। ঠান্ডা বাতাস সাপের মতো পাক খেয়ে ঢুকে পড়ল ঘরে। তারপর প্রলয়নৃত্য নাচতে শুরু করল।
আমাদের অবাক করে দিয়ে বাতাসের সঙ্গে-সঙ্গে ঢুকে পড়ল অসংখ্য জোনাকি। লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি জোনাকি। অন্ধকার ঘরে আগুনের ফুলকি হয়ে ওরা আঁক বেঁধে ভেসে বেড়াতে লাগল। ওদের এলোমেলো ভেসে বেড়ানো দেখে বাতাসের স্রোত বোঝা যাচ্ছিল।
তিওয়ারি আর্তনাদের মতো একটা শব্দ করল। তারপর চেঁচিয়ে উঠল, ভাগজোগনি! ভাগজোগনি! জুগনু! জুগনু!
ততক্ষণে ঠান্ডায় আমরা ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছি। আর কাকিমা মিতি! মিতি! বলে ডেকে-ডেকে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছেন।
