প্রায় পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর ধরে ভুত-প্রেত, অশরীরী-অলৌকিক নিয়ে আমার কম অভিজ্ঞতা হল না। তা ছাড়া ভুত-প্রেতের বহু কাহিনিও আমি শুনেছি। সেইসব অভিজ্ঞতা ও কাহিনি আমি যত্ন করে লিখে রেখেছি বারোটা মোটা মোটা বাঁধানো খাতায়–অনেকটা ডায়েরির মতন। মাঝে মাঝে সেই খাতাগুলোর পাতা উলটে স্মৃতিচারণ করি।
সম্প্রতি আমার আলাপ হয় এক কলমচির সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, তিনি নাকি বানিয়ে বানিয়ে ভুতের গল্প লেখেন। তখন আমি হেসে আমার খাতাগুলোর কথা তাঁকে বলি। শুনে তাঁর উৎসাহ দ্যাখে কে! আমার মিনমিনে ওজর-আপত্তি অগ্রাহ্য করে তিনি খাতাগুলো নিয়ে যান। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ডায়েরির লেখাগুলো ঘষে-মেজে কল্পনার প্রলেপ দিয়ে সামান্য রদবদল করে একে-একে আমি লিখব। আপনার কোনও আপত্তি শুনব না।
ভদ্রলোক আমার চেয়ে বয়েসে অনেক ছোট। তাই একরকম স্নেহের বশেই তাঁকে আমি অনুমতি দিয়েছি। আমার ডায়েরির পৃষ্ঠায় কাহিনিগুলোকে বন্দি না রেখে সকলের সামনে প্রকাশ করলে ক্ষতি কী!
.
ভূতনাথের ডায়েরি : অন্ধকারে, হাতে হাত রেখে
প্ল্যানচেট শব্দটা প্রথম কে উচ্চারণ করেছিল জানি না, তবে তাকে আমি দোষ দিতে চাই না। কারণ সে-রাতে শেষ পর্যন্ত যা হয়েছিল তার জন্যে আমরা কেউই দায়ী ছিলাম না। দায়ী ছিল একমাত্র নিয়তি।
ঘটনার শুরু সায়েন্স কলেজের ক্যান্টিনের আড্ডা থেকে।
পি-কে-সি-র ক্লাস কেটে আমরা পাঁচজন চায়ের কাপ সামনে রেখে টাইটানিক নিয়ে তুমুল তর্ক করছিলাম। বিষয় ছিল কেট উইনস্লেট বেশি সুন্দর দেখতে, না মাধুরী দীক্ষিত।
হঠাৎই রমেশ তিওয়ারি বলে উঠল, পরশু আমি জুমেলিয়াকে স্বপ্নে দেখেছি।
আমাদের আড্ডা ঝুপ করে থেমে গেল। সবাই চুপ।
কারণ জুমেলিয়া তিনমাস আগে অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।
ও আমাদের সঙ্গেই পড়ত। মাস তিনেক আগে আমরা, মানে বি. টেক, থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্টরা, শৌনকদের মাইকেলনগরের বাগানবাড়িতে পিকনিক করতে গিয়েছিলাম। দলে আমরা মোট সতেরোজন ছিলাম। পিকনিকটা ছিল একেবারেই আমাদের নিজেদের ব্যাপারফলে কোনও স্যার-ট্যার সঙ্গে যাননি। শীতের ছুটির দিনটা আমাদের দারুণ কেটেছিল।
তা ছাড়া শৌনকদের বাগানবাড়িটাও ছিল চমৎকার। বিশাল গাছ-গাছালির বাগান, আর তার সঙ্গে প্রকাণ্ড মাপের দোতলা বাড়ি। কলকাতার যে-নির্জনতার দেখা পাওয়াই ভার, এখানে তাকে দ্যাখে কে! তাই হারিয়ে যাওয়ার কোনও মানা ছিল না। জোড়ায় জোড়ায় অনেকে হারিয়েও গেছি।
দিনটা আমার স্পষ্ট মনে আছে দুটি কারণে।
সেদিন আমি সুছন্দাকে প্রথম চুমু খেয়েছিলাম।
আর, ফেরার সময় যশোর রোডের ওপর জুমেলিয়া অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়।
সেদিন ওর সিগারেট খাওয়ার ঝোঁক চেপেছিল। একে তো পিকনিকে হুল্লোড় করে এক দু-পেগ খেয়ে একটু টিপসি ছিল, তার ওপর জেদি–তাই ফেরার পথে জেদ ধরল এক্ষুনি ওর ক্লাসিক সিগারেট চাই।
আমাদের কারও সঙ্গে ক্লাসিক ছিল না। আমরা অন্য ব্র্যান্ড ওকে দিতে চাইলাম। কিন্তু ওর সেই এক কথা, আমার বাপি ক্লাসিক ছাড়া খায় না–আমারও ওই চাই–রাইট নাউ। সো স্টপ দ্য ব্লাডি বাস।
বাস থামিয়ে জুমেলিয়া একা-একাই নেমে পড়েছিল। রাস্তা পার হয়ে গিয়েছিল একটা পান সিগারেটের দোকানে। তারপর ফেরার সময় একটা ট্রাক ওর সিগারেট খাওয়ার সাধ চিরজীবনের মতো শেষ করে দিল।
জুমেলিয়ার সঙ্গে আমাদের ক্লাসের বাপ্পাদিত্যর ইয়ে আছে। কিন্তু বাপ্পা নিজেও সেদিন একটু আধটু আউট ছিল। তার ওপরে জুমেলিয়া হল বড়লোক বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে–আদুরে এবং জেদি। সুতরাং ওর ভবিতব্য কেউ বদলাতে পারেনি।
নির্জন শীতের রাস্তায় সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের সাঙ্ঘাতিক এক ধাক্কা দিয়েছিল। আমরা পাথর হয়ে গিয়েছিলাম।
বাপ্পাদিত্য প্রায় দুমাস পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। তারপর কোনওরকমে সামলে উঠেছে। এখনও ও প্রায়ই আনমনা হয়ে পড়ে, ক্লাসের পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে না। সবকিছু ভীষণ ভুলে যায়। অথচ ও পড়াশোনায় দারুণ ছিল। বি. টেক. পার্ট ওয়ান আর পার্ট টু মিলিয়ে ওর র্যাঙ্ক সেকেন্ড। জানি না, ফাইনাল ইয়ারে কীরকম রেজাল্ট করবে।
জুমেলিয়ার থেঁতলানো দেহটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। ওর ফরসা সুন্দর মুখটা অটুট ছিল। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় ওর মুখ দেখে মনেই হয়নি ও আর নেই। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। অপলক দু-চোখে অনেক সাধ ও স্বপ্ন। আর ঠোঁটের বাঁদিকে ছোট্ট কালো জডুলটা বরাবরের মতোই সুন্দর। বাপ্পা ওই জঙুলটার জন্যে পাগল ছিল।
আমরা পাঁচজনই সেই পিকনিকে ছিলাম। আমি, বাপ্পা, রমেশ তিওয়ারি, শৌনক, আর ঐন্দ্রিলা।
রমেশের কাণ্ডজ্ঞান বেশ কম। যখন যা মনে হয় হুটহাট করে বলে দেয়। যেমন, এখন। বাপ্পার অবস্থা জেনেশুনেও ও ফস করে জুমেলিয়ার কথা তুলে বসল। তা ছাড়া, আমরা অনেকেই জানি, জুমেলিয়ার ব্যাপারে তিওয়ারির ইন্টারেস্ট ছিল। ভালো করে বাংলা শেখার জন্যে ও আমাকে আড়ালে বহুবার ধরেছে। বলেছে, রঙ্গন, ইয়ার আমাকে দো-তিন বাংলা লাভ ডায়লগ শিখিয়ে দে।
আমি হেসে জানতে চেয়েছি, কেন? কোথায় অ্যাপ্লাই করবি?
জুমেলিয়ার কথা তিওয়ারি আর বলতে পারেনি। কারণ ও জানত, বাপ্পাকে আমরা সবাই ভালোবাসি। এমনকী ঐন্দ্রিলাও বাপ্পাকে মনে-মনে চাইত। পরে শৌনকের সঙ্গে রিলেশান হয়।
