ছেলের বন্ধুর কথা শুনে বড়মাসি তো হাঁ। অবাক গলায় বললেন, সে কী, বাবা! ভুলো যে জামাকাপড় পরে মিনিট কুড়ি আগে খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে গেল! বলল, শঙ্করদের বাড়ি যাব, ভীষণ জরুরি দরকার।
বন্ধুটি আরও অবাক। কারণ তারই নাম শঙ্কর। তাকে সদরে দাঁড় করিয়ে রেখে খিড়কি দরজা দিয়ে চলে গেছে ভুলোদা! গেছে আবার তাদেরই বাড়িতে, তার সঙ্গে দেখা করতে।
মাসিমা, আমারই নাম শঙ্কর– এ-কথা চেঁচিয়ে বলে সে তখন ছুটতে শুরু করেছে বাস স্টপের দিকে। যদি কোনওরকমে ভুলোদাকে ধরা যায়।
ভুলোদাকে ধরা গিয়েছিল। তখন জিভ কেটে মাথায় হাত দিয়ে সে বলে উঠেছিল, ইশ! একদম ভুলে গেছি রে!
সুতরাং এইরকম ভুলোদার সঙ্গে নেমন্তন্ন বাড়ি যেতে ভয় করবে না। কিন্তু এখন তো আর উপায় নেই।
সুতরাং সন্ধেবেলা রওনা হয়ে গেলাম দুজনে। মা বারবার করে বলে দিলেন, ভুলো, তোর ছোট ভাইটিকে ভুলে যাস না যেন।
ভুলোদা হেসে বলল, তুমি কিছু ভেবো না, মাসি। ভুল আমার হয়, তবে বাবানকে ভুলে যাব, এতবড় ভুলো আমি নই। মউ তখন মুচকি মুচকি হাসছে। আমিও রেগে গিয়ে বলে দিলাম, কাল পরীক্ষায় লাড্ডু পাবি।
মউ নাকিসুরে প্রতিবাদ করতেই মা বললেন, কী হচ্ছে বাবান। ও-কথা বলতে নেই।
সন্ধেবেলা রওনা হওয়ার পর থেকেই আমি ভুলোদার সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছি। যদি হঠাৎই কিছু ভুল করে বসে! কপাল ভালো যে, যাওয়ার পথে বা ছোটমাসির বাড়িতে সময়টুকু বেশ ভালোয়-ভালোয় কেটে গেল। তারপর আমরা রওনা হলাম বাড়ির দিকে। তখন রাত প্রায় দশটা।
পাড়ার বাসস্টপে যখন নামলাম তখন রাত এগারোটা পেরিয়ে গেছে। চারপাশ বেশ অন্ধকার। অর্থাৎ, লোডশেডিং। নির্জন অন্ধকার রাস্তায় চলতে গিয়ে গা-টা বেশ ছমছম করে উঠল। চাঁদের আলোয় পথ দেখে আমি আর ভুলোদা এগিয়ে চলেছি। হঠাৎই একটা দোকানের আড়াল থেকে অন্ধকার কুঁড়ে দুটো লোক বেরিয়ে এল। দুটো কালো ছায়া। সোজা এসে একেবারে আমাদের পথ আটকে দাঁড়াল। ওদের মুখগুলোও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। কর্কশ গলায় একজন বলল, মালকড়ি যা আছে ঝটপট দিয়ে দে।
ঠিক তক্ষুনি দ্বিতীয় লোকটা একটা রিভলভার বের করল। ছবিতে যেমন দেখেছি ঠিক সেইরকম, সত্যিকারের রিভলভার। তারপর রিভলভারটা ভাজ করে গুলির চেম্বারটা দেখিয়ে বলল, দেখেছ তো, চেম্বারে গুলি ঠাসা আছে! গোলমাল করলেই খুলি উড়ে যাবে!
আমি পকেট থেকে কটা টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা বের করে প্রথম লোকটার হাত তুলে দিলাম। কাঁপা গলায় ভুলোদাকে বললাম, ভুলোদা, যা দেওয়ার দিয়ে দাও।
দ্বিতীয় লোকটা তখন রিভলভার ঠেকিয়ে ধরেছে ভুলোদার বুকে? জলদি!
সেই মুহূর্তেই ভুলোদা এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। রিভলভার ধরা লোকটার নাকে সপাটে বসিয়ে দিল এক বিরাশি সিক্কার ঘুসি। লোকটা ব্যায়াম করা হাতের ঘুসি খেয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে। আর ভুলোদা সঙ্গে-সঙ্গে, বাবান, কুইক। বলে দে ছুট। চমক ভেঙে আমিও ছুটতে লাগলাম ভুলোদার পেছনে। মুখ ফিরিয়ে দেখি, প্রথম গুন্ডাটা ছুটে পালাচ্ছে। দুনম্বরটা বোধহয় তখনও সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে।
ছুটতে ছুটতে খেয়াল হওয়ায় হঠাৎ ভুলোদা চিৎকার শুরু করে দিল, পুলিশ! পুলিশ!
আমিও তার দেখাদেখি চিৎকার শুরু করলাম। তারপর দু-চারজন মানুষের সাড়া পেতেই আমরা থেমে পড়লাম। আরও লোক জড়ো হতে লাগল। নাইট ডিউটির দুজন পুলিশ কনস্টেবলও হাজির হল সেখানে।
সবাই মিলে যখন অকুস্থলে হাজির হলাম, তখনও গুন্ডাবাবাজি অজ্ঞান। টর্চের আলোয় দেখলাম তার নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। রিভলভারটা পড়ে আছে পাশেই। আমাদের নামধাম লিখে নিয়ে বলা হল পরদিন থানায় দেখা করতে।
পরদিন একেবারে হুলুস্থুল কাণ্ড! সারা পাড়ায় রটে গেল, ভুলো ডাকাত ধরেছে। একেবারে যে-সে ডাকাত নয়, রিভলভার-ধরা সাঙ্ঘাতিক ডাকাত। থানার অফিসারও ভুলোদাকে পিঠ চাপড়ে বারবার বাহবা দিলেন। বললেন, ওই কুখ্যাত ফেরারি গুন্ডাটিকে তারা বেশ কিছুদিন ধরেই খুঁজছিলেন।
থানা থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভুলোদাকে আমি বললাম, ভুলোদা, তোমার এত সাহস! ছ-ছটা তাজা কার্তুজ ভরা রিভলভারওলা লোকটাকে তুমি এক ঘুসিতে শুইয়ে দিলে! তোমার কি প্রাণের ভয় নেই!
ভুলোদা উদাস মুখে বলল, ভয় কি আর নেই রে, বাবান। আসলে তুই যখন বললি, ভুলোদা, যা দেওয়ার দিয়ে দাও, আমি ভাবলাম তুই বোধহয় গুন্ডাগুলোকে ধোলাই দেওয়ার কথা বলছিস। ব্যস, দিলাম একখানা হুক সামনেরটাকে বসিয়ে। তখন কি আর রিভলভারের কথা আমার মনে আছে রে! সে তো একদম ভুলেই গেছি!
