তিওয়ারি জুমেলিয়ার কথা বলামাত্রই আমাদের আলোচনার বিষয় পালটে গেল। আলোচনা শুরু হল পিকনিক আর জুমিকে নিয়ে।
আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে-মনে চাইছিলাম এ-আলোচনা বন্ধ হোক, কিন্তু তা হয়নি। ধাপে-ধাপে আলোচনা পৌঁছে গেল আত্মা, প্রেতাত্মা, প্ল্যানচেট, সিয়াস, প্রেতচক্ৰ, এইসবের দিকে। তবে প্ল্যানচেট শব্দটা প্রথম কে উচ্চারণ করেছিল তা আমার মনে নেই।
ঐন্দ্রিলা এক চুমুকে চায়ের কাপ শেষ করে বলল, আমার বড়জেঠু ছোটবেলায় খুব প্ল্যানচেট করতেন। নামকরা লোকদের নাকি ডেকে আনতেন। একবার নাথুরাম গড়সে-কে ডেকেছিলেন। তখন অন্ধকার ঘরের মধ্যে গুলির শব্দ শুনেছিলাম।
শৌনক হো-হো করে হেসে উঠে বলল, যত্ত সব লাটাই-ঘুড়ি! আর-একটু তোল্লাই দিলেই বলবি মহাত্মা গান্ধীর হা রাম! কথাটাও তিনি শুনতে পেয়েছিলেন।
ঐন্দ্রিলা রীতিমতো খেপে গিয়ে বলে উঠল, প্ল্যানচেটের তুই কী বুঝবি! তোর কাছে তো সবকিছু ট্যান হয়ে বেরিয়ে যায়।
আমি ওদের শান্ত করার জন্যে বললাম, তোরা যা-ই বল, প্ল্যানচেট ব্যাপারটা বোধহয় একেবারে বোগাস নয়। আমি একজনকে জানি…। ।
বাপ্পা আমাকে বাধা দিল? আমি জুমিকে প্রায়ই স্বপ্নে দেখি। কিছুতেই ওকে ভুলতে পারছি না।
কথা বলতে বলতেই বাপ্পা মাথা নীচু করল, চোখ বুজে চোখের কোণ আঙুলে টিপে ধরল। ওর পিঠটা বারবার কেঁপে উঠতে লাগল। বুঝতে কোনও অসুবিধে হল না যে, বাপ্পা কাঁদছে।
ঐন্দ্রিলা বাপ্পার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল, বিষণ্ণ গলায় বলল, অন্য কথা ভাবার চেষ্টা কর। জুমি তো আর নেই। ওর কথা ভেবে শুধু-শুধু কষ্ট পাচ্ছিস।
আমি আর শৌনক বাপ্পাকে বোঝাতে লাগলাম। ওর মনটা বড় নরম আর সাদাসিধে– ঠিক কচি কলাপাতার মতো–অল্পেতেই আঁচড় পড়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর বাপ্পা নিজেকে সামলে নিয়ে ভারী গলায় বলল, আমার কপালটাই খারাপ। জুমিকে যদি একটিবার দেখতে পেতাম!
শৌনক আনমনা হয়ে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎই ও ক্যান্টিনের বেঞ্চি ছেড়ে উঠে এল বাপ্পার খুব কাছে। তারপর সিরিয়াস গলায় বলল, তোকে একটা কথা জিগ্যেস করব?
বাপ্পা অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকাল ওর দিকে। আমরাও খানিকটা বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইলাম শৌনকের চোখে।
শৌনক আবার বলল, একটা কথা তোকে জিগ্যেস করব?
কী কথা? বাপ্পা জানতে চাইল।
জুমেলিয়াকে একবার দেখতে পেলেই তোর সাধ মিটবে?
বাপ্পা অস্বাভাবিক ঝটকায় মাথা কঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ।
রমেশ এতক্ষণ গোবেচারাভাবে এর-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিল, এইবার বলে উঠল, ক্যায়সে দেখা যাবে?
আমি আর ঐন্দ্রিলাও মুখে-চোখে একই প্রশ্ন ফুটিয়ে চেয়ে রইলাম শৌনকের দিকে।
শৌনক বাপ্পাকে আড়াল করে ঐন্দ্রিলার দিকে তাকিয়ে ষড়যন্ত্রের হাসি হাসল। তারপর বলল, আমরা পাঁচজন মিলে প্ল্যানচেটে বসব। ঐন্দ্রিলা মিডিয়াম হবে। জুমেলিয়ার সঙ্গে ওর ভালোরকম দোস্তি ছিল। সুতরাং আমার বিশ্বাস, প্ল্যানচেটে জুমেলিয়া দেখা দেবে।
আমি কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেলাম। একটু আগেই যে প্রেতচক্র নিয়ে ঐন্দ্রিলাকে ঠাট্টা তামাসা করে নাজেহাল করছিল সে হঠাৎ সিরিয়াসলি প্রেতচক্রের কথা ভাবছে! আর শুধু তাই নয়, জুমেলিয়া যে দেখা দেবে সে-কথাও প্রায় নিশ্চিতভাবে বলছে!
আমি ইতস্তত করে বললাম, আমি ওতে নেই। প্ল্যানচেটের ব্যাপারে আমার ফান্ডা নেই।
তিওয়ারি বলল, রঙ্গন, তুই বেকার ঘাবড়াচ্ছিস। ভূতে আমার জবরদস্ত ফান্ডা আছে।
পৃথিবীতে হেন কোনও বিষয় নেই যাতে রমেশ তিওয়ারির ফান্ডা নেই। সাধে কি আমরা ওকে ফান্ডামেন্টাল তিওয়ারি বলে খ্যাপাই!
ঐন্দ্রিলা বলল, তিওয়ারির ফান্ডার ওপর ঠিক রিলাই করা যাবে না। রঙ্গন, তুই ব্যাপারটা নিয়ে একটু পড়াশোনা কর। আমি তোকে প্রচুর বইপত্র দেব। তোর হোমটাস্ক হয়ে গেলে আমরা কাজে নামব।
আমি বাপ্পাকে দেখছিলাম। ওর মুখচোখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বল আভা ফুটে উঠেছে। জুমেলিয়াকে একটিবার দেখার জন্যে ও সত্যিই পাগল হয়ে গেছে।
তিওয়ারি বলল, রঙ্গন পড়াশোনা করে করুক, হামি ভি থোড়াবহৎ স্টাডি করে আসব। কিন্তু কোথায় বসে প্ল্যানচেট করবি?
আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতেই শৌনক বলল, মাইকেলনগরে আমাদের বাগানবাড়িতে হবে। জায়গাটা জুমির হেভি পছন্দ ছিল।
আমি বললাম, প্ল্যানচেটের ব্যাপারটা রাতে হলেই ভালো হয় বলে শুনেছি। যদি সেটাই হয়, তা হলে সে-রাতে আমরা ফিরতে পারব না। ঐন্দ্রিলা কি আমাদের সঙ্গে থাকতে পারবে? কাকিমা কি পারমিশান দেবেন?
শৌনক অন্যরকম করে হাসল, বলল, আমি যখন আছি তখন পারমিশান পাওয়া যাবে। আমরা তো পরীক্ষার পরই সেক্স করব। কী বল, মিতি?
মিতি ঐন্দ্রিলার ডাকনাম। শৌনক মাঝে-মাঝে ওকে এই নামে ডাকে। মজা করে বলে, ওর ডাকনামটা জ্যামিতি থেকে এসেছে।
ঐন্দ্রিলা বলল, মাম্মির প্ল্যানচেটের ব্যাপারে খুব ইন্টারেস্ট। তা ছাড়া জুমিকে চিনত। জুমি আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েকবার গিয়েছিল। জুমিকে প্ল্যানচেট করা হবে শুনলে মাম্মি হয়তো আমার সঙ্গে যেতে চাইবে।
শৌনক একেবারে হাততালি দিয়ে উঠল : তা হলে তো দারুণ হবে! কাকিমার হাতের রান্না খাওয়া যাবে–ঠিক পিকনিকের মতন…।
বাপ্পাদিত্য বিড়বিড় করে বলল, জুমেলিয়াকে যদি দেখাতে পারিস, তোদের কাছে আমি এভার গ্রেটফুল থাকব।
