বিশ্বনাথ ওর গলায় বাষট্টি শোনামাত্রই চোখ তুলে তাকালেন। ওর কথার পিঠে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কারও রিলেশান হয়নি…সেটা ভাবা যায় না। তুমি এত সুন্দর…।’
‘আপনি দেখছি ছাব্বিশের মতো কথা বলছেন!’
‘সরি।’ ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন বিশ্বনাথ। একটু থেমে বললেন, ‘ঠিকই বলেছ। একটা বয়েসের পর সত্যি কথা বলতে নেই—বেমানান লাগে—।’
‘আমি কিন্তু হার্ট করতে চাইনি। জাস্ট একটু মজা করছিলাম—।’
‘আগের প্রশ্নটা আবার করতে পারি?’ অনুমতি চাওয়ার ঢঙে বললেন বিশ্বনাথ।
‘কোন প্রশ্ন?’
‘কারও সঙ্গে রিলেশান হয়নি কেন?’
একটু ইতস্তত করে তিতলি বলল, ‘আপনাকে সত্যি কথাটা বলছি। কাল আপনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন। তা না হলে আজ এত কথা কার সঙ্গে বলতাম।’ মাথার চুলে হাত বোলাল। ভঙ্গিটা বিশ্বনাথের ভালো লাগল। আরও মনে হল, একটা বয়েসের পর এই ভালো লাগাটা অন্যায়।
তিতলি সময় নিচ্ছিল। এপাশ-ওপাশ তাকাল অকারণেই। তারপর খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলার ঢঙে আলতো স্বরে বলল, ‘সেই ছোটবেলায় একজনের সঙ্গে রিলেশান হয়েছিল। তখন আমি পনেরো। ও-ই আমাকে আমার শরীরটাকে চিনিয়েছিল। ও ছাড়া আমাকে আর কেউ ভালোবাসত না—আমার বাবা-মাও না।’
বিশ্বনাথের দিকে চোখ ফেরাল। চোখের কোণে হিরের কণা।
‘কেন? বাবা-মা নয় কেন?’
‘বাবা মেয়ে চায়নি। আমার জন্মের পর যখন আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসে তখন একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হয়েছিল…।’ আবার জানলার দিকে তাকাল তিতলি।
বিশ্বনাথ ওর মুখের দিকে চেয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
চট করে বিশ্বনাথের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল: ‘এসব কথা আপনাকে বলছি…এগুলো ভীষণ পার্সোনাল…মানে…।’
বিশ্বনাথ বুঝলেন তিতলির ভেতরে একটা লড়াই চলছে। ও দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল। বিশ্বনাথ সুবোধ ছাত্রের মতো অপেক্ষা করে চললেন।
একসময় মেঝের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল। বলল, ‘টু হেল উইথ সো কলড সিক্রেটস!’ মুখ তুলল, ঠোঁট কামড়াল। তারপর: ‘আমাদের রিলেটিভসরা সবাই আমাকে আর মা-কে দেখতে এসেছে। আমার এক মাসি হঠাৎ বাবাকে লক্ষ করে বলল, ‘কী সুন্দর দেখতে হয়েছে না! ঠিক মন্দিরার মুখটা যেন বসানো। কী দারুণ লাগছে, তাই না!”
‘মন্দিরা আমার মায়ের নাম। বাবা ”মণি” বলে ডাকত। তো মাসির কথা শুনে বাবা সেই কথাটা বলেছিল…।’
‘কী কথা?’ আড়ষ্ট গলায় জানতে চাইলেন বিশ্বনাথ।
‘বাবা মাসিকে বলেছিল, ”পরীক্ষায় ফেল করলে যেমন লাগে আমার ঠিক সেরকম লাগছে।” কথাটা শুনে মা নাকি সবার সামনে কেঁদে ফেলেছিল।’
‘তুমি জানলে কী করে?’
‘আমি বড় হওয়ার পর বাবার সঙ্গে মায়ের একদিন তুমুল ঝগড়া লেগেছিল। বাবা রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তখন মা হাউহাউ করে কাঁদতে-কাঁদতে…কথাগুলো …বলেছিল আমাকে…।’
চোখে জল জমে গিয়েছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিতলি চোখ না বুজে জোর করে তাকিয়ে রইল। জলের ফোঁটা ওর গালে গড়িয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। সিগারেটটা বিশ্বনাথের তেতো লাগছিল। ওটা টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন। তিতলিও কখন যেন হাতের সিগারেটটা মেঝেতে ফেলে দিয়েছে।
বিশ্বনাথ নরম গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘মা ভালোবাসত না?’
‘বাসত—’ ধরা গলায় তিতলি বলল।
‘তারপর?’
‘আমার জন্মের পর থেকে মায়ের সঙ্গে বাবার রিলেশানটা ধীরে-ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। বেশ কয়েক বছর পর মায়ের মনে হল, আমার জন্যেই এমনটা হচ্ছে—আমি নাকি অপয়া।’ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মুখ ভার করে বসে রইল। তারপর: ‘কী আর বলব! বাবার বাইরের টান ছিল…মা সেটা জানত। আমি তো ছোট ছিলাম…অতসব বুঝতাম না। মা বলত, ”পরীক্ষায় ফেল করার পর থেকে তোর বাবার বাইরের নেশা বেড়েছে। এখনও বুঝিসনি তুই অপয়া!” আমি আস্তে-আস্তে বুঝতে শিখছিলাম…। তারপর কয়েক বছরের মধ্যে মনে-মনে অনেক দূরে চলে গেলাম…একা হয়ে গেলাম…।
‘তারপর…পনেরোয় পা দিলাম। ও এল…চলেও গেল। ব্যস, গল্প শেষ!’
বিশ্বনাথের দিকে মুখ তুলে হাসল তিতলি। চোখে তখনও জল। জল মুছল। তারপর দু-হাত শূন্যে ঘুরিয়ে আনন্দের ভঙ্গি করে বলল, ‘দুর! ওসব পুরোনো কথা ভেবে কোনও লাভ নেই। হাতে বেশি সময় নেই, বাষট্টি। তাই আমি লাইফের সবরকম দেখতে চাই…।’
বিশ্বনাথের মনে হল, তিতলি এখন আর মুখ খুলবে না। তাই স্বাভাবিক গলায় ফিরে আসার চেষ্টা করে বললেন, ‘কেন লাইফ কি সিনেমা নাকি? যেখানে সবরকম মশলা পাওয়া যায়?’
‘না তো কী!’ একলাফে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
বিশ্বনাথ দেখছিলেন, মেয়েটা কেমন পালটে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ওর একটু আগের কষ্টমাখা মুখটাকে বদলে ফেলতে চাইছে একপলকে।
‘কাল রাতে লোকগুলো তোমাকে অ্যাটাক করেছিল কেন?’ সেই পুরোনো প্রশ্নে ফিরে গেলেন বিশ্বনাথ।
‘ওসব পরে হবে। চলুন, আপনাকে আগে ফ্ল্যাটটা ভালো করে দেখাই—’ তিতলি ওর শোওয়ার ঘরের দিকে রওনা হল। বিশ্বনাথকে আসার জন্য ইশারা করে বলল, ‘ফ্ল্যাটটা নেহাত খারাপ না—কী বলেন!’
‘দারুণ ভালো—’ ফ্ল্যাটের তারিফ করলেন বিশ্বনাথ, ‘শুধু একটু অগোছালো—।
‘হ্যাঁ। জাস্ট লাইক মাই লাইফ।’
এরপর ওরা দুজনে এ-ঘর সে-ঘর ঘুরে দেখতে লাগল।
বিশ্বনাথ ফ্ল্যাটের মার্বেল করা মেঝেতে বেশ সহজভাবেই ঘোরাফেরা করছিলেন। ওঁকে মোটেই অতিথি বলে মনে হচ্ছিল না।
