একা-একা এতবড় ফ্ল্যাটে থাকেন…ভয় করে না?
যত না ভয় তার চেয়ে বেশি মনখারাপ লাগত।
আপনি কি সারাজীবন একা না কি? কেউ-না-কেউ নিশ্চয়ই আছে…।
জীবনের শুরুতে মা-বাবা-ভাই-বোন ছিল। তারপর স্বামী। আর তারপর…একা আমি।
আপনার হাজব্যান্ড এখন কোথায়?
এ-থ্রি সিটিতে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে আছে। বছরখানেক হল আমাদের কাটাকুটি হয়ে গেছে।
কাটাকুটি! শব্দটা কেমন যেন কানে বাজল।
স্নিগ্ধপ্রভাতের কপালে বোধহয় প্রশ্নের ভাঁজ পড়েছিল। সেটা লক্ষ করে অঙ্গলাবণি বলল, না–ডিভোর্স হয়নি। অফিসিয়ালি ডিভোর্স পেতে এখনও বছরদুয়েক বাকি।
কথাটা বলে তেতো হাসল। স্নিগ্ধপ্রভাতের পাতে আরও একটু তরকারি দিল।
মুখে ভাত নিয়ে জড়ানো গলায় স্নিগ্ধপ্রভাত জিগ্যেস করল, আপনাকে ছেড়ে চলে গেল কেন?
ও ভীষণ বোর হয়ে গিয়েছিল। বলত, আমাদের ভালোবাসা নাকি ফুরিয়ে গেছে। এর পর তো আর একসঙ্গে থাকার কোনও মানে হয় না!
দারুণ!
অঙ্গলাবণি অবাক হয়ে স্নিগ্ধপ্রভাতের চোখে তাকাল।
স্নিগ্ধপ্রভাত বলল, রান্নাটা দারুণ হয়েছে। তারপর ও কী নাম আপনার হাজব্যান্ডের?
জেনে কী হবে!
তবু…জানতে ইচ্ছে করছে।
শোভনসুন্দর…।
নামটা চমৎকার–তবে মানুষটা নয়।
কী করে বুঝলেন?
আপনাকে ভালোবাসতে চায়নি, তাই।
হাসল অঙ্গলাবণি : আমারও তো অনেক দোষ থাকতে পারে! চট করে কারও সাইড নেওয়া ঠিক নয়।
আপনার সাইড নিতে আমার ভালো লাগছে। এটা কিন্তু খোশামোদ নয়। আসলে প্রত্যেকের মনের ভেতরে ভালো লাগার একটা সুইচ আছে। ওটা যখন-তখন কোনও লজিক ছাড়াই অন-অফ হয়। আপনার বেলায় অন হয়ে গেছে।
খেতে-খেতেই হেসে গড়িয়ে পড়ল অঙ্গলাবণি। হাসি থামলে পর বলল, সত্যি, আপনি এক অদ্ভুত মানুষ!
শোভনসুন্দর। নামটা মনে-মনে বিড়বিড় করল স্নিগ্ধপ্রভাত। অঙ্গলাবণি আর শোভনসুন্দরের জীবনে ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে।
স্নিগ্ধপ্রভাত অবাক হয়ে যাচ্ছিল। অঙ্গলাবণির জীবনের সঙ্গে ওর এত মিল! কোন বিচিত্র এক দুর্ঘটনা দুজন সমান্তরাল মানুষকে একটি বিন্দুতে মিলিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ স্নিগ্ধপ্রভাতকে খুঁটিয়ে লক্ষ করল অঙ্গলাবণি। তারপর আলতো করে ছুঁড়ে দিল একটি প্রশ্ন : আপনার বাড়িতে কে কে আছে?
অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্নিগ্ধপ্রভাতের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল বুকের ভেতরের প্রবল চাপটা শূন্য হয়ে গেল। মুখ সামান্য নীচু করে ও বলল, সুপর্ণলতিকা–আমার ওয়াইফ।
ও অবাক হয়ে খেয়াল করল, এতক্ষণে এই প্রথম ওর সুপর্ণলতিকার কথা মনে পড়ল। বাড়ি ফেরার জন্য ওর এতটুকুও মন টানল না।
আপনার বউয়ের কথা বলুন। সুপর্ণলতিকা নামটা কিন্তু দারুণ! অঙ্গলাবণিকে খুশি-খুশি দেখাল।
হ্যাঁ, দারুণ নাম–তবে অঙ্গলাবণির কাছে কিছু নয়।
ওঁর কথা বলুন। কেমন মানুষ আপনার ওয়াইফ?
ভালো। কিছুক্ষণ চুপচাপ খেতে লাগল স্নিগ্ধপ্রভাত। তারপর অনেকটা বোধহয় শোভনসুন্দরের মতো।
অঙ্গলাবণি মুখ নামাল।
আপনাকে আর-একটুকরো মাছ দিই…।
দিন।
স্নিগ্ধপ্রভাতের কেমন অদ্ভুত লাগছিল। ঘরে ফেরার কোনও তাড়া নেই। ফিরতে ইচ্ছেও করছে না। বরং মনে-মনে ও একটা অ্যাডভেঞ্চার চাইছে। আর নিজেকে বেশ স্বাধীন মনে হচ্ছে।
আচ্ছা, সুপর্ণলতিকাকে কেমন দেখতে? কাল বিকেলে ও কী যেন বলেছিল? দুটো ফ্লোট্যাক্সির অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে…কোন স্পেস কো-অর্ডিনেটে যেন…?
নাঃ, ভালো করে কিছু মনে পড়ছে না।
মাথার ভেতরে টিপটিপ করে যন্ত্রণার একটা ধারা অবিরাম বয়ে চলেছিল। মাঝে-মাঝে অস্থির হয়ে ব্যথাটা জানান দিচ্ছিল।
.
একদিন দু-দিন করে তিনটে দিন পেরিয়ে গেল। শুয়ে-বসে অলস গল্প করে ওদের সময় কাটতে লাগল।
তিনদিনে স্নিগ্ধপ্রভাত পুরোপুরি সেরে উঠেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর এখানে থেকে যেতে মন চাইছিল। অথচ লজ্জায় সংকোচে অঙ্গলাবণিকে সেকথাও বলতে পারছিল না।
চারদিনের দিন অঙ্গলাবণি ওকে বলল, আপনি এখন ভালোই আছেন। আজ থেকে আমার অফিস যাওয়া শুরু। আপনি এই ফ্ল্যাটের পাহারায় রইলেন। কী, কোনও আপত্তি নেই তো!
না, আপত্তি নেই। তবে একা-একা থাকতে বোর লাগবে।
সেকী? শোভনসুন্দর তো উলটো কথা বলেছিল আমাকে। আমার সঙ্গে দোকা থাকতে থাকতে ও বোর হয়ে গিয়েছিল। হাসল অঙ্গলাবণি।
আমি আমার কথা জানি–অন্যেরটা জানি না। তাই আমারটাই বললাম। নাকি আপনি বোর হয়ে যাচ্ছেন?
না, না ।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজগোজ শেষ করছিল অঙ্গলাবণি। আয়নার মধ্যে দিয়ে স্নিগ্ধপ্রভাতের দিকে তাকিয়ে বলল, জানেন, আমার অফিস-বসটা একটা রোবট। কাজ ছাড়া আর কোনও নেশা নেই। এমনকী আমার দিকে মুখ তুলে একপলক তাকায় না। মানে, যখন তাকায় তখন শুধু কাজের কথাই বলে।
আমি কিন্তু সেরকম না। বরং বেশ দুর্বল মানুষ।
অঙ্গলাবণি আয়নায় হাসল।
আয়নাটা অ্যান্টিক। সুন্দর কারুকাজ করা।
সেদিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধপ্রভাত বলল, দারুণ!
সাজতে-সাজতে ভুরু তুলল অঙ্গলাবণি : আয়নাটা?
–আয়নার ছায়াটা। আপনার ইমেজটা।
এটা কিন্তু ভারচুয়াল ইমেজ। একে আঙুলে ছোঁয়া যায় না। হাসল ঠোঁটের কোণে।
ভারচুয়াল ইমেজ থেকেই একদিন রিয়েল ইমেজে পৌঁছে যাব। তারপর সেখান থেকে অবজেক্টে। তখন ছুঁতে কোনও অসুবিধে হবে না।
ভারচুয়াল রিয়েলিটি কিন্তু সত্যি নয়।
সত্যি না হোক সত্যির কাছাকাছি তো বটে! তাতেই আমার সাধ মিটবে।
