স্নিগ্ধপ্রভাতের নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হচ্ছিল। সুপর্ণলতিকার টান ও টের পায়। অথচ সেই টানের উত্তর দেওয়ার মতো ক্ষমতা ওর নেই।
জামাকাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল স্নিগ্ধপ্রভাত। ভাবতে চেষ্টা করল, ঠিক কবে থেকে ওরা ফ্ল্যাটে বদলে যেতে শুরু করেছে।
চোখ বুজে ডানহাত এলিয়ে দিল চোখের ওপরে।
ইশ, কোনও ম্যাজিশিয়ান যদি পারত ওর ফুরিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দিতে!
.
মাথার ভেতরে কেমন যেন দপদপ করছিল। কেউ যেন সেখানে পুঁচকে একটা হাতুড়ি নিয়ে ঠুকঠুক করে পেরেক ঠুকছিল। স্নিগ্ধপ্রভাতের মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু কোথা থেকে যেন গোলাপের গন্ধ ওর নাকে এসে ঢুকছিল–এবং ওর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছিল।
দুটো ইচ্ছের লড়াই চলতে-চলতে ওর ঘুম ভেঙে গেল।
সম্পূর্ণ অচেনা একটা ঘরে অচেনা একটা বিছানায় জেগে উঠল স্নিগ্ধপ্রভাত।
অবাক চোখে ধড়মড়িয়ে উঠে বসতেই রক্তের মতো টুকটুকে লাল একগুচ্ছ গোলাপ ওর নজরে পড়ল। বিছানার পাশেই স্বচ্ছ টেবিলের ওপরে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ ফুলদানি। বোধহয় অ্যাক্রিলিকের তৈরি। ফুলদানির ওপরটা গোলাপের পাপড়িতে ঢাকা।
ওঃ..আপনার ঘুম ভেঙেছে!
গোলাপের দিক থেকে চোখ তুলল স্নিগ্ধপ্রভাত। চোখ পড়ল আর-এক গোলাপের দিকে।
সুন্দর লম্বাটে মুখ। ফরসা কপালে উজ্জ্বল টিপ। পরনে হালকা গোলাপি শাড়ি। পাতলা ঠোঁটে একচিলতে দুষ্টুমির হাসি। সেইসঙ্গে আবছা পারফিউমের ঘ্রাণ যেন টের পেল স্নিগ্ধপ্রভাত।
আমি কোথায়? প্রশ্নটা ওর নিজের কানেই কেমন বোকা-বোকা শোনাল।
কোথায় আবার! আমার ফ্ল্যাটে! কী সহজ স্বাভাবিক উত্তর দিল তরুণী!
আপনি কে?
খিলখিল করে হেসে উঠল। স্নিগ্ধপ্রভাতের শরীরের ভেতর দিয়ে ঝরনা বয়ে গেল।
আমার নাম অঙ্গলাবণি।
নামটা ঝংকার তুলল কানে। অনেক প্রশ্ন ভিড় করে এল ঠোঁটে। উচ্চারণ না করে স্নিগ্ধপ্রভাত সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লাগল অঙ্গলাবণির মুখে।
এখানে ও কেমন করে এল!
জটপাকানো স্মৃতি হাতড়ে এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করল।
ঝাপসাভাবে যেটুকু ও মনে করতে পারল সেটা হল, কাল রাতে ও ফানল্যান্ডে ছিল। ছোট ছোট চুমুকে হুইস্কি খাচ্ছিল আর হলোগ্রাফিক ক্যাবারে দেখছিল। একটি রোগা মেয়ে সাপের মতো শরীরটা খেলিয়ে সিলিকোন-যৌবনের নগ্ন হাতছানি দিয়ে নাচছিল।
স্নিগ্ধপ্রভাত যখন পুরো বুঁদ হয়ে গেছে ঠিক তখনই একজন অচেনা লোক ওকে ডেকে নিয়ে গেছে ক্যাসিনোর বাইরে। বলেছে, কে একজন যেন একটা ইমার্জেন্সি খবর এনেছে মিগ্ধপ্রভাতের জন্য।
বাইরে বেরিয়ে একটা আলো-আঁধারি জায়গায় ওকে ডেকে নিয়ে গিয়ে লোকটা হঠাৎই স্নিগ্ধপ্রভাতের নাক লক্ষ্য করে ফুঁ দিয়েছে।
সঙ্গে-সঙ্গে একটা তীব্র কটু গন্ধ স্নিগ্ধপ্রভাতের নাকে ঢুকে গিয়েছিল। তারপর ওর আর কিছু মনে নেই।
আমি এখানে কেমন করে এলাম? অনেকক্ষণ পর ভেতরের প্রশ্নটা বাইরে বেরিয়ে এল।
রাস্তায় আপনি সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলেন। আমি তুলে নিয়ে এসেছি। আপনার পকেটের জিনিসপত্র সব ওই টেবিলটার ড্রয়ারে আছে।
আঙুল তুলে একটা টেবিলের দিকে দেখাল অঙ্গলাবণি। তার পাশেই একটা ভোলা জানলা। তার কাচের শার্সিতে ভোরের রোদ। আর জানলার বাইরে কঁকড়া গাছে দুটো বুলবুলি। অকারণেই ডাকছে।
বুলবুলি দুটোকে কেমন যেন চেনা মনে হল।
কোথায় পড়ে ছিলাম আমি?
চার নম্বর সুপারওয়ের ওপরে।ফানল্যান্ড সাইবার ক্যাসিনোর পাশের একটা অন্ধকার জায়গায়…।
একটু সময় নিল স্নিগ্ধপ্রভাত। তারপর আলতো গলায় কাল রাতের ব্যাপারটা যেটুকু মনে ছিল বলল।
আপনি খুব জোর বেঁচে গেছেন। এই কায়দায় লুঠপাট করাটা এখন ভীষণ বেড়ে গেছে।
আপনার জন্যেই বেঁচে গেছি..। কৃতজ্ঞতার সুরে বলল স্নিগ্ধপ্রভাত।
হাসল অঙ্গলাবণি। কিছু বলল না। আয়ত চোখ মেলে স্নিগ্ধপ্রভাতকে দেখতে লাগল।
আপনি ছাড়া এ-ফ্ল্যাটে আর কে-কে থাকে?
আবার হাসল : কেউ না। আমি একা। তারপর কপাল থেকে চুল সরিয়ে বলল, চলুন, হাত-মুখ ধোবেন চলুন–
অঙ্গলাবণির কথাবার্তায় কেমন যেন অধিকারের ভাব। কিন্তু স্নিগ্ধপ্রভাতের ভালো লাগল। ওর ভেতরে-ভেতরে বোধহয় বহুদিনের একটা আর্তি ছিল যে, কেউ ওকে অধিকার করুক। বাইরে থেকে নয়–ভেতর থেকে।
স্নিগ্ধপ্রভাত অঙ্গলাবণির মুখের রেখাগুলো পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
অচেনা এক পুরুষকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসার ব্যাপারে কোনও দ্বিধা বা সংশয়ের ছাপ নেই। বরং কোথায় যেন একটা কৌতুক ও কৌতূহল কাজ করছে।
হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে বসল মিগ্ধপ্রভাত। অঙ্গলাবণির দেওয়া কফির কাপে চুমুক দিয়ে হেসে বলল, আপনি খুব পরোপকারী…।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল অঙ্গলাবণি : আপনি যেরকম ভাবছেন সেরকম নয়। নেহাত চাকরি ছাড়া আর কোনও কাজ নেই, তাই…। এই যেমন আপনার জন্যে কদিন অফিস ছুটি নিয়েছি…।
নতুন এক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে দিনটা কাটতে লাগল। কোনও কাজ নেই–শুধু বিশ্রাম আর আরাম। সেইসঙ্গে অঙ্গলাবণির মধুর শাসন, দু-একটা এলোমেলো কথা। স্নিগ্ধপ্রভাতের বেশ লাগছিল।
ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে ওদের কথা হচ্ছিল।
কাচের জানলায় রোদ এখন চড়া হয়েছে। আকাশ সকালের নীল থেকে চোখ-ধাঁধানো সাদাটে হয়ে গেছে।
মিউজিক সিস্টেমে হালকা সুর বাজছিল। তাতে কেমন একটা মিষ্টি আমেজ তৈরি হয়ে যাচ্ছিল।
