এত অল্পেতেই আপনি খুশি?
হ্যাঁ। ঘাড় কাত করে বলল মিগ্ধপ্রভাত, আসলে চেয়েছিলামই তো অল্প! তাই অল্প পেলেই খুশি। কিন্তু পেলাম কই!
দাঁড়ান, অফিস থেকে ফিরে এসে আপনার এই ফিলিংটা অ্যানালিসিস করতে হবে।
ঠিক তখনই কথা-বলা-টেলিফোন মিষ্টি ধাতব গলায় বলে উঠল, ফোন এসেছে–ফোন ধরো।
অঙ্গলাবণি ধরছি বলতেই ঘরের দেওয়ালের একটা অংশ টিভির পরদা হয়ে গেল। সেখানে ফুটে উঠল একজন প্রৌঢ়ের রঙিন মুখ।
চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা। গালে ধপধপে সাদা চাপদাড়ি। মাথায় ব্যাকব্রাশ করা কাঁচাপাকা চুল। নাকের নীচে সাদা পুরু গোঁফ। তারই আড়ালে একচিলতে হাসি।
কেমন আছ, অঙ্গলাবণি?
এখনও পর্যন্ত ভালোই, ডক্টর–।
কোনও কমপ্লেন নেই?
না–একটুও না।
দ্যাখো, পেশেন্টকে আমি কিন্তু পুরোপুরি তোমার হাতে ছেড়ে দিয়েছি। হি ইজ অল ইয়োর। কোনও প্রবলেম হলে বলবে। আর কদিন যাক–তারপর তোমার বাড়িতে একদিন চা খেতে যাব।
ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম, ডক্টর।
ও.কে., সি ইউ দেন…।
পরদার ছবি মিলিয়ে গেল।
অঙ্গলাবণি বলল, টেলিফোন শেষ হয়েছে।
সঙ্গে-সঙ্গে পরদাটাও মিলিয়ে গেল। দেওয়ালটা আবার দেওয়ালের মতো হয়ে গেল। কথা বলা-টেলিফোন বলল, ধন্যবাদ।
এবার স্নিগ্ধপ্রভাতের দিকে ফিরে তাকাল অঙ্গলাবণি? উনি ডক্টর নীতিনপ্রকাশ। তোমার চিকিৎসা করছেন…।
স্নিগ্ধপ্রভাত হাসল ও ভুল বললে। আমি এখন তোমার চিকিৎসায় আছি।
অনেক পরে, অঙ্গলাবণি টা-টা করে অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর, স্নিগ্ধপ্রভাতের খেয়াল হল ওরা হঠাৎই আপনি থেকে তুমি-তে নেমে এসেছে। কিন্তু এরকম হঠাৎ নেমে এলেও ওরা কেউই কোনও হোঁচট খায়নি।
আচ্ছা, এটা কি নামা, না ওঠা?
অঙ্গলাবণি চলে যাওয়ার পর স্নিগ্ধপ্রভাতের মনখারাপ লাগছিল। এত বড় শৌখিন ফ্ল্যাটে ভীষণ একা-একা লাগছিল।
সুপর্ণলতিকাকে একটা ফোন করলে কেমন হয়! কী করছে ও এখন?
সুতরাং ডাইনিং হলে টেলিফোনের কাছে গিয়ে ও বলল, একটা ফোন করব।
বলামাত্রই টেলিফোন জবাব দিল, কত নাম্বার বলো…।
নম্বরটা ঠিকমতো মনে পড়ছিল না। কেমন যেন ঝাপসা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। মিগ্ধপ্রভাতের মাথা টিপটিপ করছিল।
শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে একটা নম্বর বলল স্নিগ্ধপ্রভাত।
নম্বরটা বলা শেষ হতে-না-হতেই ও-প্রান্তে রিং বাজতে শুরু করল।
রিং হয়েই চলল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করা সত্ত্বেও কেউ ফোন ধরল না। নিশ্চয়ই সুপর্ণলতিকা বাড়িতে নেই কোথাও বেরিয়েছে। অথবা নম্বরটাই ভুলভাল হয়েছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্নিগ্ধপ্রভাত বলল, লাইন ছেড়ে দাও।
কথা-বলা-টেলিফোন লাইন কেটে দিয়ে বলল, ধন্যবাদ।
*
দু-সপ্তাহের মধ্যেই অঙ্গলাবণি স্নিগ্ধপ্রভাতের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। ও চোখের আড়াল হলেই স্নিগ্ধপ্রভাতের অন্তরে অসহায় পিপাসা জেগে ওঠে। এক অদ্ভুত টান ওকে অঙ্গলাবণির পরাধীন করে তোলে। সে-কথা একদিন, এক দুর্বল মুহূর্তে অঙ্গলাবণিকে বলেও ফ্যালে।
ইলেকট্রনিক অরগ্যানের মতো মিষ্টি শব্দের ঢেউ খেলিয়ে হেসে ওঠে অঙ্গলাবণি। তারপর বলে, এ কী ছেলেমানুষি! ডক্টর নীতিনপ্রকাশকে তোমার এই ইলিউশানের কথা বলতে হবে।
ইলিউশান! মায়া! তোমাকে মনে-মনে চাওয়াটা স্রেফ মায়া! সত্যি নয়?
কী জানি! ডক্টর হয়তো তা-ই বলবেন।
এই যে তোমাকে ছুঁতে না পেলে আমার মন কষ্ট পাচ্ছে–এটাও মায়া?
হতেও তো পারে।
আচমকা স্নিগ্ধপ্রভাত অঙ্গলাবণির দিকে ঝুঁকে পড়ল। আকুলভাবে জড়িয়ে ধরল ওকে। এবং ঠোঁটে চুমু খেল।
এক আশ্চর্য উত্তাপ এক শরীর থেকে অন্য শরীরে বয়ে গেল। উত্তাপ না হয়ে সেটা বিদ্যুৎ তরঙ্গও হতে পারে।
দুটো শরীর গলতে শুরু করল। কেউই আর নিজের আয়ত্বে ছিল না। মন যা-যা চাইছিল শরীর তা-ই করতে শুরু করল।
এতদিন ধরে যে-সংযম দুজনে মেনে চলছিল একটি মুহূর্তে সেটা মিথ্যে হয়ে গেল।
একসময়, খানিকটা শান্ত হওয়ার পর, স্নিগ্ধপ্রভাত বলে ফেলল, তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।
সুপর্ণলতিকা?
অসম্ভব।
হাসল অঙ্গলাবণি। বলল, আমার অবস্থাটাও একইরকম। এখন বুঝলাম তোমার মধ্যে কতরকম অস্থির পাগলামি লুকিয়ে আছে। শোভনসুন্দর কখনও আমাকে এরকম পাগলের মতো আদর করেনি।
স্নিগ্ধপ্রভাতের কাছ থেকে সরে এল অঙ্গলাবণি। বলল, ডক্টর নীতিনপ্রকাশকে একটা ফোন করি।
সেকথা শুনতে পেয়ে কথা-বলা-টেলিফোন বলে উঠল, নাম্বার বলো–।
নম্বর বলল অঙ্গলাবণি। এবং ও-প্রান্তে ফোন বাজতে শুরু করল।
ডক্টর ফোন ধরতেই ঘরের দেওয়ালের একটা অংশ টিভির পরদা হয়ে গেল। সেখানে ডক্টর নীতিনপ্রকাশকে দেখা গেল।
হাউ আর য়ু, মাই লেডি?
ফাইন। আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আপনাকে এখুনি একবার আমার ফ্ল্যাটে আসতে হবে।
কেন, কী হয়েছে?
খুব সিরিয়াস ব্যাপার। আপনি এলে পর বলব।
নীতিনপ্রকাশ হাসলেন কী, আমার এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হয়েছে?
জানি না। আপনি এলে সব বলব।
টেলিফোন শেষ হয়েছে বলে ফোন ছেড়ে দিল অঙ্গলাবণি। টেলিফোন ওকে যথারীতি ধন্যবাদ জানাল।
টেলিফোনের কথাবার্তা শুনে স্নিগ্ধপ্রভাত একটু অবাক হয়েছিল।
ওর যেন মনে হচ্ছিল, ডক্টর নীতিনপ্রকাশ আর অঙ্গলাবণির মধ্যে কী এক গোপন খেলা চলছে। আর সে-খেলাটা ওকে নিয়েই।
তা হলে কি নীতিনপ্রকাশই শোভনসুন্দর? আড়ালে থেকে পরকীয়া সহবাসের ওপরে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছেন? যদি তাই হয়, তা হলে মানতেই হবে, এ বড় নিষ্ঠুর পরীক্ষা।
