শেষদিকটায় স্বর্ণদ্যুতির গলা আবেগে ধরে গিয়েছিল। তারপর আচমকা ও হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল স্নিগ্ধপ্রভাতের পায়ের কাছে। ওর কোলে মাথা রেখে কান্না-জড়ানো গলায় বলতে লাগল, সব ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে রে, সব ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে…।
শেষদিকে ওর কথা জড়িয়ে গেল। স্নিগ্ধপ্রভাতকে আঁকড়ে ধরে ও বাচ্চা ছেলের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। ওকে কী বিপন্ন, কী অসহায় লাগছিল!
তারপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে।
ফুটপাথ ফানল্যান্ডের কাছে এসে পড়তেই নেমে পড়ল স্নিগ্ধপ্রভাত। কাচের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিজের সিটিজেন কোড বলার সঙ্গে-সঙ্গে দরজা খুলে গেল।
ফানল্যান্ডের ভেতরটা খুব ঠান্ডা আর চুপচাপ। শুধু হালকা মিউজিকের শব্দতরঙ্গ কোমলভাবে খেলে বেড়াচ্ছে।
সেন্টার স্টেজে হলোগ্রাম-স্ট্রিপটিজ চলছিল। দুটো মেয়ে অথবা মেয়ের ছায়া শরীর বেঁকিয়েচুরিয়ে এমনভাবে নাচছিল যেন ওরা রবারের তৈরি।
হলোগ্রাম-স্ট্রিপটিজের সুবিধে হচ্ছে উত্তেজিত দর্শক হামলে পড়ে নাচিয়েদের বিরক্ত করতে পারে না। ফলে হইচই গোলমালের কোনও ভয় নেই।
একটা টেবিলে বসে হুইস্কির অর্ডার দিল স্নিগ্ধপ্রভাত। আর তাতে প্রথম চুমুক দিতেই সুপর্ণলতিকার কথা মনে পড়ল।
সঙ্গে-সঙ্গে মুখটা কেমন বিস্বাদ ঠেকল।
স্বর্ণদ্যুতির সঙ্গে সুপর্ণলতিকার কোথায় যেন একটা যোগসূত্র রয়েছে।
গ্লাসে আবার চুমুক দিল স্নিগ্ধপ্রভাত।
ও যখন সুপর্ণলতিকাকে বিয়ে করে তখন স্বর্ণদ্যুতির সঙ্গে ওর কোনও যোগাযোগ ছিল না। মোটামুটি চুপচাপই বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। শহরের সেন্ট্রাল ডেটা ব্যাঙ্কে যখন ওদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশানটা স্টোর হয় তখনই একটা নিয়ম ওদের বেঁধে ফ্যালে : অন্তত আট বছরের জন্যে ওদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকতে হবে।
গত শতকে আকছার ডিভোর্সের ব্যাপারটা এত মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, সরকার নতুন ম্যারেজ অ্যাক্ট চালু করতে বাধ্য হয়। সেসময়ে গড়ে এক-একজন নাগরিকের বিয়ের সংখ্যা ৩.৪ এ পৌঁছে গিয়েছিল। এত ডিভোর্স আর বিয়ের রেকর্ড রাখতে গিয়ে সরকারি দপ্তরের কাজের পরিমাণ যেমন বেড়েছিল, তেমনই বেড়েছিল হরেকরকম মামলা-মোকদ্দমা। এ ছাড়া সেন্ট্রাল ডেটা ব্যাঙ্কের মেমোরিও লাগছিল প্রচুর।
সুপর্ণলতিকাকে বিয়ে করার সময় আট বছরের নিয়মটা আটশো বছরের হলেও স্নিগ্ধপ্রভাতের কোনওরকম আপত্তি ছিল না। তীব্র ভালোবেসে ও সুপর্ণলতিকাকে বিয়ে করেছিল। ওকে ভালোবেসে স্নিগ্ধপ্রভাত বুঝতে পেরেছিল, এই ভয়ংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগেও ভালোবাসার ব্যাপারটা একইরকম রয়ে গেছে। এই প্রবল টানকে বিজ্ঞান এখনও ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
কিন্তু তার পরের ঘটনাগুলোকেও স্নিগ্ধপ্রভাত ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারেনি। বিয়ের দু-আড়াই বছর উদ্দাম মাতামাতির পর সবকিছু কেমন ধীরে-ধীরে বদলে গেল। বিকেল থেকে আকাশের রং পালটে ধীরে-ধীরে যেমন গোধূলি এবং সন্ধে হয়, ব্যাপারটা অনেকটা যেন সেইরকম।
তার পরের কয়েকটা বছরে একটা টাটকা ছটফটে মাছ ডিপ ফ্রিজের ভেতরে ঠান্ডা হিম হয়ে গেল। আর এখনও তাই।
কেন, কে জানে!
সুপর্ণলতিকা কি বড্ড বেশি কথা বলে? সবসময় কি ওর ঠোঁট নড়ে?
ঠোঁট। এই ঠোঁটের জন্য একদিন স্নিগ্ধপ্রভাতের ঠোঁট পাগল ছিল। কিন্তু দু-আড়াই বছরের মধ্যেই সে-পাগলামি স্তিমিত হয়ে গেছে। এখন ওর মনে হয় ধীরে-ধীরে ও আর সুপর্ণলতিকা দুটো ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে। রাতে সেই দুটো ফ্ল্যাট পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে থাকে। যেমন করে শুয়ে থাকত স্বর্ণদ্যুতি আর রত্নমঞ্জু।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্নিগ্ধপ্রভাত।
নিভে যাওয়া সম্পর্ককে কি আবার দপ করে জ্বেলে দিতে পারে বিজ্ঞান? বোধহয় না। বিজ্ঞানের আবিষ্কার শরীরে আগুন ধরাতে পারে–মনে নয়।
একজন হলোগ্রাম-স্ট্রিপার নাচতে নাচতে স্টেজ থেকে নেমে এসেছিল। মেয়েটা যেমন খুশি টেবিল-চেয়ার-মানুষকে ভেদ করে নাচের ভঙ্গিতে যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে লাগল। একজন বেসামাল খদ্দের ওকে জাপটে ধরতে গিয়ে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ল।
মেয়েটা যখন সিগ্ধপ্রভাতকে ভেদ করে চলে গেল তখন ও যেন সামান্য উষ্ণতার ছোঁয়া পেল। মনটা ক্ষণিকের জন্য চনমনে হয়ে উঠল।
আবার দীর্ঘশ্বাস পড়ল। মনে হল জীবন কত ক্লান্তিকর, কত দীর্ঘ।
রাতে বাড়ি ফেরার সময় স্নিগ্ধপ্রভাত ভাবতে চেষ্টা করছিল ফানল্যান্ডটাই যেন ওর বাড়ি। সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে ও সুপর্ণলতিকা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে যাচ্ছে। কিন্তু ভাবনাটা তেমন জমছিল না।
ফ্ল্যাটে ফিরে এসে ও সুপর্ণলতিকার মুখোমুখি হল।
সুপর্ণলতিকা কোনও কথা বলল না। ঠান্ডা চোখে স্বামীর দিকে একপলক তাকিয়ে পামটপ কম্পিউটারে সেলাইয়ের গ্রাফিক্স দেখতে লাগল।
স্নিগ্ধপ্রভাত স্ত্রীকে দেখছিল।
সেই একইরকম মনোরম সৌন্দর্য মাখানো মুখ। সময়ের কোনও ছাপ পড়েনি সেখানে। অথচ স্নিগ্ধপ্রভাত পলকের জন্যও কোনও টান অনুভব করল না।
ওর ভেতরে-ভেতরে কান্না পাচ্ছিল। রোজই এমন কান্না পায়।
একটা ঠান্ডা সম্পর্ককে আঁকড়ে ধরে জীবন কাটানো যায় না কিছুতেই। অথচ ও চেষ্টা করেও ভেতর থেকে কোনও উষ্ণতা খুঁজে পায় না। ওর ভালোবাসা নির্ঘাত মরে গেছে। আর সেই মৃত শিশুটিকে কোলে নিয়ে ও বোকার মতো বোতল থেকে দুধ খাওয়াতে চেষ্টা করছে।
