কাঠের বেঞ্চিটা ওঠা-নামা করাতে করাতে ব্রিজেশ হাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যখন থামলেন তখন প্রাণীটা একেবারে থেঁতলে গেছে। নেহাত ওটার রক্ত লাল নয়–নইলে দৃশ্যটা অনেক বীভৎস দেখাত। প্রাণীটার গোটা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেও চোখ দুটো অক্ষত ছিল। প্রাণীটার নীল চোখ দুটো কেমন শান্ত মায়াময় দেখাচ্ছিল।
মৃত প্রাণীটাকে ঘিরে জটলা বাড়ছিল। প্রাণীটার নাম কী, কোন জাতের, এইসব বিষয় নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছিল। ব্রিজেশ বেঞ্চিটা একপাশে নামিয়ে রেখে হাঁপাচ্ছিলেন। অনেকেই ব্রিজেশের শক্তি আর সাহসের তারিফ করছিলেন। বলছিলেন, ব্রিজেশ প্রাণীটাকে খতম না করলে সি-বিচে ভয়ংকর কাণ্ড ঘটে যেতে পারত। কেউ-কেউ গতকাল ভেসে ওঠা কচ্ছপটার কথা বলছিলেন।
সানিয়া ততক্ষণে ব্রিজেশকে দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু সমুদ্রের কিনারায় জটলাটা ঠিক কীসের সেটা বুঝতে পারছিলেন না। তাই উবিগ্ন হয়ে ব্রিজেশের নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন।
ব্রিজেশ সানিয়ার দিকে তাকালেন। সানিয়া বেশ খানিকটা দূরে, অনেকটা উঁচুতে, বালির ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্রিজেশ হাত তুলে ওঁকে আশ্বাস দিলেন। বোঝাতে চাইলেন যে, চিন্তার কিছু নেই, এখুনি তিনি স্ত্রীর কাছে ফিরে যাবেন।
কিন্তু ব্রিজেশের প্ল্যান ভেস্তে গেল একটা উটকো লোকের জন্য।
লোকটা ভিড় ঠেলে সরিয়ে, বলতে গেলে আচমকাই, ব্রিজেশের সামনে এসে উদয় হল।
লোকটার গায়ের রং বেশ কালো। লম্বাটে মুখ। ঢ্যাঙা চেহারা। গায়ে পুলিশের খাকি উর্দি। মাথায় ক্রিকেটারদের কালো ক্যাপ। হাতে তামাটে রঙের ব্যাটন।
হয়তো ওর পুলিশের পোশাক আর হাতের লাঠি দেখেই জটলা পাকানো জনতার ভিড় বেশ কিছুটা পাতলা হয়ে গেল।
লোকটা পান চিবাচ্ছিল। প্রাণীটার ডেডবডির খুব কাছে এসে ও মুখ ছুঁচলো করে পুচ করে ভিজে বালিতে পানের পিক ফেলল। তারপর লাঠিটা আলতো করে বাঁ-হাতের তালুতে ঠুকতে ঠুকতে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলোর ওপরে চোখ বুলিয়ে নিল।
লাঠিটা মরা প্রাণীটার দিকে তাক করে পুলিশটি বাতাসে রুক্ষ প্রশ্ন ভাসিয়ে দিলঃ এটাকে কে মারল রে?
জনতার গুঞ্জন শুরু হল। দু-একজন একটু ইতস্তত করে ব্রিজেশের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন।
ব্রিজেশও প্রায় একইসঙ্গে নিজের বুকে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে বললেন, আমি–আমি মেরেছি…।
লোকটা ব্রিজেশের দিকে দু-পা এগিয়ে এল। লাঠি উঁচিয়ে বেশ উদ্ধতভাবে জানতে চাইল, কেন? মারলেন কেন?
এ-এমনি…।
এমনি মানে? ব্যঙ্গের হাসি হাসল পুলিশ ও সমুদ্রের মাছ-মছলি-বকচ্ছপ কি আপনার বাপের সম্পত্তি যে, এমনি-এমনি মেরে ফেললেই হল?
ব্রিজেশ একটা ধাক্কা খেলেন। লোকটা কী অভদ্রের মতো কথা বলছে! একটা পেটি কনস্টেবলের এত সাহস আর আস্পর্ধা! ব্রিজেশ দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে এভাবে কথা বলছে! এখুনি দুটো ফোন লাগাবেন নাকি? কী করে এইসব চাকরবাকর মার্কা পুলিশের প্যান্ট খুলে নিতে হয় সেটা ব্রিজেশ ভালোই জানেন।
কী হল? কেন মারলেন, বলুন? লোকটা পান চিবোতে চিবোতে জিগ্যেস করল।
না, মানে…অ্যানিম্যালটা খুব ডেঞ্জারাস ছিল…।
কী করে বুঝলেন ডেঞ্জারাস?
এইরকম একরোখা প্রশ্নের তোড়ের মুখে পড়ে ব্রিজেশ কেমন যেন থতোমতো খেয়ে গিয়েছিলেন। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বললেন, মানে…ওটার চোখ দুটো কী বড়-বড়…।
হ্যাঁঃ, বড়-বড়! তাচ্ছিল্যের শব্দ করে মুখ বেঁকাল লোকটা : আপনার চোখগুলোও তো খুব বড়-বড়। তো তাই বলে আপনাকে আমি কি লাঠিপেটা করে মেরে ফেলব? বড়-বড় চোখ দেখলে কি আপনার অ্যালার্জি হয়, না পেটখারাপ হয়?
ব্রিজেশের প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। এই পুলিশ কনস্টেটাকে এবার থামানো দরকার। পাবলিকের সামনে এভাবে ব্রিজেশকে হেনস্থা করছে!
ব্রিজেশ সানিয়ার দিকে তাকালেন। সানিয়া এখন উদবিগ্ন মুখে ব্রিজেশের দিকে তাকিয়ে আছেন। ব্রিজেশ ইশারায় ওঁকে কাছে ডাকলেন। ওঁর ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটা নেওয়া দরকার। প্রথম ফোনটা ব্রিজেশ করবেন লালবাজারে, ডেপুটি কমিশনারকে। তারপর দ্বিতীয় ফোনটা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিল্পমন্ত্রীকে। গত একবছর ধরে কোম্পানির মেগা-এক্সপ্যানশনের ব্যাপারে ওঁর সঙ্গে অনেকবার আলোচনায় বসেছেন ব্রিজেশ। ভদ্রলোক বেশ সেনসি আর পজিটিভ৷
ব্রিজেশ হঠাৎই খেয়াল করলেন, ওঁদের ঘিরে থাকা ভিড়টা বেশ হালকা হয়ে গেছে। আর এখন যারা মরা প্রাণীটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে তারা নেহাতই বালক-বালিকা গোছের।
পুলিশটার শেষ মন্তব্যের কোনও জবাব দেননি ব্রিজেশ। কী-ই বা জবাব দেবেন। তিনি সানিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মোবাইল ফোনটা ক্রমশ ওঁর হাতের নাগালে আসছিল।
পুলিশ লোকটা বাতাসে লাঠি নেড়ে ভিড় ফাঁকা করতে লাগল। তারপর ব্রিজেশের নামিয়ে রাখা কাঠের বেঞ্চির আশপাশ থেকে পাবলিক হটাতে লাগল। বেঞ্চিটা দেখিয়ে ব্রিজেশকে লক্ষ্য করে বলল, এটা মাডার ওয়েপন। এভিডেন্স ডিসটার্ব করা ঠিক না।
মার্ডার ওয়েপন! একটা সামুদ্রিক প্রাণীকে মেরেছেন বলে সেটাকে এই অসভ্য লোকটা মার্ডার বানিয়ে ফেলল।
অসভ্য লোকটা ততক্ষণে পকেট থেকে নোটবই আর পেন বের করে ফেলেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে পানের পিক ফেলে ব্রিজেশকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন শুরু করল।
নিন, এবার আপনার নাম-ঠিকানা বলুন।
ব্রিজেশ দু-এক লহমা ইতস্তত করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর শান্ত গলায় নিজের নাম-ঠিকানা বললেন।
