কাল ভোরে কচ্ছপটাকে ঘিরে রীতিমতো ভিড় জমে গিয়েছিল। কেউ-কেউ মোবাইলে ওটার ছবিও তুলছিল।
ব্রিজেশ জলের কিনারায় নেমে এলেন। পা ভেজালেন নোনা জলে। একপলকের জন্য মনে। হল সমুদ্র ওঁর পা ধুয়ে দিচ্ছে। অফিসের ওই একশো বারোজনও কম-বেশি এই কাজটা করে থাকে। আর আশ্চর্য, ব্রিজেশ সেটা এনজয় করেন। যেমন এখন সমুদ্রের পা ধোয়ানোটা বেশ এনজয় করছেন।
সানিয়া স্বামীকে কিছুক্ষণ লক্ষ করছিলেন। কিন্তু ব্যাগের ভেতরে রাখা মোবাইল ফোন বেজে ওঠায় মনোযোগ সরে গেল। ছোট হাতব্যাগের মুখ খুলে ভেতরে উঁকি মারলেন। না, ব্রিজেশের ফোন নয়, সানিয়ার ফোনটাই বাজছে।
ফোন ধরলেন। অপরূপার ফোন। লস এঞ্জেলিস থেকে।
ব্রিজেশ আর সানিয়ার একমাত্র মেয়ে। দু-বছর আগে বিয়ে হয়েছে। তারপর থেকেই স্টেটসে। যোগাযোগ বলতে দিনে দু-তিনটে ফোন। ব্যস।
একটা লম্বা শ্বাস ফেলে হ্যালো বললেন সানিয়া। চোখের কোণ দিয়ে ব্রিজেশকে একবার দেখলেন। জলের ওপরে আয়েশি পা ফেলছেন। তারপর অপরূপার সঙ্গে কথায় ডুবে গেলেন।
সমুদ্রের হাওয়া ব্রিজেশের ভালো লাগছিল। দেখছিলেন, হাওয়ার দাপটে দুটো পায়রা অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিরবেগে বাতাসে ভেসে চলেছে। ব্রিজেশও এখন ওদের মতো অলসভাবে প্রকৃতির হাত ধরে ভেসে চলেছেন। করপোরেট জীবনের কোনও বাঁধন নেই, শাসন নেই। ওই সূর্যের মতো তিনি স্বাধীন। কিংবা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
ঠিক তখনই একটা জিনিস ব্রিজেশের চোখে পড়ল।
একটা প্রকাণ্ড মাপের জিনিস–একটা বস্তা কিংবা সেই জাতীয় কিছু সমুদ্রের জলে ভেসে আসছে।
ব্রিজেশের কাছ থেকে পনেরো-বিশ ফুট দূরে ভাসছে–অথবা, সাঁতার কেটে আসছে– জিনিসটা।
আবার একটা উন্ডেড কচ্ছপ নাকি?
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জিনিসটা ব্রিজেশের খুব কাছে এসে গেল। সমুদ্রের জল ওটাকে প্রায় ব্রিজেশের পায়ের কাছে জমা দিয়ে চলে গেল। আর বস্তুটা হামাগুড়ি দিয়ে বালির ওপরে অনেকটা উঠে এল।
অন্য কেউ হলে অবশ্যই চিৎকার-চেঁচামেচি করে একলাফে ছিটকে সরে যেত, কিন্তু ব্রিজেশ অন্য ধাতুতে গড়া। এক পলকেই প্রাণীটাকে তিনি যা দেখার দেখে নিয়েছেন।
না, প্রাণীটা কচ্ছপ নয়। এমন অদ্ভুত প্রাণী বোধহয় কেউ কখনও দেখেনি।
প্রাণীটার চেহারা কচ্ছপ আর শঙ্কর মাছের মাঝামাঝি। মাপে নেমন্তন্ন-বাড়ির নৌকোর মতো। মেটে রঙের শরীরে পায়রা-চঁদা মাছের মতো কালো চাকা-চাকা দাগ। শরীরটা মসৃণ নয়– এবড়োখেবড়ো। যেন খাবলা-খাবলা মাটি চাপিয়ে তৈরি। আর গায়ের চামড়াটা ব্যাঙের মতো খসখসে–তার ওপরে ডুমো-ডুমো আঁচিল।
প্রাণীটার পিছনদিকে অক্টোপাসের শুড়ের মতো গোটা চারেক লেজপাখনার মতো ছড়িয়ে আছে। চারটে শক্তপোক্ত পা। পায়ের আঙুলগুলো হাঁসের পায়ের পাতার মতো চামড়া দিয়ে জোড়া। আঙুলের ডগায় মোটা বাঁকানো নখ।
সবচেয়ে বীভৎস হল প্রাণীটার চোখ। অন্তত ব্রিজেশের তাই মনে হল।
চোখ তো নয়, যেন নীল রঙের দুটো টেনিস বল–তাও আবার শরীরের বাইরে উঁচু হয়ে আছে! এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে–যেন কাউকে খুঁজছে।
প্রাণীটা নখ দিয়ে ভিজে বালির ওপরে খুব ধীরে-ধীরে আঁচড় কাটছিল। বোধহয় অচেনা পরিবেশে আচমকা হাজির হয়ে ঠিক কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না।
ব্রিজেশ আর দেরি করলেন না। উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকালেন। কাছেই একজন বৃদ্ধ লাঠি হাতে বালির ওপরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখের পলকে ব্রিজেশ ছুটে গেলেন তার কাছে।
এক্সকিউজ মি বলে এক ঝটকায় লাঠিটা প্রায় ছিনিয়ে নিলেন। তারপর ছুটে আবার প্রাণীটার কাছে চলে এলেন। কালী পুজোয় খাঁড়া উঁচিয়ে যেমন করে পাঁঠাবলি দেয় ঠিক সেইভাবে লাঠিটা শক্ত দু-হাতে তুলে ধরলেন মাথার ওপরে। এবং ভয়ংকর শক্তিতে প্রাণীটার মাথা তাক করে সেটা নামিয়ে আনলেন।
বেলুন ফাটার মতো শব্দ হল। একটি চি-চিঁ শব্দও বেরিয়ে এল প্রাণীটার মুখ থেকে। কিন্তু ব্রিজেশ বুঝলেন, লাঠির ঘায়ে প্রাণীটাকে সেরকম কাবু করা যায়নি।
চায়ের দোকানদারদের পেতে রাখা বেঞ্চিগুলোর দিকে চোখ গেল ব্রিজেশের। ওগুলো বেশ ভারী কাঠ দিয়ে তৈরি। সুতরাং লাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একটা খালি বেঞ্চির দিকে ছুটে গেলেন।
প্রাণীটা ঘিরে ততক্ষণে ভিড় জমতে শুরু করেছে। কিন্তু সব দর্শকই ভয়ংকর প্রাণীটার কাছ থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখেছে।
বেঞ্চি কাঁধে নিয়ে ব্রিজেশ চিৎকার করে ছুটে এলেন। ওঁর মারমুখী চেহারা দেখে সবাই চটপট সরে গিয়ে ওঁকে পথ করে দিল।
প্রাণীটা তখন ওর লম্বা লাল জিভ বের করে ভিজে বালির ওপরে বোলাচ্ছে। ওর চারটে লেজ ছটফট লাফাচ্ছে। নীল চোখ এলোমেলো ঘুরপাক খাচ্ছে।
দর্শকদের গুঞ্জন জোরালো হল। আর ব্রিজেশ কাঠের বেঞ্চিটাকে গদার মতো ব্যবহার করলেন। সমস্ত শক্তি দিয়ে ওটা বসিয়ে দিলেন প্রাণীটার দেহে।
ওটার পিঠের চামড়া ফেটে গেল। কালচে তরল ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল। প্রাণীটা ওর শরীর মোচড়াতে লাগল। চোখ উলটে পা ছুঁড়তে লাগল। চি-চিঁ শব্দটা আরও জোরালো হল।
ব্রিজেশ কিন্তু থামেননি। বেঞ্চিটাকে বারবার কাঁধে তুলে প্রাণীটাকে একের পর এক আঘাত করতে লাগলেন।
দর্শকদের একটা অংশ চেঁচিয়ে ব্রিজেশকে উৎসাহ জোগাতে লাগল। কেউ-কেউ ইশ! আহা! করতে লাগল।
হইচই আর ভিড় দেখে সানিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিলেন। অনেক মুখের ভিড়ে স্বামীর মুখটা খুঁজছিলেন, কিন্তু দেখতে পাচ্ছিলেন না।
