লাঠিটা বগলে চেপে ধরে লোকটা মনোযোগ দিয়ে সেটা নোট করে নিল।
পুরীতে নিশ্চয়ই বেড়াতে এসেছেন? লিখতে লিখতেই পরের প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল।
হ্যাঁ–।
সঙ্গে আর কে-কে আছে?
শুধু আমার ওয়াইফ আর কেউ না।
সানিয়া ব্রিজেশের কাছে এসে পড়েছিলেন। তাই উত্তরটা দেওয়ার সময় ব্রিজেশ হাতের ইশারায় সানিয়াকে দেখালেন।
চোখ সরু করে সানিয়াকে দেখল পুলিশটা। তারপর বাঁকা সুরে বলল, সত্যিকারের ওয়াইফ, নাকি বানানো-প্যাচানো?
তা-তার মানে! ব্রিজেশ উত্তেজনায় তোতলা হয়ে গেলেন : আ-আমাদের বয়েসটা দেখেছেন। এই বয়েসে কেউ।
হাত তুলে ব্রিজেশকে মাঝপথে থামিয়ে দিল লোকটা। বালিতে পানের পিক ছুঁড়ে দিয়ে বলল, সেক্সের কেসে বয়েসটা ফ্যাক্টর নয়। পুলিশের লাইনে আমরা এরকম সুজ্ঞা-সুড্ডির কেস ঢের দেখেছি। যাকগে, ওয়াইফের নাম বলুন…।
ব্রিজেশ বললেন। ওঁর মুখে রক্তের আভা। কানের ডগা লালচে। সানিয়ার অবস্থাও একইরকম। ওঃ, এই ছোটলোকটাকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না!
সানিয়ার কাছ থেকে নিজের মোবাইলটা চেয়ে নিলেন ব্রিজেশ। তারপর সবে ওটার বোতাম টিপতে শুরু করেছেন, কবজির ওপরে লাঠির আলতো টোকা পড়ল : কাকে ফোন করছেন? এখন ফোন-টোন করা যাবে না–সব বন্ধ।
তার মানে? রুক্ষ গলায় প্রতিক্রিয়া দেখালেন ব্রিজেশ, ফোন করা যাবে না মানে!
হাসল উদ্ধত ছোটলোক পুলিশ। পেনটা পকেটে রাখল। তারপর হাতের এক ছোবলে ব্রিজেশের মোবাইলটা কেড়ে নিল। অনায়াসে ছুঁড়ে দিল সমুদ্রে, অনেক দূরে।
ব্রিজেশ প্রথমটা হতবাক হয়ে গেলেও তারপর ফুঁসে উঠলেন। আঙুল তুলে শাসানোর ভঙ্গিতে কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই লোকটা লাঠি উঁচিয়ে খেঁকিয়ে উঠল, একদম গরম দেখাবেন না। মার্ডার করে আবার গরমবাজি! আবার বেচাল দেখলেই ডান্ডা মারতে মারতে থানায় নিয়ে যাব।
লোকটার রাগি মারমুখী ভাব ব্রিজেশকে থামিয়ে দিল। সানিয়া ভয়েভয়ে বললেন, প্লিজ, ওকে ছেড়ে দিন…।
লোকটা সানিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। দাঁতে পানের লাল ছোপ।
ম্যাডাম, আপনার হাজব্যান্ড একটু আগে সমুদ্রের এই প্রাণীটাকে মার্ডার করে ফেলেছেন– মরা প্রাণীটার দিকে লাঠির ইশারা করল লোকটা? তাই নিয়ে আপনার হাজব্যান্ডকে গোটকয়েক কোশ্চেন করতে চাইছিলাম কিন্তু তিনি তো গরম খেয়ে বসে আছেন। যার জন্যে আমার ইনভেস্টিগেশানের কাজটাই ঠেকে গেছে।
সানিয়া স্বামীর বাহুতে হাত রেখে নীচু গলায় কীসব বললেন।
ব্রিজেশ চুপচাপ কয়েকবার মাথা নাড়লেন। মনে হল সানিয়ার কথায় সায় দিলেন। তারপর পুলিশের লোকটাকে লক্ষ্য করে শান্ত গলায় বললেন, বলুন, কী জানতে চান।
লোকটা চারপাশে ভিড় জমানো মানুষজনকে আচমকা খেঁকিয়ে উঠল : কী চাই আপনাদের? যান, যান, নিজের নিজের কাজে যান। এখান থেকে ফুটুন। কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে লোকটা শূন্যে লাঠি নাচিয়েছিল।
ওর ধমকে ভালোই কাজ হল। তা সত্ত্বেও একটু ফাঁকা জায়গায় সরে দাঁড়াল লোকটা ব্রিজেশদেরও ইশারায় ডেকে নিল।
এবার ব্রিজেশের দিকে তাকাল পুলিশ ও একদম শুরু থেকে বলুন। অ্যানিম্যালটাকে প্রথম কখন দেখলেন? তখন ওটা কী করছিল?
ব্রিজেশ এতক্ষণ চুপচাপ থেকে নিজেকে ধাতস্থ করছিলেন। সানিয়ার দিকে একপলক তাকিয়ে প্রাণীটার সঙ্গে ওঁর দেখা হওয়ার ব্যাপারটা খুলে বললেন।
লোকটা চুপচাপ শুনতে লাগল। লাঠি বগলে রেখে ব্রিজেশের স্টেটমেন্ট টুকে নিল। তারপর নোটবই-পেন পকেটে রেখে হাতে হাত ঘষল।
অ্যানিম্যালটা কি আপনাকে অ্যাটাক করতে এসেছিল?
ব্রিজেশ ইতস্তত করে বললেন, না মনে হয়…না।
হুঁ– তা হলে ওটাকে আপনি মারতে গেলেন কেন?
ওটা ওরকম বড় বড় চোখে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মানে, না-নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। তাই…।
তাই অ্যাটাক করলেন?
ব্রিজেশ কেমন বিভ্রান্ত গলায় বললেন, হ্যাঁ। মানে, ওরকমই বলতে পারেন।
চুপচাপ পান চিবাতে লাগল পুলিশ। তারপর শব্দ করে পানের পিক ফেলে বলল, আচ্ছা, দেখুন–এমনও তো হতে পারে, আপনাকে দেখে ওই অ্যানিম্যালটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ওটা…।
বাধা দিয়ে ব্রিজেশ বললেন, ওটা দেখতে খুব বীভৎস…।
প্রাণীটার ডেডবডি লক্ষ্য করে তাকালেন ব্রিজেশ। ওটা ঘিরে এখনও লোকজনের ভিড়। সক্কালবেলা এরকম রোমাঞ্চকর দৃশ্য কে ছাড়ে! না, মানুষের পাঁচিল ভেদ করে প্রাণীটাকে দেখা যাচ্ছে না।
পুলিশটা মুচকি হেসে ব্রিজেশকে বলল, আমি যদি বলি, প্রাণীটা আপনার বীভৎস চেহারা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
ব্রিজেশ থতোমতো খেয়ে গেলেন। এ আবার কেমন কথা! ব্রিজেশকে দেখতে বীভৎস? আশ্চর্য!
আমাকে বীভৎস দেখতে?
হ্যাঁ হাসল পুলিশঃ ওই প্রাণীটার চোখে। আহা-হা, রাগ করবেন না–এরকম হতেও তো পারে! ফলে জানবেন, আপনার দেখার অ্যাঙ্গেলটাই সব নয়। অন্যদের আঙ্গেলটারও একটা দাম আছে।
সানিয়া ব্রিজেশের কাছ ঘেঁষে এসে স্বামীকে কানে-কানে কী যেন বললেন। ব্রিজেশ হাতের ইশারায় ওঁকে বোঝাতে চাইলেন, ঠিক আছে, দেখছি।
দু-একবার ঢোক গিলে ব্রিজেশ পুলিশটাকে বললেন, দেখুন, যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। এখন ব্যাপারটা কীভাবে মেটানো যায় বলুন।
ভুরু কপালে তুলল পুলিশ ও তার মানে? আমাকে কি আপনি ঘুষ খাওয়ানোর কথা ভাবছেন?
না, না–সে-কথা বলিনি…।
