পারমিতার দিকে না তাকিয়েই আলতো করে বললেন, ‘একটু বেরোচ্ছি। দুপুরে এক বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন…।’
পারমিতার দিকে না দেখলেও বুঝতে পারলেন বউমা কী নজরে গলগ্রহ অকর্মণ্য শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে আছে।
তিতলির ফ্ল্যাটে পৌঁছতে খুব একটা অসুবিধে হল না বিশ্বনাথের। কলিংবেল বাজাতেই দরজার ওপাশে পায়ের শব্দ পেলেন। ম্যাজিক আই-এ চোখ রাখার জন্য কয়েক সেকেন্ড সময় গেল বোধহয়। তারপর দরজা খুলে গেল, সামনে তিতলি।
‘আমার দেরি হয়নি তো, বাইশ?’ বিশ্বনাথ হেসে জিগ্যেস করলেন।
‘একটুও না। আসুন, ভেতরে আসুন—।’
ফ্ল্যাটের ভেতরে পা দিলেন বিশ্বনাথ। চারপাশটা দেখে মনে হল স্বর্গ। কিন্তু স্বর্গটা নরকের মতো লন্ডভন্ড, অগোছালো।
আসার সময় বিশ্বনাথ বাইশটা লাল গোলাপ দিয়ে একটা সুন্দর তোড়া তৈরি করিয়েছিলেন। সেটা তিতলির হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা নাও। বাইশকে বাইশটা গোলাপ দিয়ে অভিনন্দন।’
তিতলি তোড়াটা দু-হাত বাড়িয়ে নিল। লম্বা শ্বাস টেনে গন্ধ শুঁকল। বলল, ‘আঃ দারুণ। বেশিক্ষণ শুঁকলে নেশা হয়ে যেতে পারে।’
তিতলির সঙ্গে বসবার ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন বিশ্বনাথ। চারপাশে ভালো করে নজর বোলাতে লাগলেন।
ঘরের সর্বত্র বিস্তর খরচের ছাপ। সোফা সেট, চায়ের টেবিল, ক্যাবিনেট সবই স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি। তার সঙ্গে অতি আধুনিক ট্যাপেস্ট্রি।। ডিজিটাল প্লেট টিভি, সারাউন্ড থিয়েটার, ওয়ালস্ক্রিন টেলিফোন—কী নেই ঘরে! কিন্তু সব জিনিসই এলোমেলোভাবে রাখা। ওদের ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখার জন্য কেউ সময় দেয়নি। আর ধুলোও ছড়িয়ে আছে নানান জায়গায়।
বিশ্বনাথ লক্ষ করলেন, দেওয়ালে মাস্টারদের গোটাতিনেক ওরিজিন্যাল অয়েল পেইন্টিং। ঘরের এক কোণে ব্রোঞ্জের একটা মডেল। আর জানলায় রঙিন সুতোর বল দিয়ে তৈরি অদ্ভুত ধরনের ঝুলন্ত পরদা।
সারা ঘরে মোলায়েম একটা সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। বিশ্বনাথ কয়েকবার নাক টেনে ঘ্রাণ নিলেন। তারপর একটা সোফায় বসে পড়লেন। তাকালেন তিতলির দিকে।
ঘরটার মতো তিতলিও অগোছালো, কিন্তু ওকে দারুণ লাগছিল বিশ্বনাথের।
বোধহয় একটু আগে স্নান করেছে। কানের দুপাশে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো যে ভিজে সেটা বোঝা যাচ্ছে। গায়ে একটা গোলাপি শার্ট, পায়ে সাদা পাজামা। গলায় সরু প্লাটিনামের চেন, কানের লতিতে সরষের মতো দুটো প্লাটিনামের ফুটকি।
তিতলি জিগ্যেস করল, ‘কাটা জায়গাটা কেমন আছে?’
‘ঠিক আছে।’ বিশ্বনাথ বুকে দুবার আলতো চাপড় মেরে প্রমাণ দিলেন। তারপর জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি ফুল ভালোবাসো?’
‘কেন বাসব না! সবাই ভালোবাসে।’ ফুলের তোড়াটা সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখল তিতলি: ‘তা ছাড়া আমার হাতে তো বেশি সময় নেই! তাই আমার সবকিছু ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।’
‘কেন, সময় বেশি নেই কেন? তুমি তো সবে বাইশ!’
মলিন হাসল তিতলি। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বিশ্বনাথের মুখোমুখি বসে পড়ল। বিশ্বনাথ কাল রাতের পারফিউমের গন্ধটা পেলেন। সেইসঙ্গে সিগারেটের গন্ধও।
‘বলছি। আগে একটু কফি খান।’ চট করে উঠে পড়ল। হেসে বলল, ‘আমি রান্নাবান্না কিছু জানি না। শুধু চা আর কফি বানাতে পারি।’
‘তা হলে দুপুরে খাব কোথায়? বাইরে?’
‘না, এখানে। কাছেই একটা চাইনিজ রেস্তোরাঁ আছে। বেশ ভালো। ওখানে ফোন করে বলে দিয়েছি। একটা নাগাদ খাবার এসে যাবে। এক মিনিট বসুন, কফিটা করে নিয়ে আসি—।’
প্রায় পাঁচমিনিট পরে কফির কাপ আর বিস্কুট ট্রে-তে সাজিয়ে হাজির হল। ট্রে-টা টেবিলে নামিয়ে রাখতেই বিশ্বনাথের চোখে পড়ল কফির কাপের পাশেই বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট আর শৌখিন লাইটার।
সোফায় বসে বিশ্বনাথের হাতে কফির কাপ এগিয়ে দিল তিতলি। নিজেও নিল। কফির কাপে কয়েক চুমুক দেওয়ার পরই সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার তুলে নিল। বিশ্বনাথের দিকে প্যাকেটটা এগিয়ে ধরল: ‘লাইক আ স্মোক?’
মাথা নেড়ে ‘না’ জানালেন বিশ্বনাথ। আগে সিগারেটের নেশা ছিল। রেণুকণা তাই নিয়ে দিনরাত আপত্তি করতেন। রেণুকণা মারা যাওয়ার পর ওই নেশাটা ছেড়ে দিয়েছেন।
তিতলি মাথা নীচু করে সিগারেট ধরাল।
‘নিন, কফি খান। বোধহয় তেমন ভালো হয়নি।’
‘তা কেন? ভালোই তো হয়েছে!’ কাপে লম্বা চুমুক দিলেন বিশ্বনাথ।
‘কনভার্টেড ভ্যাম্পায়ারের লাইফ আপনার কেমন লাগছে?’ ধোঁয়া ছেড়ে জিগ্যেস করল তিতলি।
‘আগের লাইফের চেয়ে অনেক ভালো…।’
‘আগের লাইফ মানে?’
কফি খেতে-খেতে বিশ্বনাথ তার আগের লাইফের গল্প বলতে লাগলেন।
বাষট্টির মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বাইশ সেই গল্প শুনতে লাগল। শুনতে-শুনতে এতই তন্ময় হয়ে গিয়েছিল যে, সিগারেটটা কখন ছোট হয়ে গেছে খেয়ালই করেনি। আঙুলে ছ্যাঁকা লাগতেই চমকে জেগে উঠল তিতলি।
কফি শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বনাথ তখনও গল্প বলেছিলেন। হঠাৎ, কী মনে হল কে জানে! তিতলির কাছ থেকে চেয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। তিতলিও একটা ধরাল।
রেণুকণার কথা বলতে গিয়ে বিশ্বনাথের চোখে জল এসে গেলে। তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে চোখ মুছলেন। ঘষা গলায় বললেন, ‘এখনও আমি মনে-মনে ওর সঙ্গে কথা বলি। ও-ই আমার কথা বলার লোক।’
সব শোনার পর তিতলি অনেকক্ষণ মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইল। তারপর বলল, ‘বাষট্টি, আমার ওসব প্রবলেম নেই। কারও সঙ্গে রিলেশান থাকলে—তারপর সেটা কেটে গেলে, তবে না তাকে মিস করব…।’
