অরিন বলল, ও.কে, স্যার।
এই পাস্ট হিস্ট্রিগুলো স্ক্যান করার কাজে লোরা তোমাকে হেল্প করবে। য়ু আর পাটনার্স।
অরিন আড়চোখে লোরার দিকে দেখল। লোরার মুখে একটা উজ্জ্বল আভা ফুটে উঠল।
ওরা চলে গেলে আমি ছবির ফোল্ডারটা টেবিলে নামিয়ে রেখে কম্পিউটারের দিকে ঘুরে বসলাম। পুরো ব্যাপারটার একটা ব্রিফ রিপোর্ট তৈরি করতে শুরু করলাম। কাজ করতে করতে আমার চোখ বারবার টেবিলে রাখা খোলা ফোল্ডারটার দিকে চলে যাচ্ছিল।
সেখান থেকে নিশিকা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। চ্যালেঞ্জের হাসি।
মেয়েটা আরও কজন কোটিপতিকে ব্ল্যাকমেল করছে কে জানে!
.
নিশিকা আমার মুখোমুখি চেয়ারে বসল। শাড়িটা সামান্য গুছিয়ে নিয়ে কাঁধের ব্যাগটা কোলের ওপরে রাখল। তারপর আত্মবিশ্বাস ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
হাসিটা এমন যেন ও বুঝতে পেরেছে আমার ডিপার্টমেন্টের তদন্তের নিটফল শূন্য, কিংবা মহাশূন্য।
অরিন আর লোরা আমাকে গতকাল রিপোর্ট দিয়েছে যে, রাজীব টাটা এবং সুইসাইডে মারা যাওয়া তিন কোটিপতির জীবনে বলার মতো তেমন কোনও কুকাজ নেই। চারজনেরই জীবন মোটামুটিভাবে যুধিষ্ঠির কিংবা সত্যবানের মতো।
সুতরাং নিশিকাকে আমার দপ্তরে একবার ডেকে পাঠিয়েছি।
এসব ভাবছিলাম আর নিশিকার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওর চোখদুটো আমার কেমন অলৌকিক মনে হচ্ছিল। সোজা চেয়ে আছে আমার দিকে। চোখে পলক পড়ছে না।
ঠান্ডা গভীর চোখ। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। যেন আমার আপাদমস্তক অন্তরতম আনাচকানাচ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে জরিপ করে নিয়েছে। আমার সম্পর্কে কিছুই আর ওর জানতে বাকি নেই।
কোনওরকমে অস্বস্তি কাটিয়ে আমি কথা বললাম, নিশিকা, আপনি রাজীব টাটাকে ব্ল্যাকমেল করছেন। আরও তিনজন মালটি মিলিওনেয়ার আপনার ব্ল্যাকমেলের টার্গেট হয়ে সুইসাইড করেছেন। এখনও আমরা কোনও কংক্রিট প্রুফ পাইনি–তবে আজ না হয় কাল প্রমাণ পাবই। তখন আপনার এই হাসি মিলিয়ে যাবে। তার চেয়ে বেটার আপনি এখন নিজে থেকেই পুরো ব্যাপারটা খুলে বলুন।
নিশিকার চোখ অপলক। ঠোঁটে একচিলতে হাসি। ও বলল, আপনাকে সব বলব।
আমি মাথা নেড়ে ইন্টারকম ভিডিয়োফোনের দিকে হাত বাড়ালাম : হ্যাঁ, কনফেস করাটাই বেটার। শাস্তি কম হবে।
নিশিকার হাসিটা চওড়া হল? কাউকে ফোন করে ডাকার দরকার নেই। আমি কনফেস করব শুধু আপনার কাছে–আর কারও কাছে নয়।
তার মানে! আমার কেমন যেন নার্ভাস লাগছিল।
রামা-শ্যামার কাছে সব খুলে বলে কোনও লাভ নেই। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। জানতাম আমাদের দেখা হবেই। আপনি আমাকে ডেকে পাঠাবেন।
কীভাবে জানলেন আমি ডেকে পাঠাব?
হাসল নিশিকা, বলল, জানি। এই জানাটাই আমার অলৌকিক ক্ষমতা।
মেয়েটা কি জ্যোতিষী নাকি! কে জানে, হয়তো ব্লাফ দিচ্ছে! কিন্তু ওর চোখ তো সে কথা বলছে না। বরং মনে হচ্ছে সত্যি কথাই বলছে। ওঃ, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার ভেতরটা কেমন করছে!
এবারে বলুন, রাজীব টাটাদের মতো বড়লোকদের কী কেলেঙ্কারির ঘটনা আপনি জানেন যা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওঁদের থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা নিচ্ছেন! ওঁদের পাস্ট লাইফের কী গোপন খবর আপনি জানেন?
নিশিকা হাসল, মাথা নাড়ল এপাশ-ওপাশ–যেন আমি কোনও ছেলেমানুষি কথা বলেছি। তারপর ও ওঁদের অতীতের কোনও খবর তো আমি জানি না! আমি জানি শুধু ওঁদের ভবিষ্যতের কথা–আগামী দিনে ওঁদের জীবনে কী হতে চলেছে।
কী বলছেন আপনি! বুঝতে পারছিলাম আমার মুখ হাঁ হয়ে গেছে, চোখ বড় বড় : আপনি কি জ্যোতিষী? ফরচুন-টেলার?
না। জ্যোতিষীরা আন্দাজ করে ভাগ্যের কথা বলে। প্রতিদিনের খবর জানে না। আমার সামনে ঝুঁকে এল নিশিকা? আমি প্রতিদিন, প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মুহূর্তের খবর জানি। আমি আন্দাজে কিছু বলি না। আমি ফরচুন-টেলার নই…ফিউচার-টেলার।
আমি নিশিকার অন্তর্ভেদী চোখের দিকে দেখছিলাম। অপলক ওই চোখ ভবিষ্যতের সবকিছু দেখতে পাচ্ছে!
সুতরাং বুঝতেই পারছেন, ব্যাপারটা খুব সহজ–আমি ওই বড়লোকগুলোর কাছে গিয়ে বলি আমি ওদের ভবিষ্যতের সব খবর জানি। তাই আমাকে টাকা দিতে হবে। একটু থেমে তারপর ও বড়লোকদের আমি ঘেন্না করি। আর আপনার মতো সমাজে যারা উঁচু চেয়ারে বসে রয়েছে তাদেরও আমি দু-চক্ষে দেখতে পারি না। আপনারা সবাই মিলে দেশটাকে উচ্ছন্নে পাঠাচ্ছেন।
নিশিকা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল, বড়-বড় শ্বাস ফেলছিল।
আমি হাত তুলে ওকে শান্ত হতে বললাম। তারপর ও তার মানে ওঁদের ভবিষ্যতের কুকীর্তি গোপন রাখার জন্যে ওঁরা আপনাকে টাকা দেন? যাতে কাউকে আপনি সেসব কথা না বলে দেন?
না, না! আপনি ঠিক বুঝতে পারেননি। ফিউচারের সব গোপন কথা অন্যদের কাছে ফাস করে দেব বলে আমি ওদের ভয় দেখাই না। আমি ওদের ভবিষ্যতের কথা ওদেরই বলে দেব– এই বলে ভয় দেখাই। যেমন ধরুন, রাজীব টাটা কোন বছরে কোনদিন কটার সময় কীভাবে মারা যাবে আমি জানি। সেটা যদি ওকে জানিয়ে দিই তা হলে লোকটা কি আর নিশ্চিন্তে বাঁচতে পারবে? রোজ গুনবে মরতে ওর আর কদিন বাকি। এই টেনশানে-টেনশানে ওর লাইফ হেল হয়ে যাবে। তারপর একদিন আর সইতে না পেরে সুইসাইড করবে। তাই না?
আমি পাথর হয়ে বসে রইলাম। ব্ল্যাকমেলের রহস্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
