থিয়েটার রোডে অফিস, পদবি টাটা–যিনি এক কথায় পাঁচ লাখ ক্যাশ দিতে পারেন…। এরকম একজনই আছেন কলকাতায় : রাজীব টাটা–টাটা হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটিড-এর চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাদা কথায় যাকে মালিক বলা যায়।
রাজীব টাটাকে একটি মেয়ে ব্ল্যাকমেল করছে!
এটাও ঠিক যে, গত দুমাসে কলকাতায় তিনজন কোটিপতি সুইসাইড করেছেন। সুইসাইডের কারণ আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি। মিনিস্টারদের প্রচণ্ড চাপ থাকায় আমরা তন্নতন্ন করে ইনভেস্টিগেট করেছি, কিন্তু কিছুই পাইনি। এখন তা হলে একটা ব্লু পাওয়া গেল। সম্ভবত এই মেয়েটিই ওদের তিনজনকে ব্ল্যাকমেল করছিল। তারপর ওঁরা টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় ওঁদের পুরোনো কেলেঙ্কারি ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ফলে ওঁরা স্রেফ ভয় পেয়ে সুইসাইড করেছেন।
আমি অরিনকে বললাম, অরিন, তোমাকে এখনই একটা অ্যাকশন প্ল্যান দিচ্ছি। তুমি কাজে নেমে পড়ো। সঙ্গে লোরাকে নিয়ে নাও। খুব এনার্জিটিক মেয়ে–ওকে আমি পছন্দ করি। তা ছাড়া ও খুব ভালো ফটো তুলতে পারে…।
আমি জানি, অরিন লোরাকে আমার চেয়ে টু-কে টাইমস বেশি পছন্দ করে। আর লোরাও অরিনের সঙ্গে থাকতে ভালোবাসে। সেইজন্যেই ওদের দুজনকে একসঙ্গে অ্যাসাইনমেন্ট দিতে আমি ভালোবাসি তাতে অনেক বেশি কাজ আদায় করা যায়।
তোমরা কাল সকাল সাড়ে দশটা থেকে রাজীব টাটার থিয়েটার রোডের অফিসে হাজির থাকবে। লোরাকে আমি বলে দিচ্ছি, সঙ্গে আমাদের ডিপার্টমেন্টের বেস্ট ফাজি ডিজিটাল ক্যামেরাটা নিয়ে যাবে। মেয়েটি এগারোটার সময় রাজীব টাটার অফিসে এলেই ওর পটাপট ছবি তুলবে। আবার অফিস থেকে যখন বেরোবে তখনও শট নেবে। আমি ওর অন্তত দু-ডজন ছবি চাই ডিস্কে ছবিগুলো স্টোর করে নেবে–অ্যান্ডারস্ট্যান্ড?
ও.কে, স্যার।
মেয়েটি টাটার অফিস থেকে বেরোলে তুমি রাজীব টাটার সঙ্গে গিয়ে কথা বলবে। একটা জেনারাল এনকোয়ারি গোছের করবে…যতটা ডিটেইল বের করতে পারো আর কী! আর লোরা মেয়েটিকে ফলো করবে–ওর বাড়িটা চেনার চেষ্টা করবে। তারপর বিকেল চারটে নাগাদ আমাকে তোমরা ফুল রিপোর্ট দেবে। তখন আমি নেক্সট অ্যাকশন প্ল্যান চক আউট করব।
অরিন মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। আমি ভিডিয়োফোনে লোরার নম্বর ডায়াল করলাম।
ছোট পরদায় লোরার ছবি ফুটে উঠল। ওকে দেখলেই বয়েসটা কমাতে ইচ্ছে করে।
লোরাকে সংক্ষেপে গাইডলাইন দিলাম। তারপর বললাম, অরিনের সঙ্গে ও যেন কথা বলে নেয়।
তখনও জানি না, একটা অদ্ভুত রিপোর্ট আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
*
পরদিন বিকেল চারটের সময় লোরা আর অরিন আমার চেম্বারে এল।
ওদের বসতে বললাম।
অরিন একটা ফোল্ডার আমার দিকে এগিয়ে দিল? এতে তিরিশটা কালার প্রিন্টআউট আছে।
ফোল্ডার খুলে ছবিগুলো দেখলাম।
ডিজিটাল ক্যামেরার ডিস্ক থেকে কম্পিউটারে ট্রান্সফার করে ছাপা ছবি। ছবিগুলো ফটোগ্রাফের চেয়েও জীবন্ত।
মেয়েটিকে দেখতে অতি সাধারণ। লম্বাটে মুখ। গায়ের রং মাঝারি। কপালে ছোট টিপ। গলায় সোনার চেন। পরনে গাঢ় নীল পাড় আকাশি রঙের শাড়ি। সাদা ব্লাউজ।
মেয়েটির কাঁধে সমাজসেবিকা ঢঙের একটা ব্যাগ ঝুলছে।
এই আমাদের ব্ল্যাকমেলার?
হ্যাঁ, স্যার। অরিন বলল।
অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটিকে দেখলাম আমি।
এই সাদামাটা মেয়েটা একের পর এক কোটিপতিকে অকাতরে ব্ল্যাকমেল করে চলেছে! চেহারা দেখে বিশ্বাস হতে চায় না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অরিন বলল, রাজীব টাটা গতকাল ওকে পাঁচ লাখ টাকার চেক দিয়েছেন। বললেন, এই ভদ্রমহিলা নানারকম সোশাল ওয়েলফেয়ারের কাজে যুক্ত আছেন। তাই তিনি খুশি হয়ে ওঁকে পাঁচলাখ টাকা দিয়েছেন। এটা ওঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। যদি কখনও ব্যাপারটা পুলিশের আওতায় আসে রাজীব টাটা নিশ্চয়ই আমাদের জানাবেন আমাদের হেল্প চাইবেন।
আমি ব্ল্যাকমেল শব্দটা উচ্চারণ করার সঙ্গে-সঙ্গে উনি যেভাবে হেসে উঠলেন তাতে মনে হল আমি যেন চাঁদকে চৌকো বলেছি। আমার খুব ইনসাল্টিং লেগেছে, স্যার। এরপর চুপচাপ চলে আসা ছাড়া কোনও পথ ছিল না।
অরিন গম্ভীর মুখে কথা শেষ করল। বুঝলাম, সকালের অপমানটা বিকেলেও মিলিয়ে যায়নি।
এবার লোরার পালা।
ও যা বলল সেটা সত্যি-সত্যিই অবাক হওয়ার মতো।
মেয়েটির নাম নিশিকা। এলগিন রোডে থাকে। লোরা ওকে অনুসরণ করার সময় নিশিকা বেশ কয়েকবার পেছন ফিরে তাকিয়েছিল। লোরার মনে হয়েছে নিশিকা অনুসরণের ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তাতে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, একফোঁটাও বিচলিত হয়নি। ফলে লোরা অতি সহজেই ওর বাড়ির কাছে পৌঁছে যায়। ওর নাম-ঠিকানাটাও টুকে নিয়ে আসে।
তোমার ফলো করার কাজটা তা হলে জলের মতো সহজ হয়ে গেছে? লোরাকে জিগ্যেস করলাম।
হ্যাঁ, স্যার–অ্যাট লিস্ট আমার তাই মনে হয়েছে।
সত্যি, একজন ব্ল্যাকমেলারের পক্ষে এ ভারী অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া।
কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর অরিনকে বললাম, অরিন, নিশিকা রাজীব টাটাকে কিছু একটা ফাঁস করে দেবে বলে ভয় দেখাচ্ছিল। লেট আস ডিগ ইনটু রাজীব টাটাস পাস্ট। খুঁজে বের করো, রাজীব টাটা কী এমন কেলেঙ্কারির কাজ করেছেন যা ফাস হলে ওঁর মানসম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। আর যে-তিনজন মালটি মিলিওনেওয়ার গত দুমাসে সুইসাইড করেছেন খোঁজ করে দ্যাখো ওঁদের লাইফে কোনও গোপন স্ক্যান্ডাল ছিল কি না। সিক্রেট ইনফরমেশানই ব্ল্যাকমেলারদের স্ট্রেংথ।
