বিশ্বনাথ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বললেন।
‘প্রমিস?’ বিশ্বনাথের ডানহাতের পাতাটা নিজের মুঠোয় নিয়ে আন্তরিকভাবে জানতে চাইল।
বিশ্বনাথ অদ্ভুত মেয়েটার চোখে তাকালেন। বললেন, ‘গড প্রমিস।’
আবার গাড়ি ছোটাল তিতলি।
গাড়ির গতি আর দুরন্ত বাঁক নেওয়ার মধ্যে একটা খুশির ছাপ খুঁজে পেলেন বিশ্বনাথ। বুকের জ্বালাটা তখন আর টের পাচ্ছিলেন না।
বেশ মনে আছে, ব্রতীনকে সার্ভিস দিয়ে আসার পর রাতে ভালো করে দাঁত মেজেছিলেন। সেদিন রাতে কিছু খেতে ইচ্ছে করেনি। আলো নিভিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েছিলেন বিছানায়। তারপর রেণুকণার সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করেছিলেন।
‘আমি আজ যা করে এলাম সেটা কি পাপ?’
‘কে বলেছে পাপ! হঠাৎ এসব আজেবাজে কথা তোমার মনে হচ্ছে কেন?’
‘না…মানে…একটা অল্পবয়েসি ছেলেকে নতুন একটা নেশায় নামিয়ে দিলাম…।’
‘তুমি না গেলে, ”শটস অ্যান্ড কিকস” অন্য কোনও সি. ভি.-কে পাঠাত। তাছাড়া ব্রতীন তো আর মরে যায়নি। বরং কিছুটা আনন্দ পেয়েছে।’
শেষ পর্যন্ত বিশ্বনাথ রেণুকণার যুক্তির কাছে হেরে গেছেন।
কিন্তু আজ? আজ কী বলবেন রেণু?
আজ রাতে বাড়িতে এসে কলিংবেল বাজাতেই আলোক বিরক্তভাবে দরজা খুলে দিল।
‘কী যে তোমার একটা বাজে অভ্যেস হয়েছে! নিশাচর প্রাণীর মতো রাত করে বাড়ি ফেরা!’ তারপরই রক্তে ভেজা শার্টটা চোখে পড়ল ওরঃ ‘কী ব্যাপার? রক্ত কিসের?’
বিশ্বনাথ শুধু ছোট্ট করে বললেন, ‘গুণ্ডারা অ্যাটাক করেছিল—।’
‘চমৎকার!’ আলোক ঠোঁটের কোণ দিয়ে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে শূন্যে হাত নাড়ল: ‘এখন সিক্রেট পুলিশের ঝুটঝামেলা সামলাবে কে?’
‘কোনও ঝুটঝামেলা হবে না…।’ নীচু গলায় কথাটা বলে ছেলের কাছ থেকে সরে গেলেন বিশ্বনাথ। তিতলির মুখটা চোখের সামনে ভাসছিল। অপলকে সেটাই দেখছিলেন।
আশ্চর্য! যার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক, বিশ্বনাথের আঘাত নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই তার—বরং পুলিশি ঝামেলার ভয়ে সে অনেক বেশি ব্যতিব্যস্ত।
আর যাকে তিনি চেনেন না জানেন না সে বলেছিল, ‘…শিগগির নার্সিহোমে চলুন…।’
একদলা থুতু এসে গেল মুখের ভেতরে। নিজের ঘরের দিকে যেতে-যেতে আড়চোখে দেখলেন পারমিতা ওদের শোওয়ার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে ঘেন্না এবং বিরক্তি।
নিজের ঘরে ঢোকার পর নতুন জীবনের অলৌকিক শ্রবণক্ষমতায় শুনতে পেলেন পারমিতার কথা, ‘বুড়োটা দেখছি লায়েক হয়ে গেছে!’
জামা-টামা খুলে কাটা জায়গাটা ভালো করে পরখ করলেন। না, বিশেষ কিছু হয়নি—ইঞ্চিচারেক সামান্য চিরে গেছে। রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে গেছে। তবে চিড়চিড়ে জ্বালাটা এখনও আছে।
তুলো দিয়ে ক্ষতটা পরিষ্কার করলেন বিশ্বনাথ। তারপর অ্যান্টিসেপটিক হিলার স্প্রে করে দিলেন। জ্বালাটা বেশ কমে গেল।
রাতে অন্ধকার বিছানায় শুয়ে আবার রেণুকণার সঙ্গে কথা-যুদ্ধ।
ব্রতীনের বেলায়—যা ব্রতীনের মতো আরও অনেক ক্লায়েন্টের বেলায়—রেণুকণার যুক্তির কাছে কাবু হয়ে গেছেন বিশ্বনাথ।
কিন্তু আজ?
রেণুকণা বরাবর শান্ত, বুদ্ধিমতী। মৃত্যুর আগেও—পরেও। আজ বিশ্বনাথকে সুন্দর ঠান্ডা যুক্তি শোনালেন রেণুকণা।
একটা বাইশ বছরের মেয়ের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে বিশ্বনাথ যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। তা ছাড়া ফুটপাথে পড়ে যাওয়ার লোকটা যে মরে গেছে সে-কথা কে বলেছে! লোক তিনটে যেরকম ক্রিমিনাল টাইপের তাতে মনে হয় তারা এর আগে প্রচুর খুন-জখম-ডাকাতি করেছে। অনেক আগেই ওদের মৃত্যুদণ্ড পাওয়া উচিত ছিল। আক্ষেপ এটাই যে, দুটো গুণ্ডা প্রাণে বেঁচে পালিয়েছে।
ব্যস। বিশ্বনাথ আবার ঠুঁটো জগন্নাথ।
সুতরাং পরদিন সকালে যখন রাস্তায় বেরোলেন তখন বিশ্বনাথ পালকের মতো হালকা। বড় রাস্তার মোড়ে সিক্রেট পুলিশের দুজন অফিসারকে দেখে মোটেই ঘাবড়ে গেলেন না। বরং ওদের একজনকে সময় জিগ্যেস করে ঘড়ি মেলালেন। তারপর পায়ে-পায়ে এগিয়ে একটা পাবলিক ফোন বুথে ঢুকে পড়লেন।
কাগজের চিরকুটটা দেখে তিতলির নম্বর ডায়াল করলেন বিশ্বনাথ। ও-প্রান্তে ‘হ্যালো’ শোনামাত্রই বললেন, ‘বাইশ, কেমন আছ?’
‘হু ইজ ইট?’ ঘুমজড়ানো স্বরে তিতলি জিগ্যেস করল।
‘বাষট্টি বলছি—।’
সঙ্গে-সঙ্গে চিনে ফেলার খিলখিল হাসি। তারপর: ‘ও, আপনি!’
‘কী করছ এখন, বাইশ?’
‘ঘুমোচ্ছি—।’
‘ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে কথা বলা যায় না কি?’
‘যায় বলছি তো!’ আবার হাসি।
‘আমাকে ফোন করতে বলেছিলেন কেন?’
‘আজ দুপুরে আমার এখানে খাবেন। আমরা খেতে-খেতে গল্প করব।’
‘ওখানে আর কে-কে আছে?’
‘কেউ না। আমি একা থাকি—আমার আর কেউ নেই…।’
তিতলির গল্পটা জানতে ইচ্ছে করল বিশ্বনাথের। মনে পড়ল, কাল রাতে ও বলেছিল, ‘…সে অনেক ব্যাপার…।’
বিশ্বনাথ যেতে রাজি হলেন। তিতলি ওঁকে বলে দিল কীভাবে ওর ফ্ল্যাটটা চিনে নেওয়া যাবে। তারপর জিগ্যেস করল, ‘শিয়োর আসছেন তো? প্রমিস?’
বিশ্বনাথ হেসে বললেন, ‘গড প্রমিস—।’
বাড়ি ফিরে বিশ্বনাথ শেভ করলেন। অনেক বাছাবাছির পর একটা শার্ট প্যান্ট পছন্দ করে পরে নিলেন। বহুদিন পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে দেখলেন। মুখে পাউডার, ক্রিম লাগালেন। তারপর অযত্নে পড়ে থাকা একটি পারফিউমের শিশি খুঁজে বের করে জামায় বেশ কয়েকবার স্প্রে করলেন।
মনের ভেতরে একটা খুশি ছড়িয়ে যাচ্ছিল। এমন খুশি যে-খুশি সবাইকে ক্ষমা করতে শেখায়। হয়তো সেইজন্যই বেরোনোর সময় পারমিতার ভ্রূকুটি আর ভিক্টরের গজরানিকে ক্ষমা করে দিলেন।
