সত্যসুন্দর মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। হলঘরের একটা মানুষও এখন তার দিকে তাকাতে পারছে না। যেন তার চোখে চোখ পড়লেই ওরা ভস্ম হয়ে যাবে।
ওরা যদি তাকাত তা হলে দেখতে পেত সত্যসুন্দরকে তখন কত সুন্দর দেখাচ্ছিল।
সত্যসুন্দর মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। হলঘরের একটা মানুষও এখন তার দিকে তাকাতে পারছে না। যেন তার চোখে চোখ পড়লেই ওরা ভস্ম হয়ে যাবে।
ওরা যদি তাকাত তা হলে দেখতে পেত সত্যসুন্দরকে তখন কত সুন্দর দেখাচ্ছিল।
প্রতিদিন সন্ধেবেলা একটা সান্ধ্য আজকাল কেনা রমাপদবাবুর অভ্যেস। সারাদিনের খাটুনির পর অফিসপাড়া থেকে হেঁটে চলে যান বাবুঘাটে। সেখানে লাইন দিয়ে উঠে পড়েন বাসে। একটা সিট দখল করে ঝিমোতে থাকেন। কারণ, দমদম ক্যান্টনমেন্ট অনেক দূরের পথ। সুতরাং তাঁর প্রৌঢ় শরীরটা তখন একটু জিরিয়ে নেয়। নইলে বাড়ি ফেরার পরই তো নিত্যকার অভাবের সঙ্গে জুডোক্যারাটের লড়াই। এ লড়াইয়ে অভাব কখনও ক্লান্ত হয় না। তা ছাড়া তার সঙ্গে হাত মেলায় মনোরমা আর জয়িতা। বউ আর মেয়ে।
বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়লেই রমাপদবাবু ভয় পান। আবার সেই জরাজীর্ণ বট-অশ্বথের শেকড় গজানো আস্তানা। উনুনের ধোঁয়া। জনতা বাথরুম। জলের ভাগাভাগি নিয়ে চুলাচুলি। তার ওপর মনোরমা আর জয়িতা।
জয়িতার বিয়ের বয়েস পেরোতে চলল, তবু একটা পাত্র জুটল না। একটা প্রেম-ট্রেমও করে উঠতে পারল না মেয়েটা! দেখতে মন্দ নয়, কিন্তু ইদানীং খিটখিটে হয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে বোধহয় একটু লোভীও। ওর আর দোষ কী! মায়ের ধাত পেয়েছে।
কতদিন রমাপদবাবুর মনে হয়েছে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। তারপর একলা নিরিবিলি জীবন। বাড়ি ফেরামাত্রই কেউ আর কিচিরমিচির শুরু করে বিরক্ত করবে না, কিন্তু মধ্যবিত্ত সাহসে কুলোয়নি। সমাজ হচ্ছে এক অদ্ভুত অভিভাবক ও খাওয়ানোর মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই।
খরচ বাঁচানোর জন্য সকালে খবরের কাগজ কেনেন না রমাপদবাবু। তবে কম খরচে সান্ধ্য আজকাল কেনাটা তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঠিক মানিকতলার মোড়ে এলেই তাঁর ঝিমুনি কেটে যায়। কারণ একটা বাচ্চা ছেলে সান্ধ্য আজকাল-এর গোছা নিয়ে বাসে উঠে চিৎকার করতে থাকে, সান্ধ্য আজকাল! সান্ধ্য আজকাল! রমাপদবাবু ওর কাছ থেকে একটা কাগজ কিনে পড়তে শুরু করেন। বেশিভাগই চনমনে খবর। আর প্রতি শুক্রবারে সান্ধ্যবাসর শিরোনামের বিভাগে একটা করে গল্প। রমাপদবাবু কাগজের একটি অক্ষরও বাদ দেন না। এমনকী বিজ্ঞাপনগুলোও রেহাই পায় না তার নজর থেকে।
আজ শুক্রবার। মানিকতলার ক্রসিং-এ এসে সেই চেনা ছেলেটার কাছ থেকে একটা সান্ধ্য আজকাল কিনলেন রমাপদবাবু। তার আশেপাশে আরও কেউ-কেউ কাগজ কিনলেন ছেলেটার কাছ থেকে। |||||||||| বাসের স্তিমিত আলোয় সামান্য ঝাঁকুনির মধ্যেও তিনি কাগজে চোখ বোলাতে শুরু করলেন। প্রথম কটা পাতায় চোখ বুলিয়ে চলে এলেন গল্পের পাতায়। ভারী অদ্ভুত নামের একটা গল্প ছাপা হয়েছে আজ। রমাপদবাবু গল্পটা পড়তে শুরু করলেনঃ
বিপদে পড়ে আপনাকে বলছি
সমীর সরকার
বিশ্বাস করুন, ভীষণ বিপদে পড়ে আপনাকে বলছি। আপনি সান্ধ্য আজকাল-এর পাঠক। সুতরাং আপনিই একমাত্র আমাকে বাঁচাতে পারেন এই বিপদ থেকে। আর কিছুদিন এইভাবে চললে আমি সত্যি-সত্যি পাগল হয়ে যাব।
আমার এই কাহিনি মোটেই গল্প নয়, বরং নিষ্ঠুর সত্যি। আপনার কাছে এ আমার আন্তরিক আবেদনঃ আমাকে বাঁচান! এভাবে আমি আর পারছি না।
ঘটনাটা গোড়া থেকেই তা হলে খুলে বলি।
আজকের মতোই সেদিনটা ছিল শুক্রবার। অফিস থেকে বাসে করে বাড়ি ফিরছি। হাতে ছিল আপনারই মতো এক কপি সান্ধ্য আজকাল। বাসে হকারের কাছ থেকে কেনা। বাসের অল্প আলোয় ঝিমুনি কাটিয়ে খবরের কাগজটার পাতায় চোখ বোলাচ্ছিলাম, এমন সময় পাশ থেকে কে যেন ডেকে বলল, কী ব্যাপার, সমীরবাবু! চিনতে পারছেন?
চমকে তাকিয়ে দেখি, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। আমার পাশের দুজন ভদ্রলোকের ঠিক পরেই বসে আছেন। তারও হাতে সান্ধ্য আজকাল।
বৃদ্ধের থুতনিতে সামান্য খোঁচা-খাঁচা দাড়ি। মাথার চুল প্রায় সাদা। কপালে ও গালে ভাঁজ পড়েছে। ফরসা মুখ। নাকটা বেশ মোটা ও লালচে। চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা। চশমার পাওয়ার যথেষ্ট বেশি। কারণ, কাচের ওপরে রিং-এর মতো দাগ পড়েছে, আর ভদ্রলোকের চোখজোড়া কুতকুতে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
বৃদ্ধ হাসলেন আমার দিকে তাকিয়ে। হাতের কাগজটা ভাঁজ করে বললেন, চিনতে পারলেন না তো!
আমি বেশ একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। কাগজ পড়া মাথায় তুলে হন্যে হয়ে ভাবতে শুরু করলাম? কোথায় দেখেছি এই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে? কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না।
বৃদ্ধ রঙ্গ করে বললেন, গত মাসে ব্যান্ডেলে বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলেন ভুলে গেলেন! আপনার তো সকাল-বিকেল ব্রাহ্মীশাক খাওয়া উচিত।
ব্যান্ডেলে যে আমি গত মাসে নেমন্তন্ন খেতে গেছি একথা সত্যি। আমার শ্যালিকার মেয়ের বিয়ে ছিল। কিন্তু…সেখানে এই বৃদ্ধটিকে দেখেছি বলে…।
আশপাশের লোকজন কৌতূহলী হয়ে আমাদের কথা শুনছিল। ফলে আমার অস্বস্তিও ক্রমশ বাড়ছিল।
কী করব ভাবছি, এমন সময় রহস্যময় বৃদ্ধটি আমাকে বাঁচালেন। বললেন, আসুন, একটু নামি। আপনার সঙ্গে খুব দরকারি কথা আছে। কদিন ধরেই আপনাকে খুঁজছি।
আমার যথেষ্ট অবাক লাগছিল। কিন্তু আর কথা না বাড়িয়ে ওঁর প্রস্তাবে রাজি হলাম। বাস থেকে নেমে পড়লে হয়তো নিরিবিলির মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির পালাটা শেষ করা যাবে।
© 2023 BnBoi - All Right Reserved
© 2023 BnBoi - All Right Reserved