কপালে হাত ঠেকালেন সত্যসুন্দর। তার প্রকট কণ্ঠা তৃষ্ণার্ত মানুষের মতো চঞ্চল হয়ে ওঠানামা করছিল। মনের ভেতরের খচখচানির কাঁটাটা ক্রমাগত বিধছে। পিছনের সারিগুলোয় কিছু উশখুশুনি, চাপা হাসি, সবই তার নজরে পড়ছিল। কথা বলতে বলতে তিনি যেই থেমেছেন অমনি হলঘরে করতালির ফোয়ারা ছুটল। অর্থাৎ সবাই ভেবেছেন সত্যসুন্দরের বলা শেষ। অনুষ্ঠানও শেষ। সত্যসুন্দরের মনে হল করতালির শব্দগুলো যেন তাঁর বলিরেখামাখানো ভাঙা গালে অবিরত চড় মারার শব্দ। মনের ভেতরের ঘূণপোকাগুলো সেই মুহূর্তে তার হৃদয়ে কামড় বসাল।
দীপক রায়চৌধুরী তার সামনের সারির অধ্যাপকদের সঙ্গে তখন আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। আলোচনায় বিষয় হল, ইনস্ট্রমেন্ট মেকানিকের চাকরি করে কলকাতার বাড়ি করা সম্ভব কি না। হঠাৎই সত্যসুন্দরের কথায় ওরা চমকে উঠল।
আমার বলা এখনও শেষ হয়নি!–খসখসে ধরা গলায় চিৎকার করে বললেন সত্যসুন্দর। হাত তুলে সবাইকে বসতে ইশারা করলেন। চাদরটাকে ঠিক করে জড়িয়ে নিলেন গায়ে। তার গলার স্বরে এমন একটা কিছু ছিল যে, হলঘরের প্রতিটি মানুষ স্তব্ধ হয়ে গেল। এত স্তব্ধ যে ধূপকাঠি পুড়ে যাওয়ার শব্দও বুঝি স্পষ্ট শোনা যাবে।
শচীদুলালের ভুরু কুঁচকে উঠল। অনঙ্গর চোখেও সংশয়। সত্যসুন্দর হাউহাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। হাতের পিঠ দিয়ে অযথাই চোখ মোছার চেষ্টা করতে লাগলেন। অনঙ্গ উঠে এগিয়ে যেতে চাইছিলেন, শচীদুলাল ইশারায় তাকে বারণ করলেন।
সকলেরই মন ভারী হয়ে উঠছিল এই বৃদ্ধের কান্নায়। জানলায় বসা কাকটা ঘাড় বেঁকিয়ে অবাক চোখে সত্যসুন্দরকে দেখছিল।
কান্নার আবেগ সামলে সত্যসুন্দর জড়ানো ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, আপনারা অনেকেই আজ আমার সম্পর্কে অনেক ভালো-ভালো কথা বললেন। যেসব ঘটনার কথা শচীদা, অধ্যাপক পাত্র বা প্রিন্সিপাল সাহেব বলেছেন সেগুলো মিথ্যে নয়। কিন্তু আপনাদের এত শ্রদ্ধা-ভালোবাসার যুগ্যি মানুষ নই আমি।
সত্যসুন্দরের গলার শিরা ফুলে উঠছিল। ছানিপড়া ঘোলাটে চোখ এখন দু-টুকরো কয়লার মতো দপদপ করে জ্বলছে। নাকের দুপাশে বহতা অশ্রুর দাগ। আবার বলতে লাগলেন, কলেজের কাজে আমি অনেক ফাঁকি দিয়েছি। কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে…।
সত্যসুন্দর ভূতে পাওয়া মানুষের মতো বলে চললেন অনর্গল। সকলে শুনতে লাগল তার অন্যায়-অবিচার আর পাপের কাহিনি। সামনের সারি থেকে শুরু করে শেষ সারি পর্যন্ত কোথাও কোনও শব্দ নেই, কোনও চাপা হাসি নেই, কোনও সন্দিহান কুটিল নজর নেই। সত্যসুন্দরের কথাগুলো জ্বলন্ত লাভাস্রোত হয়ে প্রত্যেকের কানে ও মরমে ঢুকে যেতে লাগল নিষ্ঠুরভাবে।
…এত মিথ্যা প্রশংসা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এখনও যদি আমি প্রতিবাদ না করি, সত্যি কথা না বলি তা হলে বাবার কাছে আমি ছোট হয়ে যাব।–ডক্টর মিত্রের ছবিটাকে ইশারায় দেখালেন উদভ্রান্ত সত্যসুন্দর। বললেন, আজ এখানে আমার শেষ দিন। শেষ দিনে সত্যি কথা বলতে কাকে আমার ভয়! আমার সহকর্মীরা, শ্রদ্ধেয় মহান মাস্টারমশাইরা, প্রত্যেকে ভালো করেই, জানেন কত পাপ আমি করেছি…।
ঘরের প্রতিটি মানুষ পরস্পরের দিকে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছিল। সত্যসুন্দরের মুখোমুখি বসে তারা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারছিল তারা কত অসহায়। শচীদুলালের পেটের চিনচিনে ব্যথাটা ক্রমে বুকের কাছে উঠে আসছিল। সতুটা কি পাগল হয়ে গেল? কীসব যা তা বকছে! কিন্তু কই, শচীদুলাল তো উঠে গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরতে পারছেন না।
সত্যসুন্দরের কষ্টটা ক্রমশ হালকা হচ্ছিল, এবং একইসঙ্গে গলে যাওয়া ব্যথা অশ্রুধারা হয়ে তার আঁকিবুকি কাটা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। গলার স্বরে কান্না মিশে গিয়ে কথাগুলো অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হয়ে যাচ্ছে। ছোট নাতনিটার কথা মনে পড়ছিল তাঁর। বাড়ি থেকে আসার সময়ে জিগ্যেস করছিল, দাদু আজ তোমার ফেয়ারওয়েল ফেয়ারওয়েল মানে কী?
সত্যিই তো, ফেয়ারওয়েল মানে কী? ফেয়ারওয়েলের দিনটাই কি কোনও মানুষের চরম অপমানের দিন? একটা বৃদ্ধ মানুষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে হরেকরকম মিথ্যের ফাঁস এঁটে দেওয়া হয় তার গলায়, সঙ্গে থাকে উপহারের বোঝা। বৃদ্ধের সাধ্য কি ফাসবদ্ধ গলা দিয়ে কোনও স্বর বের করে। সুতরাং হাজারো মিথ্যে মুখ বুজে সয়ে যায় সে। মন ভারী হয়, চোখ ভিজে যায়, কিন্তু বুকের ভেতরের মানুষটা? সে যে দমবন্ধ হয়ে ছটফট করে মরে।
সত্যসুন্দর বড়-বড় শ্বাস নিচ্ছিলেন। ধূপের গন্ধ এখন আরও মোহনীয় হয়ে উঠেছে। সঙ্গে মিশে গেছে টাটকা রজনীগন্ধার সুবাস। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে চোখ মুছলেন সত্যসুন্দর। ঘরের সবকটা মানুষ পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ। ওরা সবাই কি যার-যার ফেয়ারওয়েলের দিনটার কথা ভাবছে?
…যা সত্যি তাই আপনাদের এতক্ষণ ধরে আমি বললাম। যদি কোনও অন্যায় করে থাকি মার্জনা করবেন।-খাটো শরীরটা ঝুঁকিয়ে আবার সবাইকে নমস্কার জানালেন সত্যসুন্দর। শরীরটা কেমন ঝরঝরে লাগছে! মনটাও খুশি-খুশি!
বাইরে শীতের বিকেল পড়ে আসছে। বাতাসে ঠান্ডা বেড়ে উঠছে ক্রমশ। জানলায় বসা কাকটা গলা ছেড়ে ডেকে উঠল, কাকা।
সত্যসুন্দর চোখ ফিরিয়ে দেখলেন, জানলায় একটা অপরূপ লালমোহন পাখি বসে আছে। মিষ্টি সুরে ডাকছে। চকচকে চোখে দেখছে তাকে। ছোট নাতনিটার কথা মনে পড়ছিল সত্যসুন্দরের। দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। মেয়েটা তার দাদুর জন্য রোজই পথ চেয়ে বসে থাকে। আজ ওকে গিয়ে বলতে পারবেন, ফেয়ারওয়েলের মানে কী। নিজের মুখোমুখি বসে এক নিষ্ঠুর অথচ সহজ হিসেবনিকেশের পালা।
