সত্যসুন্দর বেঁটেখাটো মানুষ। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, তার ওপরে একটা তুষের চাদর। মাথার চুল ধবধবে সাদা এবং কিছুটা পাতলা হয়ে এসেছে। কপালে, গালে, থুতনিতে, গলায়, সর্বত্রই ছেয়ে আছে বয়েসের বলিরেখা। গত কয়েকটা ঘণ্টা যেন তাকে আরও বৃদ্ধ করে দিয়েছে।
অনঙ্গ মঞ্চ ছেড়ে নেমে যেতেই শচীদুলালও চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। সতুর বক্তব্য মুখোমুখি বসে শুনবেন বলে প্রথম সারির বেঞ্চিতে জায়গা করে নিলেন তিনি। নিজের ফেয়ারওয়েলের দিনটা আবার তার মনে লম্বা ছায়া ফেলছিল।
একঝলক শীতের বাতাস ঘরে ঢুকতেই জানলার বসা কাকটা চাপা গলায় কাকা করে দুবার ডেকে উঠল। সেটা সকলকে চুপ করতে বলার নির্দেশ কিনা বোঝা গেল না।
থমথমে নিস্তব্ধ হলঘরে সমবেদনা ও সহানুভূতির অনুকণা ভেসে বেড়াচ্ছিল, তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল ঘন ধূপের গন্ধ। সকলে অপেক্ষা করছিলেন। সেই অপেক্ষাকাতর মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে সত্যসুন্দরের গলার কাছটা জ্বালা করতে লাগল। উপহারের ছোট বাক্সটা গাঁটসর্বস্ব আঙুলের প্রাণান্ত বাঁধনে আঁকড়ে ধরে সত্যসুন্দর উঠে দাঁড়ালেন। হাতজোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে তিনদিকে ফিরে তিনবার নমস্কার করলেন। তারপর মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেলেন ডক্টর মিত্রের ছবির কাছে। মাথা ঝুঁকিয়ে দীর্ঘ প্রণাম জানিয়ে সোজা হলেন। দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ছবির দিকে ইশারা করে ভাঙা উচ্চারণে বললেন, আমার বাবা!
বাষ্প জমাট বেঁধে সত্যসুন্দরের চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে অশ্রু মোছার চেষ্টা করলেন তিনি। তারপর আবার ফিরে গেলেন মঞ্চে, নিজের চেয়ারের সামনে।
ঘরে উপস্থিত সকলের ওপরে একবার ঝাপসা চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর খসখসে গলায় বললেন, ছেলেবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। ডক্টর মিত্রের পাড়ার ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ করতাম। তখন বয়েস কত হবে, পনেরো। মিত্র সাহেব একদিন আমাকে বললেন, সতু, নতুন কলেজ হচ্ছে। তোমাকে সেখানে চাকরি করতে হবে। তুমি হবে ইনস্ট্রমেন্ট মেকানিক। ডক্টর মিত্রকে আমি বাবার মতো দেখতাম। বুঝলাম, তিনি যা করবেন তাতে আমার ভালোই হবে। তাই ওই দেবতার কথায় রাজি হয়েছিলাম। পনেরো বছর বয়েসে ঢুকে পড়লাম এই কলেজে। আজ পঁয়তাল্লিশ বছর চাকরির পর বিদায় নিচ্ছি।
মানব মজুমদার মন্তব্য করলেন, বাঁচা গেল! নইলে ল্যাবরেটরির মালপত্রের হিসেব রাখতে রাখতে আমার জান কয়লা হয়ে যেত, দীপক।
দীপক বোধহয় অন্যমনস্ক ছিল। তাই অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে উঠলো, সত্যদা পঁয়তাল্লিশ বছর চাকরি করেছে। শুনলে বিশ্বাসই হতে চায় না।
তাতে বিরক্ত হয়ে মানব মজুমদার বললেন, কথায় কথায় অবাক হওয়াটা আজকের যুবকদের একটা রোগ। তুমি জানো, সতুর আসল বয়েস কত? চৌষট্টি বছর। সে আমলে তো আর বার্থ সার্টিফিকেটের চল ছিল না। যে বয়েস কলেজের খাতায় লেখাবে সেটাই থেকে যাবে। তা এই চার বছর এক্সট্রা চাকরি করে লোকটা কত টাকা সরকারকে ঠকাল বলো তো? প্রায় সত্তর হাজার টাকা! একি মুখের কথা।
দীপক প্রতিবাদ করতে গিয়েও চুপ করে গেল। কারণ ওর মনে পড়ে গেছে, ওর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার সার্টিফিকেটে যে বয়েস লেখা আছে সেটা আসল বয়েসের চেয়ে দেড় বছর কমানো। তার মানে রিটায়ারমেন্টের সময় ও সরকারকে হাজার তিরিশেক টাকা ঠকাবে? কথাটা ভাবতেই কেমন খারাপ লাগল। পাশে বসা মানব মজুমদারকে ও দেখতে লাগল। ওঁর সার্টিফিকেটে কত বছর কমানো আছে কে জানে!
সরকারকে ঠকিয়ে সত্তর হাজার টাকা আত্মসাৎ করা লোকটা তখন বলে চলেছে, এই কলেজের জন্যে আমি রক্ত দিয়েছি। কথার কথা নয়, সত্যিকারের রক্ত। কারণ কলেজের সমস্ত ওয়্যারিং আমি নিজেই করেছিলাম। তখন হাতে তার ফুটে গিয়ে দু-দিন রক্ত বেরিয়েছিল। ওই মহাপুরুষ ডক্টর মিত্র বলতেন, সতু, এ তোমার নিজের ঘর-বাড়ি। এর কোথাও যেন কোনও কিছুর খামতি না থাকে লক্ষ রেখো। দিন-রাত তিনি থাকতেন আমার পাশে পাশে। সবসময় উৎসাহ দিতেন। তখন তো কলেজে এত লোকজন ছিল না। সব মিলিয়ে আমরা ছিলাম সাতজন।
সমাদ্দার যেন সত্যসুন্দরের কথাগুলো আর সহ্য করতে পারছিলেন না। চাপা গলায় বিষ ঢাললেন, দু-ফোঁটা রক্ত দিয়ে পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে কলেজের রক্ত চুষে গেছে। এস. কে. মিত্তিরকে মা-বাপ করেই যা পেরেছে লুটেপুটে খেয়েছে।
নবীন সরকার সামান্য মুখ ঘুরিয়ে সমাদ্দারকে একবার দেখলেন শুধু। কিছু বললেন না। তাতে সমাদ্দার কিছুটা সাফাইয়ের সুরে বললেন, না স্যার, প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপালকে দেবতা বানিয়ে অন্যান্য প্রিন্সিপালদের ছোট করার চেষ্টা ঠিক নয়।
নবীন সরকারকে তা সত্ত্বেও নীরব দেখে সমাদ্দার চুপ করে গেলেন। ওপাশ থেকে পাত্র চকিতে দুজনকেই দেখে নিলেন।
আজ আমার জীবনে কোনও অভাব নেই। নিজের কারখানা আছে, কলকাতার বুকে ছোট্ট একটা বাড়িও করেছি। ভালো-ভালো ঘরে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি–আর কী চাই? তবে এসবই মহাপুরুষ ডক্টর মিত্র ছবির দিকে তাকিয়ে কপালে হাত ঠেকালেন সত্যসুন্দর আর আপনাদের সকলকার আশীর্বাদে। পঁয়তাল্লিশ বছরে আমার সহকর্মীদের যে-ভালোবাসা পেয়েছি তা ভোলবার নয়। আমি অশিক্ষক কর্মচারী–অশিক্ষিতও বটে। কিন্তু মাস্টারমশাইয়েরা কখনও আমার সঙ্গে ওপরওয়ালা হয়ে ব্যবহার করেননি। আমার পিতা মিত্ৰসাহেবের কাছেই আমি যা কিছু শিখেছি। উনি বলতেন, সতু, সব কিছুর পিছনে একটা কেন আছে। সেটাকে জানতে শেখ। যন্ত্রপাতি খারাপ করে ফেললে উনি কখনও রাগ করতেন না। বলতেন, খারাপ কেন হল সেটা আগে জানো, বোঝো– তারপর নিজেই যন্ত্রটা সারাও। তা হলে আর কখনও খারাপ হলেই সর্বনাশ এ-ভয় মনে থাকবে না। দক্ষ কারিগর বলে আপনারা আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন তা আমরণ মাথায় করে রাখব…
