রাস্তার দিকে চোখ রেখেই মেয়েটি বলল, ‘থ্যাংকস ফর সেভিং মাই লাইফ।’ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তারপর: ‘আমার নাম তিতলি। আপনার?’
‘বিশ্বনাথ। আপনাকে ওরা অ্যাটাক করেছিল কেন?’
‘সে অনেক ব্যাপার—পরে কখনও বলব।’ হঠাৎ বিশ্বনাথের জামার দিকে নজর গেল তিতলির: ‘আরে! আপনার জামাটা তো রক্তে ভিজে গেছে! শিগগির নার্সিংহোমে চলুন—একটা ব্যান্ডেজ-ফ্যান্ডেজ বেঁধে না দিলে…।’
বিশ্বনাথ সামান্য কাত হয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করলেন। রুমালটা বাঁ-হাতে নিয়ে বুকে চেপে ধরলেন। চাপা শান্ত গলায় বললেন, ‘না, না, সেরকম কিছু হয়নি। জাস্ট একটু চিরে গেছে।’
কাটা জায়গাটা এখন বেশ চিড়বিড়-চিড়বিড় করছিল। ছুরিটা ধারালো হওয়ায় প্রথমটা কিছু টের পাননি। তবে জ্বালাটা সহ্য করতে খুব একটা অসুবিধে হচ্ছিল না। পুরোনো জীবন হলে এই জ্বালাই হয়তো অসহ্য ঠেকত। তা ছাড়া বিশ্বনাথ জানেন, এই কাটা-ছেঁড়া নিয়ে নার্সিংহোমে যাওয়া মানেই সিক্রেট পুলিশকে নেমন্তন্ন করা।
‘শিয়োর আপনার কষ্ট হচ্ছে না?’ তিতলি উদ্বেগের গলায় জানতে চাইল আবার।
‘উঁহু। একদম না…।’
তিতলি সন্দেহের চোখে কয়েক পলক বিশ্বনাথের দিকে চেয়ে রইল।
তিতলির ফরসা মুখের ওপরে রাস্তার আলো পড়ছিল, সরে যাচ্ছিল। বিশ্বনাথ ওকে খুঁটিয়ে দেখলেন।
বয়সে কুড়ি কি বাইশ। গোল টলটলে মুখ। মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত—মাথা নাড়লেই এপাশ-ওপাশ নড়ছে। চুলের একটা পাশ বোধহয় সোনালি রং করা।
তিতলির গলায় ফ্লুওরেসেন্ট পুঁতির মালা—আধো-আঁধারিতে লাল-নীল-সবুজ রং জ্বলছে। কানে একই ধরনের দুল। গায়ে কালো পোশাক। কবজিতে প্লাটিনামের ব্রেসলেট আর ঘড়ি। ডানহাতের আঙুলে পাশাপাশি একইরকম দুটো আংটি।
উইন্ডশিল্ডের সামনের তাকে রাখা ছিল একটা পারফিউমের শিশি। সেটা বাঁ-হাতে তুলে নিল তিতলি। ‘শ-শ-শ’ শব্দ করে নিজের গায়ে পারফিউম স্প্রে করল। তারপর সামনের রাস্তার দিকে আড়াচোখে নজর রেখে দেখল বিশ্বনাথের দিকে: ‘পারফিউম নেবেন?’
বিশ্বনাথ হকচকিয়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি বললেন, ‘না—না।’ পারফিউমের কড়া গন্ধে বিশ্বনাথের অস্বস্তি হচ্ছিল।
‘ওইরকম তিনটে ইয়াংম্যানের সঙ্গে এরকম ম্যাজিকের মতো লড়ে গেলেন কেমন করে?’
ওর কথাতেই জবাব দিলেন বিশ্বনাথ, ‘সে অনেক ব্যাপার—পরে কখনও বলব।’
পারফিউমের শিশিটা তাকে ফিরিয়ে দিল তিতলি: ‘চমৎকার। আমার কথায় আমাকেই দিলেন!’
‘আমার দেওয়ার মতো কিছু নেই—।’
‘তা হলে কি শুধু নেওয়া বাকি?’
‘সেটাই বা পারছি কই?’
হেসে ফেলল, তিতলি: ‘আপনার কথাবার্তা বেশ ইন্টারেস্টিং। আপনার সঙ্গে আমার জমবে।’
বিশ্বনাথ ওর কথা বুঝতে পারলেন না। অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
‘আপনি কি ভি-স্টিং প্রোভাইডার?’ আচমকা প্রশ্ন করল তিতলি।
‘হ্যাঁ—, এক সেকেন্ড সময় নিয়ে স্পষ্ট জবাব দিলেন বিশ্বনাথ। মেয়েটা তা হলে লড়াইয়ের সময় বিশ্বনাথকে ভালোভাবেই লক্ষ করেছে।
‘আমি আগে কখনও কনভার্টেড ভ্যাম্পায়ার দেখিনি। আমার এক বন্ধু বাইট নেয়—আমি কখনও নিইনি। একবার চেখে দেখলে হয়!’
‘নেশা করা খারাপ…।’
‘এটা কি বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ?’ ব্যঙ্গের সুরে কথাটা বলে খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ল তিতলি।
একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘নেশা করা খারাপ তো সো হোয়াট? আমার এই লাইফটাও তো খারাপ। যদিও তার জন্যে কোনও স্ট্যাটিউটরি ওয়ার্নিং দেওয়া ছিল না…।’
মেয়েটার লাইফটা খারাপ?
বিশ্বনাথ নিজের জীবনের কথা ভাবলেন—রেণুকণা চলে যাওয়ার পরের জীবনের কথা। সেটাকে মোটেই ভালো বলা যায় না। বরং ডক্টর মালাকারের দেওয়া এই নতুন জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে খারাপ লাগছে না।
‘আপনাকে কোথায় নামাব?’
‘যেখানে খুশি। তবে থাকি শ্যামবাজারে—নিউ টাউন, ফেস ফোর-এ।’
ব্রেকে চাপ দিল তিতলি, গাড়ির মুখ ঘোরাল: ‘চলুন, শ্যামবাজারেই আপনাকে নামিয়ে দিই। আমার হাতে কোনও কাজ নেই…।’
‘থ্যাংকস।’
‘আশ্চর্য।’ ভুরু উঁচিয়ে তাকাল: আপনি আমার জীবনদাতা—আর বলছেন ”থ্যাংকস”!’
‘অভ্যেস সহজে মরতে চায় না।’ বুকের জ্বালাটা হঠাৎ খোঁচা দিল। বিশ্বনাথ যন্ত্রণায় চোখ বুজলেন একবার।
‘আমি কোথায় থাকি জিগ্যেস করলেন না তো?’
‘আমার বয়েস বাষট্টি। ছাব্বিশ হলে জিগ্যেস করতাম—।’
খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ল তিতলি। সে-হাসি আর থামতেই চায় না।
বিশ্বনাথ চুপ করে ওকে দেখতে লাগলেন।
‘ওঃ, আপনি তো দারুণ কথা বলেন! বাষট্টি উলটো ছাব্বিশ…’ হাসির দমকে হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল তিতলি, ‘এনিওয়ে, আমি থাকি লালা লাজপত রায় সরণিতে। আর আমার বয়েস বাইশ—ওলটালেও একই থাকে।’
‘এত রাতে চৌরঙ্গিতে কী করছিলেন?’ কৌতূহল বিশ্বনাথকে কাঁটা ফোটাচ্ছিল।
‘সেসব কথা পরে হবে—’ মাথা ঝাঁকিয়ে চুল ওড়াল তিতলি: ‘দিন, আপনার ফোন নাম্বার দিন।’
‘আমার পারসোনাল কোনও ফোন নেই।’
তিতলি এক মুহূর্ত অবাক হয়ে তাকাল বিশ্বনাথের দিকে। তারপর সহজভাবে বলল, ‘তা হলে আমার মোবাইল নম্বরটা লিখে নিন—।’
বিশ্বনাথের কাছে কাগজ-পেন ছিল না। তাই রাস্তার ধারে গাড়ি সাইড করল তিতলি। গাড়ির গ্লোভ কম্পার্টমেন্ট থেকে পেন আর কাগজ বের করে রাস্তার আলোতেই ফোন নম্বর লিখে দিল।
কাগজের টুকরোটা বিশ্বনাথের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘ফোন করবেন কিন্তু।’
