ঘরের সর্বশেষ সারিতে বসা বয়স্ক অধ্যাপক মানব মজুমদার পাশে বসা তরুণ অধ্যাপক দীপক রায়চৌধুরিকে চাপা গলায় বললেন, আজ প্রিয় কমরেড সত্যসুন্দর দাস! যদ্দিন ছিল তদ্দিন তো ওর সঙ্গেও অনঙ্গ বখরা নিয়ে খেয়োখেয়ি করে মরেছে!
দীপক বলল, আর সত্যদাই বা দেবে কেন? অনঙ্গ তো দিনরাত্তির ইউনিয়নের নাম করে ফাঁকি মারে, কাজটা করে আর কখন? আরে বাবা, কাজ না করলে কখনও বখরা পাওয়া যায়। বখরাও যে কষ্ট করে আয় করার জিনিস।
মানব মজুমদার হাসলেন। তাঁর নাকের দুপাশে ভাঁজ প্রকট হল। তিনি এখন সোজা অনঙ্গর দিকে তাকিয়ে। অনঙ্গ তখন বলছেন, এই প্রিয় সতুদাকে নিয়ে আজ যে-অনুষ্ঠান, আমি সেই অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে আমাদের কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক নবীন সরকারের নাম প্রস্তাব করছি।
প্রথম সারি থেকে কয়েকটি স্বর মিলিতভাবে বলে উঠল, আমরা এই প্রস্তাব সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করছি।
আর বিশেষ অতিথি হিসেবে আমি আমাদেরই প্রাক্তন সহকর্মী কমরেড শ্রীশচীদুলাল কর্মকারের নাম প্রস্তাব করছি।
আবার একইরকম সর্বান্তঃকরণ-সমর্থন পাওয়া গেল প্রথম সারি থেকে। সেই সঙ্গে কিঞ্চিৎ হাততালিও।
একটু পরেই অনঙ্গ নেমে এলেন। শচীদুলালকে সঙ্গী করে এগিয়ে এলেন সরকার সাহেবের দিকে। সরকার সাহেব সভাপতি হওয়ার জন্য অপ্রস্তুত ছিলেন না, সুতরাং, ওঁরা কাছাকাছি এসে পড়ার আগেই বেঞ্চির আসন ছেড়ে উনি বেরিয়ে এলেন বাইরে। তাকে পথ ছেড়ে দিতে সমাদ্দারকেও বাইরে বেরোতে হয়েছিল। ডক্টর সরকার মঞ্চের দিকে এগোতেই সমাদ্দার ফিরে এসে বসলেন পাত্রের পাশে। পরস্পরের চোখাচোখি হল ক্ষণিকের জন্য।
মঞ্চে উঠে সত্যসুন্দরের পাশের চেয়ারটিতে বসলেন ডক্টর সরকার। তার পাশে খালি চেয়ারটিতে বসিয়ে দেওয়া হল শচীদুলালকে। তারপর অনঙ্গ বললেন, সভাপতি হিসেবে মাননীয় ডক্টর সরকারকে আমি কিছু বলতে অনুরোধ করছি
অনঙ্গ নস্কর এবার নিজের আসনে ফিরে গেলেন। সভাপতির ভাষণ শুরু হল।
হলঘরের তিনটে কাচের জানলা। সেগুলো বন্ধ ছিল। কিন্তু দুটো শার্সি ভাঙা থাকায় শীতের হাওয়া ঢুকে পড়ছিল ঘরের মধ্যে। তা ছাড়া একটা কাক এসে বসে পড়েছে ভাঙা জানলার ফ্রেমে। এই কাকটি কলেজ এলাকার বাসিন্দা এবং বিশেষ করে এই ভাঙা জানলাটার প্রতি তার আশ্চর্য টান আছে। ছাত্রছাত্রীরা জানে, ক্লাস চলাকালীনও কাকটি প্রায়শই এসে বসে থাকে। ফলে তারা ঠাট্টা করে বলে, কাকটা হায়ার সেকেন্ডারি পাস। বিএসসি-র ক্লাস করতে এসেছে। সুখের ও স্বস্তির ব্যাপার, কাকটি জানলার বসে মোটেও ডাকাডাকি করে না। চুপটি করে মানুষের কথা শোনে।
নবীন সরকারের চশমা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি তখন বলতে শুরু করলেন ।
সত্যসুন্দরবাবুর পরিচয় আজ আর নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। শুধু বলতে পারি, কলেজের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ একটি খুঁটি সরে গেল। আমাদের ল্যাবরেটরির সমস্ত যন্ত্রপাতি সত্যবাবুর তত্ত্বাবধানে যেরকম সুস্থ ও সবল ছিল তা নিছক নজির হয়ে থাকবে এখন থেকে। তার মতো দক্ষ মেকানিক আমি এর আগে কখনও দেখিনি। তা ছাড়া এই কলেজকে উনি নিজের সংসারের মতো আন্তরিক চোখে দেখতেন। সবসময় বলতেন…।
অশিক্ষক কর্মচারীরা অভিভূত হয়ে বক্তৃতা শুনছিলেন।
তাদের পিছনের সারিতে বসা ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহী চোখে প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে। ওরা অল্প-চেনা সত্যদা সম্পর্কে অনেক নতুন-নতুন ঘটনা আজ জানতে পারছে। শ্রদ্ধায় দ্রব হয়ে আসছে। ওদের সুকুমার মন।
কিন্তু একেবারে পিছনের সারিতে ছবিটা অন্যরকম ছিল।
সমাদ্দার চাপা হাসলেন। তাতে অধ্যাপক পাত্র প্রশ্ন করলেন, হাসলেন কেন?
জানেন না, কেন হাসছি! সত্যকে বেলা দুটোর পর কদিন কলেজ চত্বরে পাওয়া গেছে। বলতে পারেন? আমাদের ল্যাবরেটরি থেকেই মাল ঝেড়ে-ঝেড়ে ও নিজের বাড়িতে একটা ইনমেন্ট ওয়ার্কশপ খুলেছেনাকি এ-খবরও রাখেন না?
পাত্র কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, সে কী! ল্যাবরেটরির মালপত্রের কোনও হিসেব নেই? যদি সত্য ধরা পড়ত, তা হলে তো ওর চাকরি নিয়ে টানাটানি হত!
সমাদ্দার ধূর্ত হাসলেন। বললেন, আচ্ছা ভালোমানুষ মশাই আপনি! সরকারি কলেজে আবার মালপত্রের হিসেব থাকে না কী? আর এখানে কে-ই বা ধরা পড়ে, কে-ই বা কার চাকরি খায়। কিছুই বোঝেন না! ওই জন্যেই আপনার ইনক্রিমেন্ট অ্যাদ্দিন ধরে ঝুলে রয়েছে।
নিজের অজ্ঞতায় পাত্র লজ্জা পেলেন। কেমন একটা ভক্ত-ভক্ত ভাব করে তাকালেন প্রভু সমাদ্দারের দিকে। বললেন, সত্যি, আপনি বেশ খবর-টবর রাখেন।
সমাদ্দার হাসলেন। তার পোকায় খাওয়া একজোড়া কষদাঁত দেখা গেল। অবশেষে গলার স্বর নামিয়ে এনে বললেন, সত্যর একটা কালো তাপ্লিমারা ফোলিও ব্যাগ ছিল দেখেননি? ওর ভেতরে থাকত যন্ত্র সারানোর যন্ত্রপাতি। দুটোর পরই ব্যাগ নিয়ে সত্য বেরিয়ে পড়ত। ঘুরে-ঘুরে বিভিন্ন জায়গায় ইনস্ট্রমেন্ট সারাত, নয়তো সারানোর কন্ট্রাক্ট ধরত। ওঃ, প্রচণ্ড ধড়িবাজ!
…সত্যবাবুর আর একটা বড় অ্যাচিভমেন্ট হল, উনি এই কলেজের প্রতিষ্ঠা থেকেই চাকরিতে যোগ দেন, এবং আজ ষাট বছর বয়েসে অবসর নিচ্ছেন। আমাদের কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপাল ডক্টর এস. কে. মিত্র নিজে সত্যবাবুকে এই কলেজে নিয়ে আসেন, নিজের হাতে তাকে কাজ শিখিয়েছেন। সত্যবাবুর কাছ থেকেই এসব কথা আমি শুনেছি।
