কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডক্টর সরকার আবার বললেন, খুব খারাপ লাগছে যে আজ উনি অবসর নিচ্ছেন। ফেয়ারওয়েল কথাটা শুনলেই মনে হয় সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়ার অনুষ্ঠান। কিন্তু আমি সে-অর্থকে সত্যি বলে মনে করি না। সত্যবাবুকে আমি বলতে চাই, একলেজ তার নিজের কলেজ। উনি যেন কোনওমতেই কলেজের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিন্ন না করেন। আমরা আশা করব, শচীবাবুর মতো উনিও আমাদের আপনার জন মনে করে বরাবর পাশে-পাশে থাকবেন। সত্যবাবুকে আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।
শচীদুলাল মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিলেন। সত্যর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে ভেদাভেদের পাঁচিল তোলা শুরু হল। তবে এরপর সত্য তাঁর মতো কলেজে আসবে না। শচীদুলাল কদিন আগে ওকে জিগ্যেস করেছিলেন। ও বলেছিল, কী করে আসব, শচীদা! আমার কারখানা রয়েছে, নাতি-নাতনি রয়েছে, বড় মেয়েটার বাচ্চা হবে, বাড়ি এয়েছে। না, আমার আসা হবে না।
শচীদুলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার কারখানা নেই। ছেলেরা ভিন্ন হয়ে গেছে, অতএব নাতি-নাতনিও কাছে নেই। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন জব্বলপুরে। সে শুধু চিঠি লেখে। শচীদুলালের স্ত্রী আছে, পেনশনের টাকা আছে, আর কলেজ আছে। কলেজটাই বেশি করে আছে।
ডক্টর সরকার বক্তৃতা শেষ করে বসতে যাচ্ছিলেন, তক্ষুনি একটা গোড়ে মালা হাতে অনঙ্গ প্রায় ছুটে এলেন তাঁর কাছে। চাপা গলায় কী যেন বললেন। তারপর মালাটা সরকার সাহেবের হাতে ধরিয়ে অনঙ্গ নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন। সরকার সাহেব মালাটা নিয়ে সত্যসুন্দরের গলায় পরিয়ে দিলেন। হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন সত্যসুন্দর। সরকার সাহেব তাঁকে কাঁধে হাত রেখে বসতে বললেন। হলঘরে হাততালির বন্যা বয়ে গেল। ডক্টর সমাদ্দারও হাসিমুখে হাততালি দিলেন।
সত্যসুন্দরের চোখের কোল ভিজে উঠেছে। রুদ্ধস্বরে কোনওরকমে উচ্চারণ করলেন, স্যার, আমি কয়টা কথা বলতে চাই।
ডক্টর সরকার কাঁধে হাত চাপড়ে নরম গলায় বললেন, বলবেন, আগে শচীবাবুর বলা হোক, তারপর।
অনঙ্গ নস্কর উঠে এসে দুটো ফুলের তোড়া নিয়ে তুলে দিলেন শচীদুলালের হাতে।
শচীদুলাল তোড়া দুটো সত্যসুন্দরের হাতে দিলেন। সত্যসুন্দর উঠে দাঁড়িয়ে সামান্য ঝুঁকে সে-দুটো গ্রহণ করলেন। নামিয়ে রাখলেন সামনে, টেবিলের ওপরে। গলার মালাটাও খুলে ফেললেন, রাখলেন তোড়ার পাশে।
ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট নরপতি আর লাইব্রেরি অ্যাসিস্ট্যান্ট হরিশঙ্কর আসন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। একজন নতুন ধূপের গোছা সতর্ক হাতে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল, আর অন্যজন নানান তদারকিতে মনোযোগ দিয়েছে। এই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কমবয়েসি এই দুটি ছেলে কম দৌড়ঝাঁপ করেনি। অনঙ্গ নস্কর কাছে আসতেই হরিশঙ্কর চাপাগলায় জিগ্যেস করল, অনঙ্গদা, প্রেজেন্টেশানটা কখন দেবেন?
শচীদার বলা শেষ হলেই দেওয়া হবে।
সত্যকে আমি তেইশ বছর ধরে দেখছি..শচীদুলালের ভরাট কণ্ঠ হলঘরের আনাচে-কানাচে বিদ্ধ হয়ে গেল অনায়াসে। ভাঙা জানলায় নিশ্চুপ কাকটি হঠাৎই নড়েচড়ে বসল। একজন ছাত্র হাত বাড়িয়ে দুবার হুস-হুঁস করল, কিন্তু কাকটি সে তাড়ানিকে কোনও আমলই দিল না।
…সতুর মতো বিনয়ী, সৎ, কর্মঠ মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। গ্যাসট্রিকের গোলমালে মরো-মরো অবস্থায় আমাকে হাসপাতালে ভরতি হতে হয়। তখন এই সতু সত্যসুন্দরের দিকে আঙুল দেখালেন শচীদুলাল, এই সতু তিন-তিনটে রাত আমার বেডের পাশে জেগে বসেছিল। তাতে আমার মনের জোর এত বেড়ে গিয়েছিল যে নিশ্চিত জানতাম আমি বেঁচে উঠব। ওর সেই ঋণ আমি কোনদিনও শুধতে পারব না। না, শুধতে চাইও না। কারণ, কারও কারও কাছে ঋণী থাকার এক অদ্ভুত আনন্দ আছে। আমার মনে পড়ে…।
সত্যসুন্দর মাথা নীচু করে শুনতে লাগলেন। তার বুকের ভেতরে হঠাৎই নির্মম কষ্ট হচ্ছিল। শ্বাসনালীটা যেন আগাপাশতলা ভরতি হয়ে গেছে নোনা জলে। শচীদুলালের আন্তরিক কথাগুলো এক অপূর্ব সম্মোহনপাশে বেঁধে ফেলতে লাগল ঘরের প্রতিটি শ্রোতাকে। সত্যসুন্দরও যেন নতুন করে জানতে পারছেন নিজেকে। কেমন এক সঙ্কোচ, লজ্জা ও পাপবোধ তাঁকে অনুক্ষণ বিব্রত করতে শুরু করল। শচীদা বড় বাড়াবাড়ি করছে। ধূপের সুতীব্র গন্ধ সত্যসুন্দরের সর্দিরা নাকেও ঢুকে পড়ছিল। শীতের হাওয়া কখনও কখনও আঁচড় কাটছে তাঁর রুক্ষ ত্বকে। সত্যসুন্দরের ঝিমুনি আসছিল ক্রমশ।
পিছনের সারিতে অধ্যাপক মানব মজুমদার দীপকের উরুতে টোকা মারলেন। দীপক একমনে শচীদুলালের বক্তব্য শুনছিল, টোকার স্পর্শে ফিরে তাকাল। চোখে নীরব প্রশ্ন। মানব মজুমদার প্রায় ফিসফিসে গলায় বললেন, শচীর অসুখের সময় ওকে দেখতে যাওয়ার নাম করে সতু পাঁচ-ছ দিন সই করেই কেটে পড়েছিল। আর এখন তো শুনলে, ব্যাটা মাত্র তিন রাত্তির জেগেছিল।
আশপাশের আরও কয়েকজন মাস্টারমশাই কৌতূহলী হয়ে মানব মজুমদারের কথা শুনছিলেন। তাঁরা সকলেই মুচকি হেসে উঠলেন।
পিছনের সারির চাঞ্চল্য অনেকক্ষণ ধরেই শচীদুলালের নজরে পড়ছিল। ফলে এক অচেনা অস্বস্তি তার মনের ভেতরে জন্ম নিচ্ছিল। ওই চাঞ্চল্যের কারণ কি শচীদুলাল আঁচ করতে পারছেন না? ব্যাপারটা সত্যসুন্দরের নজরও এড়িয়েছে বলে মনে হয় না। এরকম একটা মানবিক অনুষ্ঠানে এ-ধরনের অমনোযোগ বেশ দৃষ্টিকটু। শচীদুলাল নিজের বক্তব্যের শেষ অংশটুকু গুছিয়ে নিচ্ছিলেন মনে-মনে। অস্বস্তিটুকু ঝেড়ে ফেলে সেটাই বলতে লাগলেন তিনি।
