চেয়ার-টেবিল-পাটাতন ইত্যাদি থেকে কিছুটা তফাতে আরও দুটি চেয়ার দাঁড় করানো রয়েছে। তার একটিতে সযত্নে রাখা আছে দুটি ফুলের তোড়া, একটি রজনীগন্ধার গোড়ে মালা এবং একগুচ্ছ জ্বলন্ত সুগন্ধি ধূপ। বাকি চেয়ারটিতে একটি কাচে বাঁধানো তৈলচিত্র ঋজুভাবে দাঁড়িয়ে। চিত্রের ব্যক্তি এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপাল ডক্টর এস. কে. মিত্র। চোদ্দো বছর হল উনি মারা গেছেন। কিন্তু তারপর থেকে কলেজের লঘুগুরু যে-কোনও অনুষ্ঠানে ডক্টর মিত্রের আবক্ষ চিত্রটি সর্বদাই উপস্থিত থেকেছে। এ ঘটনায় অনুমান হতে পারে তিনি সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র ছিলেন। এবং এ-অনুমান পুরোপুরি সত্যি।
ডক্টর মিত্রের ছবিতে আন্তরিকতার সঙ্গে মালা পরিয়ে দিচ্ছিলেন শচীদুলাল কর্মকার। লম্বা শক্ত দেহের কাঠামো। মাথার চুল ও গোঁফের রং ধবধবে সাদা। বাষট্টি বসন্ত পেরিয়ে গেছেন। শচীদুলাল, কিন্তু তার মধ্যে যে-কোনও একটি বসন্ত তার মাঝারি ফরসা মুখে স্মৃতিচিহ্ন রেখে গেছে। শচীদুলাল দু-বছর আগেই রিটায়ার করেছেন, কিন্তু কলেজে এখনও নিয়মিত আসেন, অফিসের কাজকর্ম দেখেন। বাড়িতে তার নাকি সময় কাটতে চায় না। হেসে বলেন, ঘানির বলদের কাধ থেকে যদি জোয়াল খুলে ছেড়ে দেন, দেখবেন তখনও ব্যাটা গোল হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমরা হলুম গে সেইরকম। রিটায়ার্ড হয়েও টায়ার্ড হই না।
ডক্টর মিত্রের ছবিতে মালা পরানো শেষ করে আরও কয়েকটা ধূপকাঠি জ্বেলে দিলেন শচীদুলাল। তার মনে পড়ছিল নিজের ফেয়ারওয়েলের দিনটা। তারপর থেকে রোজই কলেজে আসেন অথচ কোথায় যেন একটা তাল কেটে গেছে। ফেয়ারওয়েলের দিনটা শাসনের চোখে তার দিকে তাকায়। নিত্য অফিসসংক্রান্ত যেসব কাজগুলো তিনি করেন, মনে হয় সেগুলো সবই অনধিকার চর্চা। কিন্তু তা হলেও ভালো লাগে। এ কলেজ থেকে রিটায়ার অনেকেই করেছেন, কিন্তু শচীদুলালের মতো হাজিরার ধারাবাহিকতা কেউ রাখেননি। হয়তো এই কারণেই প্রত্যেক বিদায় সংবর্ধনার অনুষ্ঠানে শচীদুলালের ওপরেই দায়িত্ব পড়ে আয়োজনের প্রধান কর্মকর্তার ভূমিকার। এবং শচীদুলাল তা পালনও করেন সাগ্রহে। যেমন এখন করছেন।
ক্লাস-ঘরের প্রথম সারির বেঞ্চিগুলিতে কলেজের অন্যান্য অশিক্ষক কর্মচারী বসেছেন। তাদের নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন চলেছে। কেউ-কেউ বা সত্যসুন্দরের কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন। যেসব ছাত্রছাত্রী সত্যসুন্দরকে মাত্র কয়েকবছর দেখেছে তারা পিছনের সারিতে বসে আগ্রহ নিয়ে প্রথম সারির আলোচনা শুনতে চেষ্টা করছিল। ঘড়িতে দুটো বেজে কুড়ি মিনিট, অথচ অনুষ্ঠান এখনও শুরুই হল না, এই অভিযোগও করছিল উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের দু-একজন।
ধূপের সাদা ধোঁয়া ক্রমে হলঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছিল। সকলেই তৈরি হচ্ছিলেন শোকতাপসমৃদ্ধ একটি বিদায় সংবর্ধনাসভা প্রত্যক্ষ করার জন্য। চেয়ারে একা বসে থাকা সত্যসুন্দরকে মনে হচ্ছিল পার্ট ভুলে যাওয়া কোনও অসহায় অভিনেতা। এবং পরিচালক এই সঙ্কট-মুহূর্তে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন না তার দিকে।
সামনের সারি থেকে ছোকরা লাইব্রেরি অ্যাসিস্ট্যান্ট হরিশঙ্কর বলে উঠল, শচীদা, শুরু করে দিন।
ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট নরপতি পাশে বসে থাকা লাইব্রেরিয়ান অরুণ সামন্তকে জিগ্যেস করলো, সামন্তদা, প্রেজেন্টেশানের প্যাকেটটা কার কাছে?
অরুণ সামন্ত বললেন, ওই ফুলের তোড়ার পাশে রাখা আছে।
প্রিন্সিপাল ডক্টর নবীন সরকার ও অন্যান্য অধ্যাপক পিছনের দু-সারি বেঞ্চিতে ঘন হয়ে বসেছেন। আজকের অনুষ্ঠান মূলত অশিক্ষক কর্মচারীদের, তাই ওরাই অগ্রণী। অধ্যাপকরা চাঁদা ও উৎসাহ দিয়ে অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতার কাজ করেছেন। সুতরাং অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিত থাকাটাও জরুরি ছিল। তাদের অনেকেই এসেছেন এবং সচেতনভাবেই গৌণভূমিকা নিয়েছেন।
ব্যবস্থাপনার কাজ সেরে শচীদুলালের দীর্ঘ দেহ এগিয়ে এল পিছনের বেঞ্চির দিকে। তার চোখ অধ্যক্ষ নবীন সরকারের চোখে। দু-দিকের বেঞ্চির সারির মাঝের অলিপথ ধরে ডক্টর সরকারের কাছে এসে দাঁড়ালেন শচীদুলাল। সাদা শার্ট, কালো জহরকোট ও ধুতি পরা শরীরটাকে অনেকটা ঝুঁকিয়ে সরকার সাহেবের খুব কাছাকাছি মুখ এনে বললেন, স্যার, তা হলে শুরু করে দিচ্ছি।
নীরব সম্মতি জানালেন ডক্টর সরকার। উনি সাধারণত খুব কম কথা বলেন, তাঁর দু-পাশে বসে থাকা দুই অধ্যাপক, সুরেন পাত্র আর রমেশ সমাদ্দার, হলঘরে হাজির হওয়া ইস্তক ডক্টর সরকারকে নানাভাবে খুশি করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সরকার সাহেবের তরফ থেকে বিশেষ উচ্চবাচ্য শোনায় তারা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না, সরকার সাহেব খুশি হয়েছেন কি না। খুশি হলে সুরেন পাত্রের পাওনা ইনক্রিমেন্টটা যথাশীঘ্র কার্যকরী হবে, এবং রমেশ সমাদ্দার যে দীর্ঘদিন বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন সে-চেষ্টাও সফল হবে কারণ বিদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়েই নবীন সরকারের যথেষ্ট পরিচিতি এবং ওজন আছে।
অশিক্ষক কর্মচারীদের ইউনিয়ন নেতা অনঙ্গ নস্কর প্রথম সারিতে বসেছিলেন। শচীদুলালের সঙ্গে কীসব পরামর্শের পর তিনি বেঞ্চির আসন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। সোজা গিয়ে উঠে দাঁড়ালেন পাটাতনের ওপরে, চেয়ার-টেবিলের ঠিক পাশটিতে। তার মঞ্চে ওঠার সহজ সাবলীল ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় এ-জাতীয় অভ্যাস তার ভালোরকম আছে। ঘরের সিলিং-এর দিকে একপলক তাকিয়ে বাঁ-হাতটি পিছনে রেখে অনঙ্গ নস্কর বলতে শুরু করলেন, সমবেত অধ্যাপকমণ্ডলী, ছাত্রছাত্রীবৃন্দ ও সহকর্মী কমরেডগণ! আজ আমাদের অত্যন্ত দুঃখের দিন। আমাদের প্রিয় কমরেড শ্রীসত্যসুন্দর দাস রিটায়ার করছেন।
