মিসেস সরকার তখনও বাগানে দাঁড়িয়ে গাছের পরিচর্যা করছিলেন।
‘মিস্টার সেন, মিসেস আজ কেমন আছেন?’
মিষ্টি হাসি হাসলেন অতীশ: ‘ভালোই আছেন। আজ একটা ওষুধ দিয়েছি ওঁকে—সেই ব্যথাটার জন্যে।’
‘ওই ব্যথাটার জন্যেই তো ভীষণ কষ্ট পান আপনার মিসেস।’ সহানুভূতির গলয় বললেন মিসেস সরকার।
‘আর কখনও কষ্ট পাবেন না উনি।’ নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন: ‘আচ্ছা চলি।’
‘মা,’ বাচ্চু সরকার বলল ওর মা-কে। ‘এখন ঠিক সাড়ে আটটা বাজে।’
‘বৃথা বিলম্বে কালাতিপাত করিও না।’ টাইপের পদক্ষেপে হনহন করে বাস-স্টপের দিকে হাঁটছিলেন অতীশ সেন। আশপাশের পাড়াপড়শিরা তাঁকে দেখে নিজেদের ছেলেমেয়েদের যে সময়ানুবর্তিতা সম্বন্ধে জ্ঞান দিচ্ছেন, তা তিনি রোজকার মতোই (গত দু-বছর ধরে) বুঝতে পারলেন।
সাড়ে ছ’টায় যখন তিনি ফিরবেন না (গত দু-বছরে এই প্রথম ঘটবে) তখন সবাই সেটাকে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলে মনে করবে।
সাড়ে সাতটা বাজলে সবাই চিন্তিত হয়ে উঠবে।
সাড়ে আটটায় তাঁর বাড়িতে খোঁজ করতে যাবে এবং থানায় ফোন করলে পর সাড়ে ন’টায় পুলিশ এসে পৌঁছবে। ততক্ষণে তিনি হাজার-হাজার মাইল দূরে—পুলিশের নাগালের বাইরে।
এয়ারপোর্টে সিকিওরিটি চেকের জন্য এগোতে যাবেন, এমন সময় পিছন থেকে তাঁর কাঁধে হাত রাখল কেউ। চমকে ফিরে তাকালেন অতীশ।
কঠিন চৌকো চোয়াল। সরু গোঁফ। গালে একটা কাটা দাগ। জোড়া ভুরু। কোট-প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে।
অতীশ আচমকা ঘাবড়ে গিয়ে বোর্ডিং পাসটি ভদ্রলোকের দিকে সাততাড়াতাড়ি এগিয়ে ধরলেন।
উত্তরে ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা আইডেন্টিটি কার্ড বের করলেন। লাউঞ্জের আলোয় কার্ডটা ঝলসে উঠল।
‘মিস্টার সেন, আপনাকে একবার আমার সঙ্গে আসতে হবে। আপনার স্ত্রীর মিস্টিরিয়াস ডেথের ব্যাপারে আপনাকে কয়েকটা কথা জিগ্যেস করার আছে।’
অতীশ সেনের হঠাৎ মনে হল, তাঁর পা দুটো যেন খুঁজে পাচ্ছেন না। ভদ্রলোক হয়তো আরও কিছু বলছিলেন, কিন্তু অতীশের সেসব বোধগম্য হল না। অবশ দেহে টলে পড়ে যাচ্ছিলেন। ইন্সপেক্টর এগিয়ে এসে তাঁকে ধরে ফেললেন।
খানিকটা স্বাভাবিক হওয়ার পর অতীশ প্রশ্ন করলেন, ‘এত—এত—’ তাঁর গলা দিয়ে কাঁসরঘণ্টার ফ্যাঁসফেঁসে আওয়াজ বেরিয়ে এল, ‘এত তাড়াতাড়ি কী করে জানতে পারলেন আপনারা?’ আর কোনও কথা খুঁজে পেলেন না তিনি।
ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর হাসলেন: ‘মিস্টার সেন, আপনি এবং আপনার স্ত্রী—আপনারা দুজনেই পাংচুয়ালিটির সিম্বল ছিলেন। ডেইলি রুটিনে কখখনো এক সেকেন্ডেরও হেরফের হত না আপনাদের।’
‘আমাদের ডেইলি রুটিনে?’ বিড়বিড় করলেন অতীশ, ‘রুবির ডেইলি রুটিনে?’
‘কেন, আপনি জানেন না?’ ভীষণ মজার হাসি হাসলেন অফিসার: ‘আপনার ওয়াইফ ঘড়ি মেপে সব কাজ করতেন। আমরা সব জানতে পেরেছি ওই পুপুর জন্যে!’
অতীশ হাঁ করে চেয়ে রইলেন অফিসারের দিকে। ব্যাপারটার কিছুই তখনও তাঁর মাথায় ঢোকেনি।
অফিসার একটু হেসে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘মিস্টার সেন, পাড়াপড়শিরা আপনাকে দেখে যে ঘড়ি মেলাত, এ-কথা ঠিক। তবে সেটা শুধুমাত্র সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত। তারপর থেকে তাদের কাছে পাংচুয়ালিটির আইডল ছিলেন রুবি সেন। গত দু-বছর ধরে আপনি যেমন ঠিক আটটায় পুপুকে বাড়িতে ঢোকান তেমনি আপনি বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক দশমিনিট পর—অর্থাৎ, কাঁটায়-কাঁটায় সকাল আটটা চল্লিশমিনিটে মিসেস সেন পুপুকে ছুড়ে দিতেন বাইরের লনে—গত দু-বছর ধরেই।
‘এই মজার দৃশ্য দেখে বাচ্চু—মিসেস সরকারের ছেলে—ঠিক আটটা চল্লিশের সময় মজা করে বলে উঠত, মা, দ্য ক্যাট ইজ আউট অফ দ্য ব্যাগ।
‘আজ আটটা পঞ্চাশেও যখন বেড়ালটা বাইরে এল না, তখন ও অবাক হয়ে মা-কে এ- বিষয়ে প্রশ্ন করে। মিসেস সরকার খুবই কৌতূহলী মহিলা। তা ছাড়া তিনি জানতেন, রুবি সেন অসুস্থ। তাই সন্দেহের বশে মিসেস সরকার আপনার বাড়িতে খোঁজ করতে যান। তারপর—’ হেসে ফেলেন অফিসার: ‘মিস্টার সেন, দ্য ক্যাট ইজ নাউ রিয়্যালি আউট অফ দ্য ব্যাগ।’
হতভম্ব অতীশ সেন হাত দুটো এগিয়ে দিলেন ইন্সপেক্টরের দিকে।
বিদায় সংবর্ধনা
সত্যসুন্দরের চোখের কোণে ধীরে-ধীরে বাষ্প জমছিল।
ফুলের মালা, ফুলের তোড়া, ছমছমে ধূপের গন্ধ, সবকিছু ক্রমশ তাকে অভিভূত করে ফেলছিল। নিজের অবাক চোখ দুটোকে বড় হলঘরটার চারপাশে বুলিয়ে নিলেন সত্যসুন্দর। কলেজে এই ঘরটাই সবচেয়ে বড় ক্লাস-ঘর। এখানে পাসকোর্সের ছেলেমেয়েদের ক্লাস হয়। কিন্তু এখন সেই ছেলেমেয়েদের নির্ধারিত বেঞ্চিগুলিতে মাননীয় প্রিন্সিপালসাহেব থেকে শুরু করে দশ-বারোজন অধ্যাপক, জনা বিশ সত্যসুন্দরের সহকর্মী, এবং পাঁচ-ছজন ছাত্র-ছাত্রী বসে আছে। সকলেই প্রগাঢ় ভালোবাসা মাখা আতুর চোখে সত্যসুন্দরকে দেখছে। কারণ আজ কলেজ ল্যাবরেটারির মেকানিক সত্যসুন্দর দাসের বিদায় সংবর্ধনা।
খাটো পাটাতনের ওপরে দাঁড় করানো লম্বা টেবিল। টেবিলের পিছনে তিনটে চেয়ার। বাঁ দিকের চেয়ারে সঙ্কুচিতভাবে বসে রয়েছেন সত্যসুন্দর। বাকি দুটি চেয়ার এখনও খালি। ও-দুটো নির্দিষ্ট রয়েছে সভাপতি এবং বিশেষ অতিথির জন্য।
চেয়ারের সারির পিছনেই কুচকুচে কালো বিশাল ব্ল্যাকবোর্ড। তাতে চকখড়ি দিয়ে নানান অঙ্ক কষা ছিল, কিন্তু মাঝামাঝি অংশটা ডাস্টার দিয়ে মুছে গোটা-গোটা হরফে কেউ লিখে দিয়েছে : ১৭ই নভেম্বর বেলা দুটোয় শ্রীসত্যসুন্দর দাসের ফেয়ারওয়েল।
