ক্রিরি—রি—রিং—।
একটু অবাক হয়ে অতীশ এগিয়ে গেলেন ফোনের দিকে। কিন্তু ফোনের কাছে গিয়েই তিনি যেন একটা শক খেলেন। হৃৎপিণ্ড যেন লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে গলা দিয়ে। না—ফোন নয়!
বাজছে দরজার কলিংবেল!
কে এল এই সময়ে (অথবা অসময়ে!)?
দুরুদুরু বুকে দরজার দিকে এগিয়ে এলেন অতীশ। দরজা খুললেন।
সামনে দাঁড়িয়ে একজন সুবশেধারী যুবক। পরনে কোট, প্যান্ট, টাই—ফিটফাট।
‘কী চাই?’ দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রইলেন অতীশ। যাই হোক না কেন, দরজা থেকে কিছুতেই সরব না। ভাবলেন তিনি।
‘এটাই তো আটাশ নম্বর বাড়ি?’
‘হ্যাঁ।’
অতীশ হঠাৎ খেয়াল করলেন, যুবকের পায়ের কাছে দাঁড় করানো একটা বড় প্যাকেট।
‘মিস্টার সেন তো আপনিই?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমি নাহাটা ডিস্ট্রিবিটার থেকে আসছি। আপনার ওয়াইফ একটা অটোমেটিক প্রেশার কুকারের অর্ডার দিয়েছিলেন, তাই—।’
‘না, না, ওসব কুকার-ফুকার লাগবে না আমাদের।’ দরজা বন্ধ করতে গেলেন অতীশ।
‘মিস্টার সেন, যিনি অর্ডার দিয়েছিলেন, তিনি ক্যান্সেল করলেই আমরা অর্ডারটা ক্যান্সেলড বলে মনে করব, নয়তো নয়। আপনি কাইন্ডলি একবার মিসেস সেনকে খবর পাঠান। আমি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
উঃ—যত জ্বালা। এখন কী করবেন অতীশ?
হঠাৎ খেয়াল হতেই দরজা ছেড়ে ভেতরে এসে রেডিওটা অন করে দিলেন তিনি। আবার ফিরে গেলেন দরজায়।
আটটা একুশ।
‘মিসেস সেন এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি।’ পরমুহূর্তেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলে উঠলেন, ‘উঠেছেন—মানে এখন ব্রেকফাস্টে বসেছেন।’
‘আমি একবার ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ ঘরের ভেতর পা বাড়াল যুবক।
‘দাঁড়ান মশাই! আপনি ভেতরে ঢুকছেন কার হুকুমে?’ উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন অতীশ। নাঃ, রাগলে চলবে না। মনে-মনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলেন। লোকটা সন্দেহ করতে পারে।
‘আমার স্ত্রী কি নিজে আপনাকে অর্ডার দিয়েছিলেন?’ এবার কণ্ঠস্বর যথেষ্ট মোলায়েম।
‘হ্যাঁ।’
তা হলে অতীশ এতদিন যা সন্দেহ করেছেন তাই। তিনি অফিসে চলে গেলে রুবি হেঁটে বেড়াতেন।…না, আর ঝামেলা করা ঠিক হবে না। অফিস (?) যাওয়ার সময় হয়ে এল। সময়ের এতটুকু এদিক-ওদিক হলেই তাঁর কল্পনার স্বর্গ ধুলোয় মিশে যাবে।
‘কত হয়েছে আপনার বিল?’
‘দু-শো আট টাকা ষাট পয়সা।’
একমুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না অতীশ। ছুটলেন শোওয়ার ঘরে। ব্রিফকেস খুলে হাতড়ে বের করলেন একশো টাকার বান্ডিলটা। তিনটে নোট টেনে নিয়ে ব্রিফকেস বন্ধ করে দ্রুতপায়ে নীচে নেমে এলেন। হাঁপাতে-হাঁপাতে নোট তিনটে তুলে দিলেন যুবকটির হাতে।
আটটা বাইশ।
‘আমার কাছে ভাঙানি নেই। আচ্ছা, আমার সঙ্গে আসুন—ওই মোড়ের দোকানটা থেকে ভাঙিয়ে দিচ্ছি।’
অতীশের কানে কেউ যেন গরম সীসে ঢেলে দিল। এ তো দেখছি মহা ঝামেলায় পড়া গেল। আর মাত্র আটমিনিট বাকি!
‘ঠিক আছে, এটা দিন।’ একটা নোট ছিনিয়ে নিলেন অতীশ ‘আমার কাছে অন্য আরও নোট আছে—’ অবাধ্য জিভকে শাসন করে আবার বললেন, ‘মানে, দশটাকার নোটও আছে।’
মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হলেন অতীশ। শোওয়ার ঘরে গিয়ে আবার ব্রিফকেস খুলে পাগলের মতো নোটের গাদা হাতড়াতে লাগলেন। কোথায় গেল দশটাকার বান্ডিলগুলো? এই তো! একটা নোট টেনে নিয়ে প্রায় দৌড়েই ফিরে এলেন দরজায়।
আটটা তেইশ।
‘প্যাকিং আর ডেলিভারি মিলিয়ে পড়ল এক টাকা সাঁইতিরিশ পয়সা। তা হলে মোট হল দু-শো ন’টাকা পচানব্বই পয়সা।’ আপনমনেই হিসেব করতে শুরু করল যুবক: ‘তা হলে আপনি পাবেন পাঁচ পয়সা।’
‘ওটা আপনি রেখেই দিন…আমার দরকার নেই।’ তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন অতীশ।
আটটা চব্বিশ।
‘না, না…এই তো, আমার কাছে একটা পাঁচ পয়সা আছে।’ জামা-প্যান্টের পকেট হাতড়াতে আরম্ভ করল যুবক: ‘কোথায় গেল—’ একটু আগেই তো ছিল পকেটে।’
‘আমার কোনও দরকার নেই। কোনও ভিখিরিকে দিয়ে দেবেন।’ দরজা বন্ধ করতে গেলেন অতীশ। রাগে তাঁর চোখ-মুখ লাল।
হাত দিয়ে বাধা দিল যুবক।
আটটা পঁচিশ।
‘এই তো—এই যে পেয়েছি। নিন।’
হাত বাড়িয়ে পাঁচ পয়সা নিলেন অতীশ। দরজা বন্ধ করলেন। উঃ!
আবার বেল বেজে উঠল! দরজা খুলতেই চোখে পড়ল সেই যুবকের হাসিমুখ।
আটটা ছাব্বিশ।
‘কুকারটা নিতেই আপনি ভুলে গেছেন, মিস্টার সেন।’ প্যাকেটটা এগিয়ে দিল যুবক।
‘ওঃ—কী ভুলো মন আমার। ধন্যবাদ।’
দরজা বন্ধ করে হাঁফ ছাড়লেন অতীশ। খুব জোর বেঁচে গেছেন! মরে গিয়েও রুবি তাঁকে জ্বালাতে ছাড়ছেন না। এই কুকারের অর্ডার দেওয়ার কী দরকরা ছিল?
আটটা সাতাশ।
ঠক—ঠক—ঠক।
তড়িৎস্পৃষ্টের মতো লাফিয়ে উঠলেন অতীশ। কে? কে এল আবার?
দরজা খুলে দাঁড়াতেই রাগে তাঁর সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে সেই যুবক। মুখে কান এঁটো করা হাসি।
‘বিলটা দেওয়ার কথা ভুলেই গেছিলাম। তাই আবার ফিরে এলাম। এই নিন।’
হাত বাড়িয়ে বিলটা নিলেন তিনি। কষ্টকৃত হাসি হেসে দরজা বন্ধ করলেন। কুকারের প্যাকেটের মধ্যে বিলটা গুঁজে দিলেন। তারপর এক-এক লাফে তিনটে করে সিঁড়ি ভেঙে গেলেন দোতলায়। ব্রিফকেসে চাবি এঁটে ওটাকে হাতে নিলেন। রুবির মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নেমে এলেন ড্রইংরুমে। একটুর জন্য আজ বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন।
আটটা উনতিরিশ।
আয়নায় চেহারাটা একবার দেখে তৈরি হলেন। ব্রিফকেস নিয়ে যখন তিনি বাইরের লনে পা দিলেন, তখন ঠিক সাড়ে আটটা বাজতে পনেরো সেকেন্ড বাকি (গত দু-বছরের মতোই)।
