‘না মিসেস সরকার, আপনার ঘড়িই স্লো আছে দু-মিনিট।’
‘সে কি আর আমি জানি না!’ একগাল হাসলেন তিনি: ‘আপনাকে দেখেই তো আমার ঘড়ি মেলাই আমি।’
হঠাৎই সুর পালটে প্রশ্ন করলেন ভদ্রমহিলা, ‘একটু আগে কি আপনার বাড়িতে চেয়ার-টেবিল উলটে পড়েছিল?’
‘না তো! কেন?’
‘না, কেমন যেন একটা শব্দ শুনলাম। তাই—।’
মাই গড! আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছিল? ইস, বালিশটা যদি রুবির মুখে না চেপে, রিভলভারের নলে চাপতাম—।
‘ও, ওটা বাথরুমের দরজার শব্দ। দরজাটা কেমন যেন আটকে গেছিল। তাই জোরে খুলতে গিয়ে—।’
হাতঘড়ির দিকে চোখ পড়ল অতীশের—সাতটা আটতিরিশ। খবরের কাগজ ভাঁজ করে ঘরে ফিরে এলেন তিনি। ঘরে ঢোকার সময় শুনলেন মিসেস সরকারের ছেলে বাচ্চু ওর মা-কে বলছে, ‘মা, এখন ঠিক সাতটা বেজে আটতিরিশ মিনিট—।’
মনে-মনে খুশি হলেন অতীশ। ঠিক এইভাবেই তাঁকে চলতে হবে সাড়ে আটটা পর্যন্ত।
গত একবছর ধরেই অতীশ সন্দেহ করছেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে (সকাল সাড়ে আটটা থেকে সন্ধে সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত) রুবি চলাফেরা করে বেড়াতেন। প্রায়ই দেখতেন, অফিসে যাওয়ার সময় যেটা যেরকম দেখে গেছেন, ফিরে আসার পর ঠিক সেইরকমটি আর নেই। একটু যেন অদলবদল হয়েছে। অথচ রুবি সেই একইভাবে বিছানায় শুয়ে আছেন। বাড়িতে যখন আর কেউ নেই, তা হলে ওগুলো সরাল কে? নিশ্চয়ই রুবি। রুবির চিন্তাকে মগজ থেকে সরিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে গেলেন অতীশ।
সাতটা চল্লিশ।
তিনটে স্যান্ডউইচ বের করলেন ফ্রিজ থেকে। ওঃ, আবার সেই ভুল! মনে-মনে নিজেকে প্রচণ্ড তিরস্কার করলেন অতীশ সেন। তাঁকে ভীষণ সাবধান হতে হবে। তাড়াতাড়ি একটা স্যান্ডউইচ ঢুকিয়ে রাখলেন ফ্রিজে। রোজ এই সময় তিনি দুটো স্যান্ডউইচই খান এবং তৃতীয় একটা নেন রুবির জন্য। গত দু-বছর ধরে তাই করেছেন। সুতরাং অভ্যাসবশে তিনটে স্যান্ডউইচ নিয়ে ফেলেছিলেন।
স্যান্ডউইচ দুটো শেষ করে অত্যন্ত সাবধানে ফ্রিজ থেকে নিজের জন্য একটা (দুটো নয়) ডিম বের করলেন। হিটাদের জল চাপিয়ে তার মধ্যে ডিমটা ছেড়ে দিলেন। হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল, তাড়াতাড়িতে শেভ করতেই ভুলে গেছেন। সর্বনাশ! এরকম উলটোপালটা হলেই মহা বিপদ!
তাড়াতাড়ি ওপরে গিয়ে ব্রিফকেসটা ঘর থেকে বের করে আনলেন (রুবির মৃতদেহের দিকে তাকালেন না অতীশ)। ওটা খুলে টাকার বান্ডিলের নীচ থেকে শেভ করার সাজ-সরঞ্জাম বের করে বাথরুমে ছুটলেন।
শেভ করে ব্রিফকেস আবার গুছিয়ে যখন ডাইনিং রুমে ফিরে এলেন, তখন সাতটা সাতান্ন।
চটপট ডিমটা প্রায় গিলে ফেললেন অতীশ। এরকম ভুল করলে কারও খুন করাই উচিত নয়। এক সেকেন্ডেরও গন্ডগোল তিনি হতে দেবেন না। ঠিক আটটায় পুপুকে সদর দরজা খুলে ঢোকাতে হবে বাড়িতে। রোজকার মতো।
আটটা বেজে এক সেকেন্ড।
তাড়াহুড়ো করে সদর দরজা খুললেন অতীশ। ঠিক পায়ের কাছেই দাঁড়িয়ে বেড়ালটা। দরজা খোলা পেয়ে ওটা ঘরে এসে ঢুকল। অতীশের পায়ে গা ঘষতে লাগল। পুপুকে গত দু-বছর ধরেই আটটায় দরজা খুলে ঘরে ঢোকান অতীশ। ধবধবে লোমের পুঁটলি যেন বেড়ালটা। সুন্দর দেখতে। অথচ রুবি এক্কেবারেই দেখতে পারতেন না ওটাকে। পুপু ছিল ওঁর দু-চক্ষের বিষ! এখন আর কোনও ভয় নেই পুপুর। আপনমনেই হাসলেন অতীশ।
আটটা তিন।
বেড়ালটাকে গত রাতের এঁটো খাবারগুলো রোজকার মতোই খেতে দিলেন অতীশ। তারপর ড্রইংরুমের চেয়ারে বসে জামা-প্যান্ট, জুতো চটপট পরে ফেললেন। এবার খবরের কাগজটা খুলে দেখতে লাগলেন।
আটটা বেজে ন’মিনিট।
ক্রিরি—ং—রি—রি—ং। একটুও চমকালেন না অতীশ। তিনি যেন এতক্ষণ ধরে এই ফোনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। আয়েসী পায়ে এগিয়ে গেলেন ক্র্যাডলের কাছে। তুলে নিলেন রিসিভারটা।
‘হ্যালো—’ গম্ভীর স্বর ভেসে এল ও প্রান্তে থেকে।
‘অতীশ সেন স্পিকিং—’ খুব ঠান্ডা মাথায় কথা বলতে হবে। ভাবলেন অতীশ।
‘আরে, অতীশ…আমি বড়ুয়া বলছি—।’
‘কী, বল।’
‘কী ঠিক করলি? কোথায় যাবি ছুটিতে?’
‘ভাবছি এই দু-সপ্তাহ একটু আশপাশ থেকে ঘুরে আসা যাবে।’ অতীশ দু-সপ্তাহ ছুটি নিয়েছেন অফিস থেকে এবং ছুটির মেয়াদ আজ থেকেই শুরু।
‘মিসেসকে সঙ্গে নিয়ে, না একা?’ বড়ুয়া হেসে জানতে চাইল।
‘তোর তাতে কী দরকার?’ ঠাট্টার সুরে বললেন অতীশ।
‘আচ্ছা—হ্যাভ আ গুড টাইম—’ ফোন রাখার শব্দ শোনা গেল।
রিসিভার নামিয়ে রাখলেন অতীশ সেন। তিনি যে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন, তা পাড়াপড়শিরা কেউই জানে না। ফলে আজও তিনি ঠিক সাড়ে আটটায় বাড়ি থেকে বেরোবেন। আশপাশের সবাই তাঁকে দেখে ঘড়ি মেলাবে। গত দু-বছর ধরে তাই হয়ে আসছে। বাসে করে তিনি অফিসের দিকেই প্রথমে যাবেন। তারপর সেখান থেকে বাসে চড়ে সোজা এয়ারপোর্ট। দশটা একুশে বম্বে যাওয়ার একটা ট্রেন আছে। তাতে চেপে সোজা বম্বে। সেখান থেকে পাঁচটা পঁয়তিরিশের প্লেনটা তাকে ধরতে হবে। গন্তব্যস্থল মাদ্রাজ। বম্বে থেকে যখন তিনি প্লেনে উঠবেন, তখন নাম এবং চেহারা তাঁকে পালটাতে হবে। মাদ্রাজে নেমে নিজেকে লোকের ভিড়ে মিশিয়ে ফেলতে তাঁর এতটুকু অসুবিধে হবে না। তখন কাজে লাগবে রুটির টাকাগুলো। আপনমনেই হাসলেন তিনি।
আটটা সতেরোমিনিট ছ’ সেকেন্ড।
আর দু-মিনিট চুয়ান্ন সেকেন্ড পর তাকে রোজের মতো রেডিও চালাতে হবে।
