কিন্তু আগে মশারিটার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষুনি।
মশারিটাকে প্রাণপণে জাপটে ধরে ছুটে চলে এলাম আমার ঘরে। ড্রয়ার থেকে লাইটার বের করে নিয়ে রওনা দিলাম তেতলার ছাদের দিকে।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় মনে হল, মশারিটা সাপের মতো নড়ছে, আমার হাতের বাঁধন ছাড়ানোর চেষ্টা করছে।
আমি আরও জোরে ওটাকে আঁকড়ে ধরলাম। প্রচণ্ড ভয় থেকে এক অদ্ভুত মরিয়া শক্তি আমার ভেতরে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই শক্তির জোরেই ছাদে এসে পড়লাম।
মশারিটাকে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে সঙ্গে-সঙ্গে লাইটার জ্বেলে ধরলাম ওটার গায়ে।
মশারিটা জ্বলতে শুরু করল।
আমি একটু দূরে সরে গিয়ে হাঁপাতে লাগলাম। দেখতে লাগলাম, একটা অশুভ অলৌকিক শক্তি জ্বলছে, পুড়ছে। কালো আর পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে।
আকাশের চাঁদ-তারা আর রাতের বাতাস এই অন্ত্যেষ্টির সাক্ষী হয়ে রইল।
হঠাৎই এক অদ্ভুত ক্লান্তি আমাকে জড়িয়ে ধরল। তন্দ্রার টানে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে চাইল।
আর ঠিক তখনই আমাকে চমকে দিয়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল কেউ।
‘উঃ! জ্বলে যাচ্ছি…পুড়ে যাচ্ছি…। পেরো, আমাকে বাঁচা! পেরো, প্লিজ, বাঁচা আমাকে…।’
রোহনের গলা আমার কানে গরম সীসে হয়ে ঢুকে পড়ল। আমি দু-কানে আঙুল গুঁজে দিলাম। আতঙ্কে চোখ বুজে ফেললাম।
কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই!
মশারিটা জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে যাক।
বিড়াল
ঘরের দেওয়াল-ঘড়িতে ঠিক সাতটা বেজে সতেরোমিনিট। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ ঠিক তেরোমিনিট আগে ঘুম থেকে উঠেছেন অতীশ সেন। (অর্থাৎ, গত দু-বছর ধরে তিনি ঠিক সাতটা তিরিশমিনিটে ঘুম থেকে উঠেছেন। এই তেরোমিনিটে তাঁকে কতকগুলো কাজ সারতে হবে—জরুরি কাজ।
এক নম্বর, বালিশের তলা থেকে ০.২২ ক্যালিবারের রিভলভারটা বের করা—এবং তিনি তাই করলেন।
দু-নম্বর, রিভলভারের চেম্বার চেক করা…(এবং করলেন)।
এবার লোডেড রিভলভার ডানহাতে নিয়ে বাঁ-হাতে একটা বালিশ টেনে নিলেন অতীশ। এগিয়ে গেলেন রুবির বিছানার দিকে। প্রায় একইসঙ্গে ঘটে গেল দুটো ঘটনা। প্রথম, বালিশ দিয়ে ঘুমন্ত রুবির মুখ চাপা দেওয়া এবং দ্বিতীয়, তৎক্ষণাৎ বালিশের ওপর গুলি করা। ঘড়ির দিকে তাকালেন অতীশ—সাতটা বাইশ।
এমনভাবে তাঁকে কাজগুলো সারতে হবে, যাতে এক সেকেন্ডেরও হেরফের না হয়। রুবির মৃতদেহটা একপাশে ঠেলে দিয়ে ওর তোশকের নীচে হাত ঢোকালেন অতীশ। হ্যাঁ, ঠিক যা ভেবেছেন তাই—থরে-থরে টাকা সাজানো ওর তোশকের নীচে।
রুবিকে বিয়ে করার পর গত দু-বছর ধরে অতীশ শুধু ভেবেছেন এই টাকাগুলোর কথা। নয়তো এ-কথা কে বিশ্বাস করবে যে, শুধুমাত্র প্রেমতাড়িত হয়ে তিনি (অতীশ সেন সুপুরুষ) একটা মোটকা, পঞ্চাশ বছরের বুড়িকে বিয়ে করেছেন?
রুবি সেন খুবই অদ্ভুতভাবে বিয়ের দিনপনেরো পর থেকেই পক্ষাঘাতে কাহিল হয়ে পড়েছেন এবং নিজের বিছানা ছেড়ে আর নড়তেন না—অন্তত যতক্ষণ অতীশ বাড়িতে থাকতেন। প্রথম-প্রথম অতীশ সন্দেহ করেননি, কিন্তু একদিন লক্ষ করলেন যে, রেফ্রিজারেটরে রাখা ডিমগুলো থেকে দুটো ডিম হঠাৎ অদৃশ্য হয়েছে। এ বিষয়ে রুবিকে প্রশ্ন করামাত্রই ওর মুখ পাণ্ডুর হয়ে গেছিল। তখনই অতীশ সন্দেহ করেছিলেন রুবি পক্ষাঘাতে মোটেই কাবু নয়।
তবে কেন এই অভিনয়?
এর উত্তর একটাই হতে পারে। তা হল, ওই বিছানার নীচেই রয়েছে রুবির সমস্ত টাকা—যে-টাকার খবর অতীশ কানাঘুষোয় শুনেছেন।
রুবি কোনওদিনই অতীশকে জানতে দেননি যে, তাঁর টাকা আছে। এবং অতীশও কোনওদিন তাঁকে জানতে দেননি যে, তাঁর টাকার কথা তিনি জানেন। রুবি সেন অতীশের ‘নকল’ ভালোবাসার কথা বিয়ের কিছুদিন পরেই বুঝতে পেরেছিলেন, তাই সবসময় নিজের টাকাকে আগলে রেখেছেন—যখের মতো।
সাতটা সাতাশ।
আর তিনমিনিট। চট করে বাথরুমে গিয়ে শেভ করার সেফটি রেজার, সাবান, ব্রাশ, টুথব্রাশ নিয়ে এলেন অতীশ। একটা ব্রিফকেসে ভরে ফেললেন। তারপর ব্যাগটা বোঝাই করলেন টাকায়—রুবির টাকায়। একশো, দশ, পাঁচ, একটাকার নোটের মোটা-মোটা বান্ডিলগুলো (উত্তরাধিকার সূত্রে রুবি যার মালিক হয়েছে) দেখে অতীশ সন্তুষ্ট হলেন।
সাতটা উনতিরিশ মিনিট তিরিশ সেকেন্ড।
রিভলভারটা ব্রিফকেসে ভরে নিয়ে ব্রিফকেস লক করে দিলেন তিনি। দ্রুতপায়ে এগিয়ে চললেন বারান্দার দিকে। নীচু হয়ে খবরের কাগজটা তুলে নিলেন—মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলেন। তারই ফাঁকে ঘড়ির দিকে তাকালেন—সাতটা তিরিশমিনিট এক সেকেন্ড। যাক, ঠিকই আছে সময়টা। সময়ের গন্ডগোল হলেই বিপদ।
‘এই যে, মিস্টার সেন!’ সামনের খোলা বাগান থেকে নারীকণ্ঠ শোনা গেল।
এই ডাকটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন অতীশ। কারণ গত দু-বছর ধরেই সাতটা তিরিশমিনিট পাঁচ সেকেন্ডের সময় তিনি বারান্দায় কাগজ হাতে উপস্থিত থাকেন। এবং পাশের বাড়ির বাগান থেকে মিসেস সরকার তাঁকে ঠিক এইভাবেই ডাকেন।
মিসেস সরকারের দিকে চেয়ে হাসলেন অতীশ। মিসেস সরকার বাগানে জল দিচ্ছিলেন, পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর বছরসাতেকের বাচ্চা ছেলেটা।
‘হয় আপনি আজ দু-মিনিট আগে উঠেছেন, নয়তো আমার ঘড়ি দু-মিনিট স্লো আছে।’ হাসতে-হাসতে বললেন মিসেস সরকার।
ভীষণভাবে চমকে উঠলেন অতীশ। খবরের কাগজটা আর-একটু হলেই হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। নাঃ, এই সময়ের ব্যাপারটায় আমাকে খুব সাবধান হতে হবে। কিন্তু দু-মিনিট আগে এলাম কেমন করে? তা হলে কি আমার ঘড়ি ভুল?
