সত্যিই, আমার বাড়ির পেছনে যে-পুকুর আছে তার পাড়ে সন্ধেবেলা বসে থাকতে বেশ লাগে। রোহন যখনই আমার আস্তানায় এসে ওঠে তখনই পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা মারার সুযোগ খোঁজে। এক-একদিন আমি আর ও রাত এগারোটা পর্যন্তও আড্ডা মেরেছি। তা ছাড়া রোহন আড্ডা জমাতেও পারে। কত বিষয়ে যে ও কতকিছু জানে! আর অনর্গল সুন্দর করে কথা বলতে পারে।
কথার মাঝে সামান্য ফাঁক পেতেই আমি ওকে জানালাম যে, আমি একটা বিউটিফুল মশারি কিনেছি।
শুনেই রোহন একেবারে হইহই করে উঠল। বলল, ‘পেরো, অ্যাদ্দিনে তুই একটা কাজের কাজ করেছিস। আজ রাতে মাইনাস মশা ঘুমোনো যাবে…।’
রোহন আমাকে মশারির দামের বাকি পঁচিশটা টাকা দিয়ে দিতে চাইছিল কিন্তু আমি নিলাম না। বললাম, ‘খানিকটা কনট্রিবিউশান আমারও থাক। সবসময় তো ওটা আমিই ব্যবহার করব…তুই আর ক’দিন ইউজ করবি…।’
মশারিটার বাকি ইতিহাস রোহনকে কিছুই জানালাম না। কারণ, ও সেসব বিশ্বাস তো করবেই না—উলটে আমাকে প্যাঁক দিয়ে-দিয়ে জান কাহিল করে ছাড়বে।
সারাটা দিন আমাদের সুন্দরভাবে কাটল। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর দুজনে দু-ঘরে শুয়ে পড়লাম।
সন্ধে থেকেই আমার মধ্যে একটা টেনশান কাজ করছিল। বারেবারে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলাম। রোহন সেটা টের পেয়ে বেশ কয়েকবার আমাকে ধাতানি দিয়েছে: ‘পেরো, কোনদিকে তোর মন পড়ে আছে বল তো—!’
যাই হোক, রাতে যখন আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম, তখন টেনশানটা যেন আরও জাঁকিয়ে বসল। অন্ধকারে জেগে রইলাম। কিছুতেই ঘুম এল না। আমি যেন কীসের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পাশের ঘর থেকে রোহনের চিৎকার শুনতে পাব: ‘পেরো!পেরো, কুইক! বাঁচা আমাকে…।’
অনেক রাতে—রাত তখন কত হবে জানি না—পাশের ঘর থেকে মনে হল যেন একটা শব্দ পেলাম। আর তার ঠিক পরেই কথাবার্তার শব্দ। চাপা গলায় দুজন লোক কথা বলছে।
কিন্তু পাশের ঘরে রোহন তো একা! এত রাতে কার সঙ্গে ও কথা বলবে?
তা হলে কি নীচে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে কেউ কথা বলছে—আর সেই কথাবার্তা আমি দোতলার ঘর থেকে শুনতে পাচ্ছি?
কিন্তু এত রাতে কারা কথা বলবে?
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। জানলার কাছে গিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে তাকালাম। চাঁদের আলোয় আবছাভাবে সব দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু কোনও মানুষজন আমার নজরে পড়ল না।
অথচ চাপা কথাবার্তার শব্দ তখনও শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে হল, পাশের ঘর থেকেই আওয়াজটা আসছে।
আর দেরি করলাম না। অন্ধকারেই দরজা খুলে করিডরে বেরিয়ে পড়লাম।
রোহনের ঘরের কাছে এসে দরজায় কান পাতলাম। সিলিংফ্যানের শব্দ ছাড়াও কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কথাগুলো বোঝা না গেলেও ব্যাপারটা যে অনেকটা বচসা মতন, সেটা আঁচ করা যাচ্ছে।
দরজায় দুবার টোকা দিয়ে চাপা গলায় ডেকে উঠলাম, ‘রোহন! রোহন!’
সঙ্গে-সঙ্গে সব কথাবার্তা থেমে গেল। শুধু সিলিংফ্যানের কিচমিচ শব্দ।
এ-ঘরের দরজার ছিটকিনিটা বেশ গোলমেলে—ঠিকমতো আটকাতে চায় না। বাইরে থেকে দরজার পাল্লায় একটু ঠোকাঠুকি করলেই খুলে যায়। তা ছাড়া রোহন অনেকসময় ছিটকিনি না এঁটেই শুয়ে পড়ে। কারণ, ও ভালো করে জানে, এ-ঘরে চুরি করার মতো কিছু নেই।
রোহন কোনও উত্তর দিচ্ছে না দেখে আমি আবার ওর নাম ধরে ডাকলাম। কিন্তু তিনবার ডেকেও সাড়া না পেয়ে দরজায় বেশ জোরে দুবার ধাক্কা দিলাম।
ঠং করে ছিটকিনিটা পড়ে গেল। নাকি রোহনই ছিটকিনিটা ওরকম আওয়াজ করে খুলল কি না কে জানে!
এবারে দরজা ঠেলতেই খুলে গেল।
ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। নাকে এল সিগারেটের গন্ধ। আমার সিগারেট-বিড়ির অভ্যেস নেই বলে গন্ধটা বেশ চড়া লাগল।
‘রোহন—!’
কেউ সাড়া দিল না। অথচ তক্তপোশের দিক থেকে সামান্য নড়াচাড়ার শব্দ পাচ্ছিলাম।
চাপা টেনশানে আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। তাই আর দেরি না করে ঘরের আলো জ্বেলে দিলাম। তারপর স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম নীল রঙের মশারিটার দিকে।
মশারির ভেতরে কিছু একটা নড়ছে। কারণ, মাঝে-মাঝেই মশারিটা জায়গায়-জায়গায় ফুলে উঠছে। ওটার নীল রঙের কাপড় ভেদ করে ভেতরটা কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু আকারহীন একটা কালচে ছায়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আমি আবার রোহনের নাম ধরে ডাকলাম, ‘রোহন! রোহন!’
মশারির ভেতর থেকে কোনও উত্তর এল না। তবে এলোমেলো নড়াচড়াটা চলতেই লাগল।
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। মনের ভেতরে ভয় আর কৌতূহলের টানাপোড়েন চলছিল। মনে হল, রোহন আমাকে নিয়ে এ কী রসিকতা করছে!
তাই ‘রোহন’ বলে ডেকে উঠে ছুটে চলে গেলাম মশারির কাছে। এক হ্যাঁচকায় মশারিটা টান মেরে খুলে দিলাম।
মশারির ভেতরে কেউ নেই! সব শূন্য!
পাগলের মতো টানাহ্যাঁচড়া করে দড়ি-টরি ছিঁড়ে মশারিটা দু-হাতে খামচে ধরলাম বুকে। উত্তেজনায় বড়-বড় শ্বাস দিতে লাগলাম।
কোথায় গেল রোহন?
ওই তো, মেঝেতে ওর হাওয়াই চটিজোড়া পড়ে আছে। ওই যে, দেওয়ালের কাছে দাঁড় করানো রয়েছে ওর সবুজ রঙের ভি. আই. পি. সুটকেস। এগুলো ফেলে রেখে কোথায় উধাও হল ও? তা ছাড়া গেলই-বা কোথায় দিয়ে? ওর ঘরের দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল!
আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করলাম। রক্তের দাগ লাগা এই ভয়ংকর মশারিটা নিশ্চয়ই রোহনকে…।
না, না—এ অসম্ভব!
আর ভাবতে পারলাম না। এই হতচ্ছাড়া মশারিটাকে আগে আমি পুড়িয়ে ছাই করব। তারপর রোহনকে খুঁজব। থানা-পুলিশ করব। কাগজে আর টিভি-তে বিজ্ঞাপন দেব। যে-করে হোক রোহনকে আমি খুঁজে বের করবই।
