যদি সত্যিই আসে?
ভয়ে ঘামতে শুরু করলাম।
মশারিটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে বিছানা ছেড়ে আচমকা ছুট লাগালাম দরজার দিকে। চটপট আলো-পাখার সুইচ অফ করে দরজা টেনে বন্ধ করে দিলাম। তারপর হাঁসকল লাগিয়ে দিয়ে সোজা নিজের ঘরে। ঘরের আলো জ্বেলে সেই অবস্থাতেই শুয়ে পড়লাম বিছানায়।
ভয়ে সারা রাত একফোঁটাও ঘুম এল না। মাথাটা অসহ্য যন্ত্রণায় দপদপ করতে লাগল। কানে তখনও ভেসে আসছে ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
মনে-মনে ঠিক করলাম, কালই মশারিটাকে আগুনে পুড়িয়ে ‘খতম’ করব। এবং এই ‘অন্ত্যেষ্টি’-র কাজটা রাতের অন্ধকারে তিনতলার ছাদে কিংবা পুকুরপাড়ে গিয়েই সারতে হবে।
তখনও জানি না, আগামীকাল আমার কী কাল হবে!
সকাল ন’টা নাগাদ রোহন হইহই করে এসে আমার ঘরে ঢুকল। কিন্তু তার অনেক আগেই মশারিটার এককোণে শুকনো রক্তের দাগটা আমি আবিষ্কার করে ফেলেছি।
আজ সকালে কষ্ট করে আর ঘুম থেকে উঠতে হয়নি—যেহেতু সারাটা রাত বলতে গেলে জেগেই ছিলাম।
সকালে হাত-মুখ ধুয়ে নমো-নমো করে চা-বিস্কুট খেয়ে সোজা চলে গেছি পাশের ঘরে।
মশারিটা অগোছালোভাবে মেঝেতে পড়ে ছিল। ওটা তুলে নিয়ে বিছানায় বসলাম। এই বস্তুটার মধ্যে কোন অলৌকিক ব্যাপার লুকিয়ে আছে সেটা আমি আজ তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখতে চাই।
জানলা দুটো খোলাই ছিল। সেদিকে তাকালে চোখে পড়ছে সকালের রোদ, গাছের সবুজ পাতা, পুকুরের জল, দু-চারটে পাখি। এসব দেখে মনেই হয় না পৃথিবীতে অলৌকিক বলে কিছু থাকতে পারে। কাল রাতে এ-ঘরে ঢুকে যেসব কাণ্ডকারখানা দেখেছি সেগুলোও আর সত্যি বলে মানতে মন চায় না।
সুতরাং বেশ হালকা মন নিয়েই মশারি পরীক্ষার কাজ শুরু করেছিলাম, এবং মনে-মনে যেন ধরেই নিয়েছিলাম শত পরীক্ষা করেও তেমন কিছু পাওয়া যাবে না।
কিন্তু পেলাম।
মশারিটার এক কোণে ভাঁজের আড়ালে একটা দাগ দেখতে পেলাম। দাগটা মাপে একটাকার কয়েনের চেয়ে বেশ খানিকটা বড়। রং কালচে লাল।
দাগটার ওপরে আলতো করে আঙুল বোলাতেই আমার গোটা শরীর শিরশির করে উঠল। মনে হল যেন জ্যান্ত সাপের গায়ে হাত দিয়েছি।
চট করে আঙুল সরিয়ে নিলাম।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর মনে সাহস এনে দাগটা ধীরে-ধীরে নিয়ে এলাম নাকের কাছে। মাথা ঝুঁকিয়ে গন্ধ শুঁকলাম।
মনে হল যেন আবছা আঁশটে গন্ধ পেলাম।
তখন সবমিলিয়ে উত্তর বেরোল একটাই—দাগটা রক্তের দাগ।
কিন্তু এখানে রক্ত এল কোথা থেকে? এ কী মশার পেটের রক্ত?
প্রশ্নটা মনে জেগে উঠতেই হাসি পেয়ে গেল আমার। অন্তত কয়েকশো রক্তচোষা মশা মারলে পর এরকম মাপের একটা রক্তের দাগ তৈরি হতে পারে। সুতরাং, আমি যা ভাবছি তাই। দাগটা রক্তের—তবে মশার নয়।
দোকান থেকে মশারিটা কেনার সময় এই দাগটা আমার চোখে পড়েনি। পড়লে বোধহয় ভালোই হত। মশারিটা কিনে এভাবে হেনস্থা হতে হত না।
এরপর রোজকার কাজ শুরু করলাম বটে কিন্তু রক্তের দাগের ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে গেল না! তখনও জানি না, রোহন হুট করে এসে হাজির হবে।
ন’টার কাছাকাছি বাইরে থেকে রোহনের ডাক শুনতে পেলাম।
‘পেরো! পেরো—!’ বলে ডাকতে-ডাকতে রোহন দোতলায় উঠে এল। তারপর সটান ঢুকে পড়ল আমার ঘরে।
ঢুকেই একটা চেয়ার দখল করে বসে পড়ল রোহন। লম্বা হাঁপ ছেড়ে বলল, ‘পেরো, শোন, এই খেপে তিনদিন থাকব। শালা, এই চাকরিটা করে লাইফ হেল হয়ে গেল। আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।’
কথা শেষ করেই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল ও। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘দে, দে, আগুন দে—।’
রোহন এইরকমই। ভীষণ মুডি। আমার নাম পরিমল—ডাকনাম পরি। কিন্তু রোহন সেই ছোটবেলা থেকেই আমাকে ‘পেরো’ বলে ডাকে। আমার এতে আপত্তি ছিল, কিন্তু রোহন পাত্তা দেয়নি। এক তুড়িতে সব আপত্তি উড়িয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে ওই পেরোর গেরো আমার কপালে গেঁথে গেছে।
একটা ড্রয়ার থেকে লাইটার বের করে রোহনকে দিলাম। ও ফস করে আগুন জ্বেলে সিগারেট ধরাল। সিগারেটের টান মারতে-মারতে লাইটারটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিল।
কয়েকসেকেন্ড পরই ও হুকুমের ঢঙে বলল, ‘এক গ্লাস জল খাওয়া। তারপর তোর হাতের তৈরি ফার্স্টক্লাস চা—।’
আমি ঘরের এককোণে গিয়ে প্লাস্টিকের বোতল থেকে একটা গ্লাসে জল ঢালতে লাগলাম। রোহন আবার সরাসরি বোতল থেকে জল খেতে পারে না। ওর কিছু খুচরো বাবুয়ানি আছে।
রোহন আমার ছোটবেলার বন্ধু হলেও ওর সঙ্গে আমার কোনও তুলনা হয় না। কোথায় ও, আর কোথায় আমি!
রোহন পড়াশোনার বরাবর একনম্বর। আর আমি যে কত নম্বর সেটা স্রেফ ভুলেই গেছি।
ও দেখতে সুন্দর। ফরসা। মাথায় কোঁকড়া চুল। চিবুকের ডানদিকে ছোট্ট তিল—বিউটি স্পট। শক্তপোক্ত চেহারা। মাথায় বেশ লম্বা। তা ছাড়া দারুণ চাকরি করে।
আর আমি? রোগা, কালো। হাইট মাঝারি। বুদ্ধিও তাই। সেইসঙ্গে চাকরিটাও।
সত্যি, মাঝে-মাঝে রোহনকে আমার হিংসে হয়। ওকে দেখলেই আমি কেমন একটা কমপ্লেক্সে ভুগি। বন্ধু হলেও ওর সামনে আমি যেন ঠিক সহজ হতে পারি না। ও আমাকে যখনই কিছু বলে, তার মধ্যে সবসময় একটা চাপা অর্ডারের ভাব থাকে। যেমন এখন।
চা-টা খেয়ে পায়ের ওপরে পা তুলে বসল রোহন। আবার জুত করে সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘পেরো, আজ আর তোর অফিস গিয়ে কাজ নেই। আমি বাজার থেকে মুরগি নিয়ে আসছি— তুই কষে রান্না কর। আমি খেয়ে-দেয়ে দুটোর সময় কাজে বেরোব। তারপর সাতটা সাড়ে সাতটায় ফিরলে দুজনে মিলে পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা মারব। রিয়েলি, ও-জায়গাটা ফ্যানট্যাস্টিক।’
